রাজপথে আবারও শিক্ষার্থীদের সমাবেশ দেখা গেছে। শুধু রাজধানী নয়, দেশব্যাপী প্রবল বন্যায় দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যেও উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা স্থগিত না করা এবং শিক্ষামন্ত্রীর কথিত ব্যঙ্গাত্মক মন্তব্যের প্রতিবাদে শিক্ষার্থীরা তাঁর পদত্যাগ দাবি করে আন্দোলনে নামে।

পরবর্তীতে কর্তৃপক্ষ তাদের অনড় অবস্থান থেকে সরে এসে পুনরায় পরীক্ষার সুযোগ দেওয়ার আশ্বাস প্রদান করে। পাশাপাশি শিক্ষামন্ত্রী তাঁর মন্তব্যের জন্য জাতীয় সংসদে ক্ষমাপ্রার্থী হয়েছেন। তবে এই পদক্ষেপের পর আন্দোলন ও বিক্ষোভ সম্পূর্ণ প্রশমিত হবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়। শিক্ষার্থী ও শিক্ষার মঙ্গলের জন্য পুনরায় পরীক্ষায় বসার সুযোগ দিয়ে বর্তমান আন্দোলনের সমাপ্তি ঘটানো প্রয়োজন। তবে প্রশ্ন রয়ে গেছে, কেন এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হলো এবং ক্ষোভ কেন এত ব্যাপক আকার ধারণ করল।

বন্যার প্রকোপে সারা দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন; ঘরবাড়ি ও ফসল নষ্ট হয়েছে এবং অনেক প্রাণহানি ঘটেছে। ঢাকাসহ বিভিন্ন শহরে প্রবল বর্ষণের ফলে পরীক্ষার দিনে চরম যাতায়াত-সংকট তৈরি হয়। ধারণা করা হচ্ছে, শিক্ষামন্ত্রীর নেতৃত্বে কর্তৃপক্ষ এই আপৎকালীন জরুরি অবস্থায় সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে কালক্ষেপণ করেছে। অথচ শিক্ষামন্ত্রী নিয়মিতভাবে পাবলিক পরীক্ষা সুশৃঙ্খলভাবে সম্পন্ন করার বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা গুরুত্বের সঙ্গে বলে আসছেন।

বিতর্কের জন্ম দিয়েছে বছরের শুরুতে বিদ্যালয়ে ভর্তির ক্ষেত্রে বর্তমান লটারি পদ্ধতির পরিবর্তে ভর্তি পরীক্ষা চালুর ব্যাপারে সরকার ও শিক্ষামন্ত্রীর আগ্রহ। শিক্ষা যেহেতু শিশুর অধিকার, তাই প্রাথমিক স্তর থেকে পরীক্ষার মাধ্যমে ভর্তির বিষয়টি প্রশ্নবিদ্ধ। লটারি পদ্ধতিকে অপেক্ষাকৃত ন্যায্য বলে গ্রহণ করা হয়েছিল, কিন্তু আগামী বছর ভর্তি পরীক্ষা চালুর সম্ভাবনায় কোচিং-বাণিজ্যের প্রসার শুরু হয়েছে, যা শিক্ষায় বৈষম্য আরও তীব্র করতে পারে।

এ প্রসঙ্গে ড. মনজুর আহমদ বলেন, "এ পর্যন্ত নতুন সরকারের শিক্ষাসংক্রান্ত উদ্যোগে সামগ্রিক ও পূর্ণাঙ্গ দৃষ্টিভঙ্গির স্পষ্ট প্রকাশ দেখা যাচ্ছে না। বিভিন্ন পদক্ষেপ বিচ্ছিন্ন, অসমন্বিত, খণ্ডিত এবং রোগের মূলে না গিয়ে লক্ষণ ধরে বিধানের চেষ্টা বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। এসব বিষয়ে আরও সংলাপ ও আলোচনার অবকাশ আছে।"

বর্তমান শিক্ষামন্ত্রী ২০০১-০৬ সালে বিএনপি সরকারের প্রতিমন্ত্রী থাকাকালীন হেলিকপ্টারযোগে পরীক্ষায় নকল নিয়ন্ত্রণ অভিযানের কথা নিজেই স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। পরীক্ষার প্রতি তাঁর এই বিশেষ মনোযোগের কারণে ইউটিউবের এক ভাষ্যকার তাঁকে ‘পরীক্ষামন্ত্রী’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।

অনেক শিক্ষাবিদের মতে, পরীক্ষা নিয়ে কর্তৃপক্ষের এই বিশেষ মনোযোগ এবং বর্তমান আন্দোলন-বিক্ষোভ মূলত শিক্ষা সংস্কার, রাজনৈতিক সংকলন ও দর্শনের গভীরতর সমস্যার লক্ষণ। সরকারের পদক্ষেপগুলো একপেশে ও বিচ্ছিন্ন বলে মনে করা হচ্ছে, যেখানে প্রধান সমস্যাগুলো এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষাকে অধিকার হিসেবে গণ্য করে কোনো সামগ্রিক ও সময়াবদ্ধ পরিকল্পনা এখনো দৃশ্যমান নয়। শিক্ষকদের দক্ষতা ও মর্যাদা বৃদ্ধি কিংবা শিক্ষাশাসনের দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যবস্থাপনায় মৌলিক পরিবর্তনের উদ্যোগও দেখা যাচ্ছে না।

শিক্ষাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে শিক্ষার্থীর জ্ঞান ও দক্ষতার মূল্যায়ন একটি জটিল বিষয়। গবেষণার আলোকে বলা যায়, পাবলিক পরীক্ষাকে স্বল্প পরিসরে সীমাবদ্ধ রাখা শ্রেয়। পাঠ্যক্রমে ১০টি বিষয় থাকলেও চার-পাঁচটি মুখ্য বিষয়ে পরীক্ষা নিয়ে তা দ্রুত শেষ করা যেতে পারে। পাঠ্যপুস্তকের সব তথ্যের বদলে মৌলিক জ্ঞান ও প্রয়োগের ওপর গুরুত্ব দিয়ে প্রশ্ন তৈরি করা উচিত। পাশাপাশি বিদ্যালয়ের ধারাবাহিক মূল্যায়ন ও পাবলিক পরীক্ষার সনদ—উভয়কেই মর্যাদা দেওয়া প্রয়োজন। এতে পরীক্ষার তারিখ, অভিন্ন প্রশ্নপত্র ও ভুল তথ্যের মতো সমস্যাগুলো নিরসন হবে।

সংস্কারের ক্ষেত্রে উচ্চাভিলাষী হওয়া দোষের নয়, তবে তা হতে হবে সুপরিকল্পিত এবং অংশীজন ও বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে। সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি ছাড়া বিচ্ছিন্ন সংস্কার কার্যকর হয় না। বর্তমানে ধারণা করা হচ্ছে, স্পষ্ট লক্ষ্য ও প্রস্তুতি ছাড়াই নানা উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীরা নিজেদের ধারণা চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছেন।

উদাহরণস্বরূপ, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে বাংলা ও ইংরেজি শেখানোয় ব্যর্থতা সত্ত্বেও বিদেশি ভাষা বাধ্যতামূলক করার কথা বলা হচ্ছে। ডিজিটাল প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও ‘প্রতি শিক্ষক এক ট্যাব’-এর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। পাঠ্যক্রম সংক্ষিপ্ত করার পরিবর্তে নতুন বিষয় যুক্ত করার কথা বলা হচ্ছে, যা শিক্ষক ও শিক্ষাব্যবস্থার বহনক্ষমতার বাইরে হতে পারে।

পরিশেষে, নতুন সরকারের শিক্ষাসংক্রান্ত পদক্ষেপগুলো বিচ্ছিন্ন ও খণ্ডিত মনে হচ্ছে, যা রোগের মূল কারণ দূর করার পরিবর্তে কেবল লক্ষণ নিরাময়ের চেষ্টা। এই বিষয়ে আরও সংলাপ ও আলোচনার প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য।

— লেখক: ড. মনজুর আহমদ, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক, বাংলাদেশ ইসিজি নেটওয়ার্কের সভাপতি ও গণসাক্ষরতা অভিযানের উপদেষ্টা।