বিশ্বজুড়ে ফুটবল এবং লিওনেল মেসি বা ম্যারাডোনার দেশ হিসেবে আর্জেন্টিনার পরিচিতি সর্বজনীন। তবে ক্রীড়াক্ষেত্রের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রেও দেশটির এক উজ্জ্বল পরিচয় গড়ে উঠেছে। মহাকাশ গবেষণা, পারমাণবিক পদার্থবিজ্ঞান, বায়োটেকনোলজি এবং চিকিৎসাবিজ্ঞানে আর্জেন্টাইন গবেষক ও বিজ্ঞানীরা বর্তমানে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছেন।

ল্যাটিন আমেরিকায় শিক্ষার হারের দিক থেকে শীর্ষস্থানে রয়েছে আর্জেন্টিনা। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ডোমিঙ্গো ফাউস্তিনো সারমিয়েন্তো সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থা প্রবর্তনের পর থেকেই এই শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি হয়, যার ওপর দাঁড়িয়ে দেশটির বিজ্ঞানীরা বিশ্বমঞ্চে নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করেছেন।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির এই অগ্রযাত্রার সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো নোবেল পুরস্কার। ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি নোবেল জয় করেছে আর্জেন্টিনা। ১৯৪৭ সালে চিকিৎসাবিজ্ঞানে বার্নার্ডো হাউসে, ১৯৭০ সালে রসায়নে লুইস ফেদেরিকো লেলইর এবং ১৯৮৪ সালে চিকিৎসাবিজ্ঞানে সিজার মিলস্টেইন এই সম্মাননা লাভ করেন। উল্লেখ্য, বার্নার্ডো হাউসে ছিলেন ল্যাটিন আমেরিকার প্রথম নোবেল বিজয়ী বিজ্ঞানী।

চিকিৎসাবিজ্ঞানে আর্জেন্টিনার অবদান অভাবনীয়। ১৯১৪ সালে চিকিৎসক লুইস আগোতের নিরাপদ রক্ত সঞ্চালনপদ্ধতি উদ্ভাবন চিকিৎসার ইতিহাসে এক মাইলফলক হিসেবে গণ্য হয়। এছাড়া হৃদ্‌রোগ চিকিৎসায় বাইপাস সার্জারির পথিকৃৎ রেনে ফাভালোরো এবং ১৯৬৯ সালে প্রথম কৃত্রিম হৃৎপিণ্ড উদ্ভাবনকারী ডোমিঙ্গো লিওত্তা বিশ্ব চিকিৎসাজগতকে নতুন দিশা দেখিয়েছেন।

আধুনিক যুগেও এই ধারা অব্যাহত রয়েছে। হিউম্যান জিনোম প্রজেক্টসহ আধুনিক জীববিজ্ঞানে আর্জেন্টাইন গবেষকেরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। এমনকি জীবন্ত প্রাণীর জিনোম ম্যাপিংয়ের ক্ষেত্রে তারা বিশ্বজুড়ে প্রথম হওয়ার গৌরব অর্জন করেছেন। পাশাপাশি মহাকাশ গবেষণাতেও দেশটির নিজস্ব সক্ষমতা তৈরি হয়েছে। ১৯৯১ সালে প্রতিষ্ঠিত জাতীয় মহাকাশ কার্যক্রম কমিশন নিজস্ব প্রযুক্তিতে ৮টি স্যাটেলাইট সফলভাবে উৎক্ষেপণ করেছে, যার মধ্যে এসএসি-ডি এবং আরস্যাট সিরিজের স্যাটেলাইটগুলো তাদের প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের প্রমাণ দেয়।

পারমাণবিক শক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহারের ক্ষেত্রেও ল্যাটিন আমেরিকায় নেতৃত্ব দিচ্ছে আর্জেন্টিনা। ১৯৫০ সালে প্রতিষ্ঠিত ন্যাশনাল অ্যাটমিক এনার্জি কমিশন বিশ্বের অন্যতম প্রথম পারমাণবিক শক্তি গবেষণাকেন্দ্র। দেশটির রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান ইনভাপ বিভিন্ন দেশে পারমাণবিক চুল্লি সরবরাহ করছে, যা তাদের উচ্চ প্রযুক্তির সক্ষমতাকে ফুটিয়ে তোলে।

বর্তমানে আর্জেন্টিনা তাদের অর্থনীতিকে উচ্চ প্রযুক্তিনির্ভর করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে। সফটওয়্যার শিল্প, মহাকাশ গবেষণা এবং উন্নত যন্ত্রপাতির উদ্ভাবনে সরকারি ও বেসরকারি খাতের সমন্বিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে বিশ্ববাজারে নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে সচেষ্ট দেশটি।