স্কোরবোর্ডে ব্যবধান মাত্র এক গোল। কিন্তু স্পেন ও আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ ফাইনাল পরিসংখ্যানের পাতায় রেখে গেছে অনেক বড় ছাপ। স্পেনের অপরাজেয় যাত্রা ও দুর্ভেদ্য রক্ষণ থেকে শুরু করে লিওনেল মেসির বয়স এবং দুই স্প্যানিশ কিশোরের উপস্থিতি, এক রাতেই তৈরি হয়েছে একগুচ্ছ নতুন ইতিহাস।
নিউইয়র্ক নিউ জার্সি স্টেডিয়ামে নির্ধারিত ৯০ মিনিট গোলশূন্য থাকার পর অতিরিক্ত সময়ের ১০৬ মিনিটে ফেরান তোরেসের গোলে আর্জেন্টিনাকে ১-০ ব্যবধানে হারায় স্পেন। দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপ জয়ের পাশাপাশি লুইস দে লা ফুয়েন্তের দল ভেঙেছে একাধিক রেকর্ড।
৩৮ ম্যাচ অপরাজিত থাকার বিশ্বরেকর্ড
ফাইনালের জয়ে স্পেনের অপরাজিত যাত্রা পৌঁছেছে ৩৮ ম্যাচে। পুরুষদের আন্তর্জাতিক ফুটবলে এত দীর্ঘ সময় অপরাজিত থাকার নজির আর কোনো দলের নেই।
এর আগে ২০১৮ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে টানা ৩৭ ম্যাচ হারেনি ইতালি। সেমিফাইনালে ফ্রান্সকে হারিয়ে সেই রেকর্ড ছুঁয়েছিল স্পেন। আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে এবার ইতালিকেও পেছনে ফেলেছে তারা।
২০২৪ সালের মার্চে কলম্বিয়ার বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচে ১-০ গোলে হারের পর আর কোনো ম্যাচে পরাজিত হয়নি স্পেন। বর্তমান অপরাজিত যাত্রার মধ্যে ইউরো ও বিশ্বকাপ, দুটিই জিতেছে দলটি।
আট ম্যাচে মাত্র এক গোল হজম
২০২৬ বিশ্বকাপের আট ম্যাচে মাত্র একটি গোল খেয়েছে স্পেন। বিশ্বকাপজয়ী কোনো দলের এত কম গোল হজমের ঘটনা এটিই প্রথম।
আগের রেকর্ড ছিল দুই গোল হজমের। ১৯৯৮ সালে ফ্রান্স, ২০০৬ সালে ইতালি এবং ২০১০ সালে স্পেন দুইটি করে গোল খেয়ে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়েছিল। এবার নিজেদের আগের সাফল্যকেও ছাড়িয়ে গেছে স্প্যানিশরা।
ফাইনালে আর্জেন্টিনাকে গোল করতে না দিয়ে আসরের সপ্তম ক্লিন শিট পেয়েছেন উনাই সিমন। এক বিশ্বকাপে কোনো গোলকিপার ও দলের সর্বোচ্চ ক্লিন শিটের নতুন রেকর্ড এটি।
সবচেয়ে বেশি বয়সী বিশ্বকাপজয়ী কোচ
৬৫ বছর ২৮ দিন বয়সে বিশ্বকাপ জিতে ইতিহাস গড়েছেন দে লা ফুয়েন্তে। বিশ্বকাপজয়ী সবচেয়ে বেশি বয়সী কোচ এখন তিনিই।
আগের রেকর্ডটিও ছিল স্পেনের এক কোচের। ২০১০ সালে ৫৯ বছর ২০০ দিন বয়সে দেশটিকে প্রথম বিশ্বকাপ জিতিয়েছিলেন ভিসেন্তে দেল বস্কে। তাঁর চেয়ে প্রায় ছয় বছর বেশি বয়সে শিরোপা জিতলেন দে লা ফুয়েন্তে।
শিরোপা হারিয়েও মেসির তিন ইতিহাস
ফাইনালটি হতাশায় শেষ হলেও তিনটি বড় রেকর্ড গড়েছেন মেসি। বিশ্বকাপের তিনটি ফাইনাল শুরুর একাদশে থাকা প্রথম খেলোয়াড় তিনি। ২০১৪ ও ২০২২ সালের পর ২০২৬ সালের ফাইনালও শুরু করেছেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক।
ব্রাজিলের কাফুর পর দ্বিতীয় খেলোয়াড় হিসেবে তিনটি বিশ্বকাপ ফাইনালে মাঠে নেমেছেন মেসি। তবে ১৯৯৪ সালের ফাইনালে কাফু বদলি হিসেবে খেলেছিলেন। ফলে তিনটি ফাইনালই শুরু করা একমাত্র ফুটবলার মেসি।
তিনটি বিশ্বকাপ ফাইনালে দলকে নেতৃত্ব দেওয়া প্রথম অধিনায়কও তিনি। একই সঙ্গে ৩৯ বছর ২৫ দিন বয়সে ফাইনাল খেলে সবচেয়ে বেশি বয়সী আউটফিল্ড খেলোয়াড় হয়েছেন। ভেঙেছেন ১৯৫৮ সালের ফাইনাল খেলা সুইডেনের গুনার গ্রেনের ৩৭ বছর ২৪১ দিনের রেকর্ড।
স্পেনের বিপক্ষে মেসি খেলেছেন নিজের ৩৪তম বিশ্বকাপ ম্যাচ। বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলার নিজের রেকর্ডটিও আরও বড় করেছেন তিনি।
এক ফাইনালে স্পেনের দুই কিশোর
লামিনে ইয়ামাল ও পাউ কুবারসিকে শুরুর একাদশে রেখে আরেকটি ইতিহাস গড়েছে স্পেন। বিশ্বকাপ ফাইনালে একই সঙ্গে দুই কিশোরকে খেলানো প্রথম দল তারা।
ফাইনালের দিন ইয়ামালের বয়স ছিল ১৯ বছর ৬ দিন, কুবারসির ১৯ বছর ১৭৮ দিন। পেলে, জিউসেপ্পে বের্গোমি ও কিলিয়ান এমবাপ্পের পর বিশ্বকাপ ফাইনাল খেলা চতুর্থ ও পঞ্চম কিশোর হয়েছেন তারা।
দুজনই কিশোর বয়সে আটটি করে বিশ্বকাপ ম্যাচ খেলেছেন। সাত ম্যাচ নিয়ে এমবাপ্পের দখলে থাকা আগের রেকর্ড ভেঙেছেন স্পেনের দুই তরুণ।
মেসি ও ইয়ামাল একাদশে থাকায় প্রতিপক্ষ দলের দুই খেলোয়াড়ের বয়সের ব্যবধানেও রেকর্ড হয়েছে। দুজনের মধ্যে ব্যবধান ছিল ২০ বছর ১৯ দিন। বিশ্বকাপ ফাইনালের দুই শুরুর একাদশে আগে কখনো ২০ বছরের বেশি বয়সের ব্যবধান দেখা যায়নি।
আর্জেন্টিনার অনাকাঙ্ক্ষিত রেকর্ড
স্পেনের একের পর এক আক্রমণ সামলাতেই নির্ধারিত সময়ের প্রায় পুরোটাই কাটিয়েছে আর্জেন্টিনা। ৯০ মিনিটে একটিও শট নিতে পারেনি লিওনেল স্কালোনির দল। অন্তত ১৯৬৬ সাল থেকে সংরক্ষিত বিস্তারিত পরিসংখ্যানে বিশ্বকাপ ফাইনালে এমন ঘটনা এটিই প্রথম।
তবে একই ম্যাচে গোলকিপিংয়ের রেকর্ড গড়েছেন এমিলিয়ানো মার্তিনেজ। স্পেনের বিপক্ষে ১১টি সেভ করেছেন দিবু। বিস্তারিত পরিসংখ্যান সংরক্ষণ শুরুর পর বিশ্বকাপ ফাইনালে কোনো গোলকিপারের সর্বোচ্চ সেভ এটি।
বদলি নেমে ফেরানের বিরল কীর্তি
দ্বিতীয়ার্ধে বদলি হিসেবে নামা ফেরান তোরেস ১০৬ মিনিটে শিরোপা নির্ধারণী গোলটি করেন। বিশ্বকাপ ফাইনালে গোল করা পঞ্চম বদলি খেলোয়াড় তিনি। ২০১৪ সালে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে জার্মানির মারিও গ্যোৎসের পর প্রথম।
গ্যোৎসের পর বদলি নেমে বিশ্বকাপ ফাইনালের জয়সূচক গোল করা দ্বিতীয় ফুটবলারও ফেরান। পাশাপাশি আন্দ্রেস ইনিয়েস্তার পর বিশ্বকাপ ফাইনালে গোল করা দ্বিতীয় বার্সেলোনা খেলোয়াড় হয়েছেন তিনি।
একসঙ্গে নারী ও পুরুষ বিশ্বকাপের মালিক
স্পেন এখন একই সময়ে নারী ও পুরুষ বিশ্বকাপের বর্তমান চ্যাম্পিয়ন। ২০২৩ সালে দেশটির নারী দল বিশ্বকাপ জিতেছিল। তিন বছর পর পুরুষ দলের শিরোপা জয়ের মাধ্যমে প্রথম দেশ হিসেবে দুই ট্রফিই নিজেদের দখলে রাখার কীর্তি গড়েছে তারা।
এই ফাইনালের মধ্য দিয়েই শেষ হয়েছে প্রথম ৪৮ দল ও ১০৪ ম্যাচের বিশ্বকাপ। আসরে মোট ৩০৮টি গোল হয়েছে এবং গ্যালারিতে উপস্থিত ছিলেন ৬৮ লাখ ১০ হাজার ৯৬৬ দর্শক। দুটি সংখ্যাই বিশ্বকাপ ইতিহাসের নতুন রেকর্ড।