বাংলাদেশের দারিদ্র্য সূচকে শীর্ষস্থানীয় কুড়িগ্রাম জেলার যোগাযোগ ব্যবস্থায় গত কয়েক দশকের অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে যে, স্থানীয় ট্রেন সেবা বন্ধ হলে অর্থনীতি ও সামাজিক জীবন কিভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একসময় এই জেলায় ভোর ৪টায়, সকাল ১০টায়, বেলা ১টায় ও রাত ১০টায় মোট চারটি লোকাল ট্রেন চলাচল করত। এর মধ্যে সকাল ও রাতের ট্রেন রমনা থেকে লালমনিরহাট, ভোরের ট্রেন পার্বতীপুর হয়ে চিলাহাটি এবং দুপুরের ট্রেন সান্তাহার পর্যন্ত পৌঁছাত। পাশাপাশি একটি ট্রেন ফেরি সংযোগের মাধ্যমে বাহাদুরাবাদের সাথে যুক্ত ছিল। তবে বর্তমানে এই সব সেবা বন্ধ রয়েছে।
চিলমারী বন্দরের ঐতিহ্যগত গুরুত্ব ও কুড়িগ্রামের দারিদ্র্যের মাত্রা বৃদ্ধির পেছনে এই চারটি লোকাল ট্রেন অপসারণের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। এরশাদ সরকারের পতনের পরও ট্রেন চলাচল অব্যাহত ছিল এবং পুরান কুড়িগ্রাম পর্যন্ত তা পৌঁছাত। পরবর্তীতে স্থানীয় নেতাদের দাবির প্রেক্ষিতে রেললাইন উচ্ছেদ করা হয়। সেই রেলপথের জমি বর্তমানে কার দখলে আছে তা অনুসন্ধান করলেই বিষয়টির সুফোল পাওয়া সম্ভব। এভাবেই পুরান কুড়িগ্রাম, টগরাইহাট ও বালাবাড়িহাট স্টেশনগুলো বন্ধ হয়ে যায়। অন্যদিকে, যাত্রাপুর থেকে সোনাহাট স্থলবন্দর পর্যন্ত রেলপথ অনেক আগেই উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে। মালবাহী ট্রেনের লাইন সরিয়ে ফেলায় রেলভিত্তিক গোডাউনগুলো অকার্যকর হয়ে পড়ে। ১৯৪০ সালে প্রকাশিত ‘বাংলায় ভ্রমণ’ গ্রন্থ থেকে জানা যায়, কোন স্টেশন কোন পণ্যের জন্য বিখ্যাত ছিল।
যাতায়াত খরচ বৃদ্ধি ও পরিবহন ব্যবস্থার পরিবর্তন কৃষক ও কারিগরদের ওপর গভীর প্রভাব ফেলেছে। আগে ৪০ টাকায় পার্বতীপুর ও সান্তাহার যাওয়া গেলেও এখন ট্রেন না থাকায় ভাড়ায় লাগছে ১৫০ থেকে ২৫০ টাকা। ট্রাকে কম খরচে বেশি পণ্য পরিবহন করা সম্ভব নয়। ট্রেনে একজন কৃষক সহজেই ৫ কেজি আদা, শর্ষে বা বাদাম নিয়ে রংপুরে পৌঁছাতে পারতেন; একজন কুমার মাটির কয়েকটি পাত্র বা একজন কারিগর ৫টি শীতলপাটি বা ৫০টি চাটাই নিয়ে সহজেই শহরে পণ্য বিক্রি করতে পারতেন। কিন্তু ট্রাকভাড়ার অযৌক্তিক খরচ ও পণ্যের পরিমাণ বিবেচনায় এটি এখন কারো পক্ষে সাধ্যের বাইরে।
লোকাল ট্রেন পুনরায় চালুর প্রশ্নে রেলের ডিজি ও সচিবের একই উত্তর—লোকোমোটিভ ও লোকোমাস্টারের সংকট। এটা কাটলেই চালু হবে। ৪০ বছর কেটে গেল; কেউ কথা রাখল না। এই শূন্যস্থান পূরণ করেছেন মাঝখানের কিছু ফড়িয়া বা ট্রাক ব্যবসায়ীরা, যারা দালাল হিসেবে খুচরা পণ্য কম দামে কিনে ট্রাক ভাড়া করে বা মালিকের ট্রাকে রংপুর, পার্বতীপুর ও সান্তাহারে নিয়ে যান। ট্রেনের বিকল্প হিসেবে ট্রাকের আগমন মধ্যস্বত্বভোগীদের ক্ষমতা বাড়িয়ে দেয়। ফলে কৃষিকাজ আর লাভজনক থাকে না। কৃষকরা শ্রমিক হিসেবে ঢাকা ও চট্টগ্রামে চলে যান। অনাবাদি থাকে উর্বর চরাঞ্চল। বর্তমানে শহরের চাকরিজীবী ও ব্যবসায়ীরা চরের জমি লিজ নিয়ে চাষ করছেন। বৈষম্য ও দারিদ্র্যের এই রহস্যের মূল কারণ এখানেই নিহিত।
অতীতে লোকাল ট্রেনে যাত্রী ভিড় থাকত। স্টেশনে থাকা কোয়ার্টারগুলো সেই যুগের স্মারক। স্টেশনগুলোতে সারাদিন হুল্লোড় লেগে থাকত, এমনকি গল্প-উপন্যাস ও পত্রিকার দোকানও ছিল। আজ সেই স্টেশনগুলো ভূতের ময়দানে পরিণত হয়েছে। লোকাল ট্রেন চলাকালীন সময়ে আমার বাবার মতো প্রায় সব চাকরিজীবী পরিবারের পুরুষেরা পরিবারকে গ্রামে রেখে চিলমারী থেকে ডোমার হাসপাতালে চাকরি করতে যেতেন। ভোরের ট্রেনে কর্মস্থলে যাওয়া ও বিকেলের ট্রেনে ফেরার মাধ্যমে তারা বাসাভাড়া বাঁচাতেন এবং বাবা-মা, চাচা-জ্যাঠার নিরাপদ পরিবেশে স্ত্রী-পুত্রকে রেখে ঘর-গৃহস্থালি করে উন্নত জীবনযাপন করতেন।
রেল-নৌ, যোগাযোগ ও পরিবেশ উন্নয়ন গণকমিটির আন্দোলনের প্রেক্ষিতে কুড়িগ্রাম এক্সপ্রেস চালু হয়। এর ঘোষিত যাত্রাস্টেশন ছিল চিলমারীর রমনা রেলস্টেশন। কিন্তু আন্তনগর ট্রেনটি বর্তমানে কুড়িগ্রাম থেকে চলাচল করছে। কুড়িগ্রাম-চিলমারী রেললাইন প্রতিষ্ঠার এত বছর পরও চার-পাঁচ বছর ধরে কচ্ছপগতিতে সংস্কারের কাজ চলছে। এখনো বাকি আছে উলিপুর থেকে চিলমারী পর্যন্ত কাজ। চলমান কুড়িগ্রাম এক্সপ্রেসেও গরিবদের জন্য সুলভ বগি রইল না। অন্যদিকে হাসিনা সরকারের আমলে দূরত্বভিত্তিক রেয়াত তুলে দেওয়া হলো। ভাড়া বাড়ল ৩০-৪০ শতাংশ। রইল না মালবাহী বগিও।
লোকাল ট্রেনগুলো কবে চালু হবে, জানতে চাইলে রেলের ডিজি ও সচিবের একই উত্তর—লোকোমোটিভ ও লোকোমাস্টারের সংকট। এটা কাটলেই চালু হবে। ৪০ বছর কেটে গেল; কেউ কথা রাখল না। একটি গণ-অভ্যুত্থান হলো, আমরা আশা দেখেছিলাম। অন্তর্বর্তী সরকার গেল, এখন বিএনপি সরকারও এল; সেই আশা পূরণ কবে হবে বা আদৌ হবে কি না, জানি না।
(লেখক: নাহিদ হাসান, লেখক ও সংগঠক | ইমেইল: [email protected])