জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আদলে সব ধরনের স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও সশস্ত্র বাহিনী মোতায়েনের আইনি সুযোগ রাখতে সংশ্লিষ্ট আইন সংশোধনের সুপারিশ চূড়ান্ত করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। একই সঙ্গে দ্বৈত নাগরিক এবং এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার অযোগ্য করার প্রস্তাবও চূড়ান্ত করা হয়েছে। আজ মঙ্গলবার নির্বাচন কমিশনের এক সভায় এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

সভা শেষে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের সচিব আখতার আহমেদ সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানান। স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আইন ও বিধি সংশোধন বিষয়ে ইসি-র দীর্ঘ বৈঠকের পর ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, উপজেলা ও সিটি করপোরেশন আইনে এসব বিধান যুক্ত করার সুপারিশ চূড়ান্ত করা হয়। এখন এই সুপারিশগুলো মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। তবে সরকার এসব সুপারিশ আমলে নিয়ে আইন সংশোধনের উদ্যোগ নিলে মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের পর সংসদে বিল পাস করতে হবে।

বৈঠক শেষে ইসি সচিব আখতার আহমেদ বলেন, "স্থানীয় সরকারের সব কটি আইনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংজ্ঞায় সশস্ত্র বাহিনী যুক্ত করার সুপারিশ করা হয়েছে।"

উল্লেখ্য, স্থানীয় নির্বাচনে সেনা মোতায়েনের চর্চা না থাকলেও ২০০৯ সালের ইউনিয়ন পরিষদ ও পৌরসভা আইনে ‘আইন প্রয়োগকারী সংস্থা’র সংজ্ঞায় ‘প্রতিরক্ষা কর্মবিভাগ’ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এখন উপজেলা পরিষদ এবং সিটি করপোরেশন আইনেও প্রতিরক্ষা কর্মবিভাগ বা সশস্ত্র বাহিনীকে যুক্ত করার পক্ষে ইসি।

কমিশনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, আইনে সশস্ত্র বাহিনী সংজ্ঞাভুক্ত থাকলে তিন বাহিনীকে নির্বাচনী দায়িত্ব দিতে আলাদা কোনো আদেশের প্রয়োজন হয় না। এর ফলে সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা পুলিশের মতো ভোটকেন্দ্রে দায়িত্ব পালন করতে পারেন এবং বিনা পরোয়ানায় গ্রেপ্তারের ক্ষমতা পান।

এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের প্রার্থী হওয়ার বিষয়ে ইসি সচিব আখতার আহমেদ বলেন, "এমপিওভুক্ত শিক্ষকেরা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারবেন কি না, এ বিষয়ে কমিশন মনে করে এমপিওভুক্ত শিক্ষকেরা যেন নির্বাচনে অংশগ্রহণের অযোগ্য হন।"

বিদ্যমান আইনে এমপিওভুক্ত শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নিতে কোনো বাধা নেই, তবে ইসি এটিকে অযোগ্যতা হিসেবে যুক্ত করার সুপারিশ করেছে। এছাড়া দ্বৈত নাগরিকদেরও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার অযোগ্য ঘোষণার প্রস্তাব করবে কমিশন। বর্তমানে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দ্বৈত নাগরিকদের বাধা থাকলেও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে তেমন বিধান নেই। ইসি-র প্রস্তাব অনুযায়ী, ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য (ইউপি মেম্বার) ছাড়া স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের অন্য সব স্তরে দ্বৈত নাগরিকেরা প্রার্থী হতে পারবেন না।

ঋণখেলাপিদের বিষয়ে ইসি সচিব জানান, ঋণের জামিনদারদেরও ঋণখেলাপি হিসেবে অযোগ্য করার প্রস্তাবে কমিশন নীতিগতভাবে সম্মত হয়েছে। তিনি আরও বলেন, বিদ্যুৎ বিল, ভূমি কর, ওয়াসা-র মতো সেবা প্রদানকারী সংস্থায় ব্যক্তিগত বা প্রাতিষ্ঠানিক বিল খেলাপি থাকলে তা অযোগ্যতা হিসেবে গণ্য হবে। পাশাপাশি লাভজনক পদে থেকে নির্বাচন করা যাবে না।

বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, সিটি করপোরেশনে প্রশাসক পদে থেকে কেউ নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না; প্রার্থী হতে হলে আগে পদত্যাগ করতে হবে। এছাড়া আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে (আইসিটি) চার্জশিটভুক্তদের নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করার বিধান যুক্ত করার সুপারিশ করা হবে।

জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) সংশোধন বিষয়ে ইসি সচিব আখতার আহমেদ জানান, ভোটার এলাকা স্থানান্তরের আবেদন এখন অনলাইনে করা যাবে এবং এর জন্য নতুন করে সংশোধনী ফি নির্ধারণ করা হবে। ১৫ বছর পর এনআইডি নবায়নের বিষয়ে তিনি বলেন, "এনআইডি নবায়নের জন্য নির্ধারিত একটা ফরম থাকবে এবং সেই ফরমে কী কী তথ্য থাকবে—একটা ফ্যামিলি ট্রির কথা বলা হয়েছে, আবেদনকারী বা এনআইডিধারী তাঁর পরিবারের তথ্যটা দেবেন, যাতে সংগতিটা আমরা মেইনটেইন করতে পারি। এ ক্ষেত্রেও একটা ন্যূনতম ফির ব্যাপার আছে।"

বর্তমানে ১৬ বছর বয়সীদের এনআইডি দেওয়া হয়। এই তথ্য সংগ্রহের পর্যায়টি এসএসসি, অষ্টম শ্রেণি বা প্রাথমিক স্তরের কোন পর্যায়ে নামানো যায়, তা পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানান ইসি সচিব।

প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ, তাহমিদা আহমদ, আনোয়ারুল ইসলাম সরকার, আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ, ইসি সচিব আখতার আহমেদসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।