শিশুদের শারীরিক ও মানসিক সুরক্ষার ওপর ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে বিশ্বজুয়ে ক্রমবর্ধমান উদ্বেগের মধ্যে ঐতিহাসিক পদক্ষেপে হাঁটছে ফ্রান্স। ১৫ বছরের কম বয়সি শিশুদের জন্য সব ধরনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার নিষিদ্ধ করার বিলে ভোটাভুটি করবেন ফরাসি আইনপ্রণেতারা। এক প্রতিবেদেন এ তথ্য জানিয়েছে রয়টার্স।

মঙ্গলবার (২১ জুলাই) দেশটির পার্লামেন্টের এ সংক্রান্ত বিল উত্থাপিত হবে। বিলের পক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট পড়লে ১৫ বছরের কম বয়সিদের জন্য বন্ধ হবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। শিশু-কিশোরদের একাংশের কাছে সিদ্ধান্তটি অজনপ্রিয় হলেও ইতিমধ্যে অভিভাবক এবং শিক্ষক সমাজের কাছে এটি ব্যাপক সমর্থন পেয়েছে।

গতকাল সোমবার গভীর রাতে ফরাসি সিনেটর ও ডেপুটিদের নিয়ে গঠিত একটি যৌথ কমিটি খসড়া বিলটিতে ঐকমত্যে পৌঁছায়। মঙ্গলবার বিকেলের মাঝামাঝি থেকে শেষভাগের মধ্যে পার্লামেন্টে বিলটির ওপর চূড়ান্ত ভোটাভুটি হওয়ার কথা রয়েছে।

আইনটি পাস হলে বিশ্বমঞ্চে অস্ট্রেলিয়াকে অনুসরণ করবে ফ্রান্স। কিশোর-কিশোরীদের সুরক্ষায় গত ডিসেম্বরে বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে ১৬ বছরের কম বয়সিদের জন্য ফেসবুক, স্ন্যাপচ্যাট, টিকটক ও ইউটিউবের মতো প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারে সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করে অস্ট্রেলিয়া।

কবে থেকে কার্যকর

ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ আগামী শিক্ষাবর্ষ শুরুর আগেই আইনটি দেশজুড়ে কার্যকর করতে জোর তাগিদ দিয়েছেন। গত এপ্রিলে তরুণ প্রজন্মকে আরও দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘ফোন বন্ধ করে বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।’

কী আছে প্রস্তাবিত শিশু সুরক্ষা আইনে

আগামী ১ সেপ্টেম্বর থেকে ১৫ বছরের নিচের শিশুরা কোনো সামাজিক প্ল্যাটফর্মে নতুন করে অ্যাকাউন্ট খুলতে পারবে না। ইতিমধ্যে শিশুদের খোলা অ্যাকাউন্টগুলো বন্ধ বা স্থগিত করার জন্য প্ল্যাটফর্মগুলোক চার মাসের সময় বেঁধে দেওয়া হবে।

ফরাসি ডেটা ও গোপনীয়তা নিয়ন্ত্রক সংস্থা কর্তৃক অনুমোদিত আধুনিক বয়স যাচাইকরণ প্রযুক্তি ব্যবহার করা প্রতিটি সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মের জন্য বাধ্যতামূলক করা হবে। নতুন বিধিনিষেধের আওতামুক্ত থাকবে অনলাইন বিশ্বকোষ (যেমন উইকিপিডিয়া) ও বিভিন্ন শিক্ষামূলক ওয়েবসাইট।

ইউরোপীয় প্রেক্ষাপট ও মাখোঁর বার্তা

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোর ব্যবসার মডেল ও নির্বিচার নিষেধাজ্ঞার বিরোধিতা করে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো দাবি করে আসছে যে, শিশুদের সুরক্ষায় তাদের অ্যাপে এমনিতেই বয়সসীমা সংক্রান্ত সুরক্ষা ফিচার রয়েছে। তবে ফরাসি সরকার আইন পাস করলে তা মেনে চলার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে তারা।

একই সঙ্গে শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্য ঝুঁকিমুক্ত রাখতে ইউরোপীয় কমিশনও সমগ্র ইউরোপের জন্য বিশেষ বিধিমালা তৈরির কাজ করছে। ফ্রান্সের এই আইনটি ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বিদ্যমান আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, ইইউ কমিশন সেটিও খতিয়ে দেখবে।

তরুণদের মনোযোগ ধরে রাখা ও সুস্থ মনন গঠনের ওপর গুরুত্ব দিয়ে গত এপ্রিলে একটি উচ্চবিদ্যালয়ে প্রেসিডেন্ট মাখোঁ আক্ষেপ করে বলেছিলেন, ‘আমরা তোমাদের এই অনিয়ন্ত্রিত ডিজিটাল জঙ্গলে একা ফেলে রেখেছি, যা তোমাদের স্বাভাবিক মনোযোগ কেড়ে নিয়েছে। আমাদের এবার কিছুটা ধীরগতিতে হাঁটাতে হবে এবং তোমাদের একজন দায়িত্বশীল প্রাপ্তবয়স্ক ও সর্বোপরি সচেতন নাগরিক হতে সাহায্য করতে হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘ঠিক এ কারণেই আমরা স্পষ্টভাবে বলছি, ১৫ বছর বয়সের আগে শিশুদের হাতে আর কোনো সোশ্যাল মিডিয়া নয়।’