সংসদ ভবন অভিযান চলাকালে গত সোমবার বিকেলে দিল্লি পুলিশ যন্তর মন্তরে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) ধরনামঞ্চ ভেঙে দিয়েছিল। তবে মঙ্গলবার ভোরেই সেখানে পুনরায় ফিরে এসেছেন আন্দোলনকারী নেতারা। সিজেপির নেতা অভিজিৎ দিপকে জানিয়েছেন, দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত তাঁরা যন্তর মন্তরেই ধরনা চালাবেন, তবে নতুন করে সংসদ ভবন অভিযানে অংশ নেবেন না।

সকালে সংবাদ সম্মেলনে অভিজিৎ দিপকে বলেন, নতুন করে সংসদ ভবন অভিযানের ডাক তাঁরা দিচ্ছেন না। কারণ, তাতে পুলিশের উদ্দেশ্য সফল হবে। পুলিশ আবার শিক্ষার্থীদের ওপর আক্রমণ করবে। তাঁদের বদনাম করবে। সে সুযোগ পুলিশকে তাঁরা দেবেন না। তিনি আরও বলেন, "সরকারের মুখ পুড়েছে। তারা চাইলে এমন ঘটনা ঘটত না। শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে বরখাস্ত করলে এই আন্দোলনের প্রয়োজনই হতো না। কিন্তু সরকার নির্লজ্জ। বিজেপির নেতারা উদ্ধত।"

পুলিশি বর্বরতায় আহত শিক্ষার্থীদের প্রতি দুঃখ প্রকাশ করে অভিজিৎ দিপকে এক্স-এ এক বার্তায় লেখেন, “পুলিশি বর্বরতায় আপনারা আহত হয়েছেন। আমি ক্ষমাপ্রার্থী। অমানবিক দিল্লি পুলিশের নৃশংসতা থেকে আপনাদের রক্ষা করতে পারিনি।” তিনি আরও উল্লেখ করেন, একজন ধর্মেন্দ্র প্রধান, যিনি ২০ জনের বেশি শিক্ষার্থীর মৃত্যুর জন্য দায়ী, তাঁকে রক্ষা করতে গিয়ে সরকার নিরীহ ছাত্রছাত্রীদের রক্তাক্ত করল। আহতদের উদ্দেশে তিনি বলেন, “ব্যক্তিগতভাবে আপনাদের প্রত্যেকের কাছে আমি ক্ষমা চাইছি। আপনাদের সবার স্বার্থে এই লড়াই জারি থাকবে।”

ঘটনার দায় নিয়ে পুলিশ ও আন্দোলনকারীদের মধ্যে বিপরীত মত দেখা গেছে। সিজেপি ও বিরোধীদের দাবি, পুলিশের লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাসের ব্যবহারের কারণেই হিংসা ছড়িয়েছে। অন্যদিকে পুলিশের দাবি, ছাত্ররাই তাঁদের আক্রমণ করেছে। এই ঘটনায় পুলিশ ৫টি এফআইআর দায়ের করে ৭০ জনের বেশি শিক্ষার্থীকে আটক করেছে এবং তদন্ত করছে এর পেছনে কোনো রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র আছে কি না। পুলিশের দাবি, তাঁদের ১১৮ জন কর্মী জখম হয়েছেন, আর সিজেপির দাবি, শতাধিক শিক্ষার্থী আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন, যাদের অনেকের অবস্থা গুরুতর।

সরকারি এক সূত্র স্বীকার করেছে যে, আন্দোলনকারীদের এমন বিপুল উপস্থিতি এবং পুলিশের প্রতিরোধ উপেক্ষা করে এগিয়ে আসার বিষয়টি তারা অনুমান করতে পারেনি, যা একটি গোয়েন্দা ব্যর্থতা। পুলিশের হিসেবে গতকাল প্রায় ৫০ হাজার মানুষ আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন। দিল্লি পুলিশের মতে, গত ৪০ বছরে কোনো আন্দোলন এভাবে সংসদ ভবনের এত কাছে পৌঁছাতে পারেনি।

কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক সূত্র মুক্তকণ্ঠকে জানিয়েছে, দেশের বিভিন্ন রাজ্যে এই আন্দোলনের পক্ষে ছাত্রসমর্থন দেখা যাচ্ছে এবং তারা পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছেন। তবে কর্ণাটকের বিজেপি নেতা কে সুধাকর দাবি করেছেন, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা ও নেপালের মতো এখানেও একই ধরনের চক্রান্ত চলছে।

পুলিশি অত্যাচারের প্রতিবাদে বিরোধী দলগুলো সরব হয়েছে এবং লোকসভা অচল রয়েছে। রাহুল গান্ধীসহ বিরোধী নেতারা স্পিকার ওম বিড়লার সঙ্গে আলোচনার দাবি জানান। রাহুল গান্ধী গণমাধ্যমকে বলেন, "অবাক কাণ্ড, স্পিকার বলছেন আলোচনার জন্য সরকারের অনুমতি চাইবেন!"

রাহুল গান্ধীর মতে, প্রধানমন্ত্রীর উচিত ছাত্রছাত্রীদের কাছে ক্ষমা চাওয়া। তিনি বলেন, "এত দিন ধরে শিক্ষাব্যবস্থার বিরুদ্ধে আন্দোলন চলছে, এক দিনও তিনি কথা বলেননি। কোনো মন্তব্য করেননি। দেশের শিক্ষাব্যবস্থা উইয়ে খাওয়া কাঠের মতো ফোঁপড়া হয়ে গেছে। গোটা দেশ তা জানে। আন্দোলন তার বিরুদ্ধেই। অথচ প্রধানমন্ত্রী নীরব। গতকাল যা ঘটল, তার জন্য প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমা চাওয়া উচিত।"

আহত শিক্ষার্থীদের দেখতে রাম মনোহর লোহিয়া (আরএমএল) হাসপাতালে যান অভিজিৎ দিপকে, আম আদমি পার্টির অরবিন্দ কেজরিওয়াল, আতিশি, সৌরভ ভরদ্বাজ, সঞ্জয় সিং, রাহুল গান্ধী, প্রিয়াঙ্কা ভদ্র এবং কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী জে পি নাড্ডা।

এর আগে সিজেপির দুই মুখপাত্র সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাংকা স্বাস্থ্যমন্ত্রী জে পি নাড্ডার কাছে একটি স্মারকলিপি জমা দিয়ে তিনটি দাবি জানান। দাবিগুলো হলো— শিক্ষামন্ত্রীকে বরখাস্ত করা, সোনম ওয়াংচুককে নিঃশর্তে হাসপাতাল থেকে মুক্তি দেওয়া এবং আত্মঘাতী হওয়া ২০ জন শিক্ষার্থীর পরিবারকে এক কোটি টাকা করে সহায়তা প্রদান করা। সিজেপি নেতাদের দাবি, মন্ত্রীর সঙ্গে পাঁচ ঘণ্টা কথা হলেও এখন পর্যন্ত কোনো সদুত্তর পাওয়া যায়নি।

এদিকে এনডিএ সংসদীয় দলের সঙ্গে বৈঠকের পর সংসদীয় মন্ত্রী কিরেন রিজিজু জানান, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নিট পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় দোষীদের কঠোর শাস্তির কথা বলেছেন এবং ত্রুটিমুক্ত পরীক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন। রিজিজু বলেন, “ছাত্রদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ভুল পথে যাওয়া খুব সহজ। সঠিক পথে থাকা কঠিন। ছাত্রদের ভুল পথ থেকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনাই আমাদের কর্তব্য।”