সরকার গঠনের পাঁচ মাস পর যুগপৎ আন্দোলনের শরিক দলগুলোর নেতাদের সঙ্গে প্রথম আনুষ্ঠানিক বৈঠক করেছেন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। গতকাল সোমবার সন্ধ্যায় রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় অনুষ্ঠিত প্রায় দেড় ঘণ্টার এই বৈঠকে সরকার পরিচালনা, শরিকদের সঙ্গে সমন্বয়, ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কর্মসূচি এবং আন্দোলনের সময় দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। বৈঠক শেষে শরিক নেতাদের সম্মানে নৈশভোজের আয়োজন করেন প্রধানমন্ত্রী।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক জোটকে আরও সুসংহত করতে এবং সরকার পরিচালনায় শরিকদের মতামত ও পরামর্শ গ্রহণের লক্ষ্যেই এই বৈঠকের আয়োজন করা হয়। নির্বাচনের আগে বিএনপি ‘জাতীয় সরকার’ গঠনের প্রতিশ্রুতি দিলেও সরকারে মাত্র তিনটি শরিক দলের তিনজন নেতাকে অন্তর্ভুক্ত করায় কিছু দলের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল। সেই প্রেক্ষাপটে এই বৈঠকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।

বৈঠকে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি, প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজসহ যুগপৎ আন্দোলনের বিভিন্ন শরিক দলের নেতারা উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া আন্দালিভ রহমান পার্থ, সাইফুল হক, রফিকুল ইসলাম বাবলু, শাহাদাত হোসেন সেলিম, ফরিদুজ্জামান ফরহাদসহ বিভিন্ন দলের শীর্ষস্থানীয় নেতারা অংশ নেন। বিএনপির পক্ষ থেকে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী ও দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়সহ শীর্ষ নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

তবে এই বৈঠকে অংশ নেয়নি আ স ম আবদুর রবের নেতৃত্বাধীন জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি)। জমিয়তে উলামায়ে ইসলামকেও আমন্ত্রণ জানানো হলেও তারা কৌশলগত কারণে অনুপস্থিত ছিল। এ বিষয়ে জেএসডির সাধারণ সম্পাদক শহীদ উদ্দিন মাহমুদ মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েই যাইনি। তবে কেন যাইনি, সে বিষয়ে আমরা বিএনপির গুলশান কার্যালয়ে একটি চিঠি দিয়েছি।’

জানা গেছে, চিঠিতে জেএসডি উল্লেখ করেছে যে, জুলাই সনদ, গণভোট ও রাষ্ট্র সংস্কারের প্রশ্নে জাতীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার আগে বিএনপির সঙ্গে পৃথক রাজনৈতিক বৈঠকে অংশগ্রহণ দলের নীতিগত অবস্থান ও জনগণের প্রতি প্রদত্ত অঙ্গীকার সম্পর্কে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারে। তবে রাষ্ট্র বা সরকারের উদ্যোগে সব রাজনৈতিক শক্তির অংশগ্রহণে জাতীয় সংলাপ অনুষ্ঠিত হলে জেএসডি তাতে গঠনমূলকভাবে অংশগ্রহণ করবে।

অন্যদিকে, জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের মহাসচিব মঞ্জুরুল ইসলাম আফেন্দী গত রাতে মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা দাওয়াত পেয়েছি। কিন্তু আমরা এটাতে (বৈঠকে) যাব না, এটা আমাদের দলীয় সিদ্ধান্ত। কারণটা আমরা আপাতত বলছি না।’

বৈঠক সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, আলোচনায় একজন শরিক নেতা আমন্ত্রণ জানানোর প্রক্রিয়া নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তাঁর মতে, আমন্ত্রণপত্র মুখ্য সচিবের কার্যালয় থেকে পাঠানো হলেও পরে বিএনপির গুলশান কার্যালয়ের একজন কর্মকর্তা টেলিফোনে যোগাযোগ করেন, যা প্রত্যাশিত রাজনৈতিক মর্যাদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়নি। এছাড়া সরকার গঠনের পর বিএনপির ‘একলা চলো’ নীতি অনুসরণ এবং জুলাই সনদ বাস্তবায়নে ধীরগতির বিষয়েও কয়েকজন নেতা প্রশ্ন তোলেন। সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য নির্বাচন ও স্থানীয় সরকারে প্রশাসক নিয়োগের মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে শরিকদের অংশগ্রহণ না থাকায় দূরত্ব ও অনিশ্চয়তা বাড়ছে বলে মত দেন তাঁরা।

বৈঠকের শেষ দিকে পরিবেশ হালকা করতে একজন নেতা রসিকতার সুরে প্রধানমন্ত্রীর নৈশভোজকে ‘ফেয়ারওয়েল ডিনার’ বলে প্রশ্ন করলে প্রধানমন্ত্রী হাস্যরসের সঙ্গে জবাব দেন, ‘না, এটি ওয়েলকাম ডিনার।’

বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, দায়িত্ব গ্রহণের পর অগ্রাধিকারভিত্তিক কাজে ব্যস্ত থাকায় সব দলের সঙ্গে নিয়মিত বৈঠক করা সম্ভব হয়নি। তিনি কৃষিঋণ, পরিবার কার্ড, কৃষক কার্ড, ধর্মীয় নেতা ও খেলোয়াড়দের ভাতা এবং খাল পুনঃখননসহ সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের কথা উল্লেখ করেন। দেশের অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংকটের কথা বলে তিনি জানান, সরকার একটি ‘ধ্বংসস্তূপ’ থেকে কাজ শুরু করেছে। একই সঙ্গে তিনি ভবিষ্যতে শরিক দলগুলোর সঙ্গে নিয়মিত মতবিনিময় এবং ৩১ দফা কর্মসূচি ও ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন।

বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন স্থানীয় সরকারমন্ত্রী ও বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেন, সরকার গঠনের পাঁচ মাস পর এ বৈঠক একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ঘটনা। তিনি জানান, দীর্ঘ ১৫-১৬ বছরের আন্দোলন, কারাবরণ, মামলা, গুম ও হত্যার স্মৃতিকে কেন্দ্র করে বৈঠকে আবেগঘন পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছিল। শরিক দলগুলোর নেতারা সরকারের কার্যক্রম সম্পর্কে ইতিবাচক মতামত দিয়েছেন এবং ভবিষ্যতেও যৌথভাবে কাজ করার বিষয়ে একমত হয়েছেন। স্থানীয় সরকার নির্বাচন প্রসঙ্গে তিনি জানান, বর্তমান আইনে দলীয় প্রতীকে নির্বাচন করার সুযোগ নেই, তবে এ বিষয়ে ভবিষ্যতে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

উল্লেখ্য, গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি শরিক দলগুলোর জন্য ১৫টি আসন ছেড়ে দিয়েছিল। এর মধ্যে জোনায়েদ সাকি, আন্দালিভ রহমান পার্থ এবং নুরুল হক জয়ী হন। পরবর্তীতে জোনায়েদ সাকি, নুরুল হক ও ববি হাজ্জাজকে প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হয় এবং আন্দালিভ রহমান পার্থকে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক স্থায়ী কমিটির সভাপতি করা হয়। এছাড়া বিএনপিতে যোগ দেওয়া রাশেদ খাঁনকে গত রোববার প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী হিসেবে সচিব পদমর্যাদায় চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। গণতন্ত্র মঞ্চের শীর্ষ নেতা মাহমুদুর রহমান মান্নাও এই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন বলে জানা গেছে।