গোল ফ্রেমের চশমা পরা ৬৫ বছর বয়সী এক মানুষ, যাকে দেখলে মনে হতে পারে বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো অধ্যাপক। তিন বছর আগেও স্পেনের বাইরে খুব একটা পরিচিত ছিলেন না তিনি। ১৩ বছর আগে বেকারত্বের সময়ে যখন চাকরির খোঁজ করছিলেন, তখন হয়তো কেউ কল্পনাও করতে পারেনি যে তিনি একদিন বিশ্বকাপজয়ী কোচ হবেন। কিন্তু বাস্তবতায় স্পেনের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হওয়ার মূল কারিগর লুইস দে লা ফুয়েন্তেই।
২০২২ সালের ডিসেম্বরে কাতারে মরক্কোর কাছে হেরে বিদায় নেওয়ার পর লুইস এনরিকে দায়িত্ব ছাড়েন। এরপর যখন দে লা ফুয়েন্তের নাম ঘোষণা করা হয়, তখন অনেকের মনেই প্রশ্ন জেগেছিল। জাতীয় দলের সিনিয়র পর্যায়ে তাঁর কোনো অভিজ্ঞতা ছিল না। ক্লাব ফুটবলে তৃতীয় বিভাগের দল আলাভেসের কোচ হিসেবে মাত্র ১১ ম্যাচ পরিচালনা করেই তাঁকে বরখাস্ত করা হয়েছিল। এরপর প্রায় দুই বছর তিনি কোচিং থেকে দূরে ছিলেন। ফলে অনেকের মনেই সংশয় ছিল, তিনি কি স্পেনের জন্য সঠিক পছন্দ?
তবে দে লা ফুয়েন্তেকে দায়িত্ব দেওয়ার মূল কারণ ছিল স্পেনের বয়সভিত্তিক ফুটবলে তাঁর অসামান্য অবদান। খেলোয়াড়ি জীবন শেষে পর্তুগাল ও স্পেনের ক্লাব পর্যায়ে কাজ করার পর ২০১৩ সালে তিনি স্পেনের বয়সভিত্তিক দলের দায়িত্ব পান। পরবর্তী ৯ বছরে অনূর্ধ্ব-১৯ ও অনূর্ধ্ব-২১ দলকে নিয়ে ইউরো জয় করেন তিনি। ২০২১ সালের টোকিও অলিম্পিকে তাঁর দল রুপা জেতে। এই দীর্ঘ সময়েই রদ্রি, ফাবিয়ান রুইজ, মিকেল মেরিনো এবং উনাই সিমনের মতো তারকাদের গড়ে তুলেছেন তিনি। সাবেক স্পেন মিডফিল্ডার হুয়ান মাতার মতে, দে লা ফুয়েন্তের সাফল্যের গোপন ফর্মুলা হলো দলের খেলোয়াড়দের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘদিনের নিবিড় সম্পর্ক। রদ্রিদের কাছে তিনি কেবল কোচ নন, বরং একজন অভিভাবকের মতো।
"দে লা ফুয়েন্তেকে দায়িত্ব দেওয়ার বড় কারণই ছিল স্পেনের বয়সভিত্তিক ফুটবলে তাঁর অবদান। খেলোয়াড়ি জীবন ছাড়ার পর পর্তুগাল-স্পেনের ক্লাব পর্যায়ে নানা রকমের দায়িত্ব পালন করেছেন। এরপর কিছুদিন বেকার থাকার পর ২০১৩ সালে দায়িত্ব পান স্পেনের বয়সভিত্তিক দলের।"
এই নিবিড় সম্পর্কের কারণেই তিনি খেলোয়াড়দের সেরাটা বের করে আনতে সক্ষম হয়েছেন। উদাহরণস্বরূপ উনাই সিমনের কথা বলা যায়। আর্সেনাল ও বার্সেলোনার প্রথম পছন্দ দাভিদ রায়া ও হোয়ান গার্সিয়া থাকা সত্ত্বেও সিমনই স্পেনের পোস্ট সামলেছেন। গত ক্লাব মৌসুমে খারাপ সময় পার করলেও বিশ্বকাপে গোল্ডেন গ্লাভজয়ী সিমন হজম করেছেন মাত্র একটি গোল, যা সব সংশয় দূর করে দিয়েছে।
একইভাবে ব্যালন ডি’অরজয়ী রদ্রির ওপর আস্থা রেখে তাঁকে অধিনায়ক করা এবং মার্ক কুকুরেয়া ও পেদ্রো পোরোদের মতো খেলোয়াড়দের আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে দেওয়া দে লা ফুয়েন্তের কৃতিত্ব। এমনকি দলের প্রয়োজনে পেদ্রির মতো তারকা মিডফিল্ডারকে বেঞ্চে বসিয়ে রাখতেও তিনি দ্বিধা করেননি।
দে লা ফুয়েন্তের কৌশল সহজ কিন্তু অত্যন্ত কার্যকর। বল দখলে রেখে প্রতিপক্ষকে ক্লান্ত করা এবং বল হারানোর সাথে সাথে তীব্র চাপে ফেলে বিভ্রান্ত করা—যা অনেকটা গার্দিওলার শুরুর দিকের বার্সেলোনার কথা মনে করিয়ে দেয়। কেপ ভার্দের সঙ্গে গোলশূন্য ড্র কিংবা পর্তুগাল ও বেলজিয়ামের বিপক্ষে কঠিন লড়াইয়ের সময়ও তিনি বিচলিত হননি। এমনকি ফ্রান্সের মতো শক্তিশালী দলকে আটকে রাখার মাস্টারপ্ল্যানটিও ছিল তাঁর।
দলের অভ্যন্তরীণ শক্ত বন্ধনকেই সাফল্যের মূলমন্ত্র মনে করেন তিনি। বিশ্বকাপে তিনি বারবার বলেছেন, খেলোয়াড়দের খুব ভালো চেনেন বলেই তাঁর কাজটা সহজ হয়ে যায়। মজার ব্যাপার হলো, বিশ্বকাপ শুরুর আগে মার্ক কুকুরেয়া স্প্যানিশ রেডিওতে বলেছিলেন যে দল জিতলে তিনি কোচের ট্যাটু করাবেন, যা নিয়ে ম্যাচ শেষে রসিকতাও করেছেন ৬৫ বছর বয়সী এই কোচ।
৬০ বছর পেরিয়েও সন্তানসম ফুটবলারদের সঙ্গে মিশে যাওয়ার এই সহজাত ক্ষমতা এবং কৌশলী নেতৃত্বেই ১৬ বছর পর আবারও বিশ্বকাপে ফুটেছে স্প্যানিশ লাল পদ্ম।