ফিলিস্তিনের গাজায় তিনটি অবৈধ বসতি স্থাপন এবং ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রিত পশ্চিম তীরে নির্মাণকাজ সম্প্রসারণের লক্ষ্যে ৪০ কোটি ডলারের বেশি অর্থ বরাদ্দের পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা ও অর্থমন্ত্রী ইসরায়ের কাৎজ। একই সময়ে ওই অঞ্চলের ইসরায়েলি সামরিক কমান্ডাররা অবৈধ বসতি স্থাপনকারীদের তাঁদের নিরাপত্তা অংশীদার হিসেবে অভিহিত করে প্রশংসা করেছেন।
আগামী ২৭ অক্টোবর ইসরায়েলের জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর কট্টর ডানপন্থী জোটের মেয়াদ শেষ হতে যাচ্ছে। এর আগেই অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধি এবং ফিলিস্তিনিদের বিতাড়িত করতে মরিয়া হয়ে উঠেছে নেতানিয়াহু সরকার।
প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ জানিয়েছেন, তিনি উত্তর গাজায় তিনটি অবৈধ বসতি স্থাপনের পরিকল্পনা করছেন। এটি মূলত এক ধরনের সামরিক বসতি, যা কয়েক দশক ধরে বেসামরিক বসতি স্থাপনের পথ প্রশস্ত করে আসছে। অন্যদিকে, অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ অধিকৃত পশ্চিম তীরে ১২টির বেশি নতুন ইসরায়েলি বসতির জন্য ১৩০ কোটি শেকেল অর্থায়নের ঘোষণা দিয়েছেন। ইসরায়েলি গণমাধ্যমের তথ্যমতে, যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য বিরোধিতার আশঙ্কায় গত মাসে মন্ত্রিসভায় এই অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হলেও বিষয়টি গোপন রাখা হয়েছিল।
পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বাহিনীর কমান্ডার মেজর জেনারেল আভি ব্লুথ ‘ফার্মস অ্যাসোসিয়েশন’ নামক একটি সংগঠনের সভায় অবৈধ বসতি স্থাপনকারীদের প্রশংসা করে তাঁদের সামরিক বাহিনীর নিরাপত্তা অংশীদার বলে উল্লেখ করেন। উল্লেখ্য, এই সংগঠনটি এমন সব বসতির প্রতিনিধিত্ব করে যা ইসরায়েলি আইনেই অবৈধ।
অধিকৃত পশ্চিম তীরজুড়ে ফিলিস্তিনিদের ঘরবাড়ি ও জমি থেকে বিতাড়িত করতে এসব বসতি মূল ভূমিকা পালন করছে। ইহুদিদের এই সহিংসতার পেছনে সরকারি সমর্থনের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করে ইসরায়েলের সাবেক দুই প্রধানমন্ত্রী এবং নিরাপত্তা সংস্থার সাবেক প্রধানসহ রাজনৈতিক ও সামরিক অভিজাত শ্রেণির অনেকে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দিয়েছেন।
জাতিসংঘের মানবাধিকার কার্যালয় এই সপ্তাহে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা আসলে রাষ্ট্রীয় সহিংসতা। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসরায়েল ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড গ্রাসের উদ্দেশ্যে এই বসতি স্থাপনকারীদের ব্যবহার করছে এবং অপরাধীদের বিচার না হওয়ায় এই সহিংসতা লাগামহীনভাবে বাড়ছে।
ইসরায়েলের অধিকার রক্ষা সংগঠন ‘পিস নাউ’-এর হাগিত ওফরান জানান, নির্বাচনের আগেই অন্তত সাতটি বসতি বসবাসের উপযোগী করতে বুলডোজার দিয়ে কাজ চালানো হচ্ছে। তিনি বলেন, "নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে নির্বাচনের আগে জনগণের অর্থ লুটপাটের এক বেপরোয়া প্রতিযোগিতায় নেমেছে নেতানিয়াহু সরকার।"
গাজা পরিদর্শনের সময় ইসরায়েল কাৎজ সেখানে বসতি স্থাপনের পরিকল্পনার কথা জানান এবং জাতিগত নিধনের পক্ষে জোরালো অবস্থান নেন। ভূমি দখল পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা কেরেম নাভোটোর প্রতিষ্ঠাতা ড্রোর এটকেস বলেন, এই বসতিগুলো দীর্ঘমেয়াদে সামরিক ব্যবহারের জন্য তৈরি করা হয় না। তিনি বলেন, "সামরিক বাহিনী হলো কেবল প্রথম ধাপ, যার উদ্দেশ্য ভবিষ্যৎ বসতি স্থাপনের পথ তৈরি করা।"
এটকেস আরও জানান, ১৯৫০-এর দশকে গাজা উপত্যকাসহ বিভিন্ন সীমান্ত অঞ্চলে প্রথম নাহাল বসতি স্থাপন করা হয়েছিল এবং ১৯৬৭ সালে অধিকৃত পশ্চিম তীরে একই পদ্ধতি ব্যবহার শুরু হয়, যা প্রথমে জর্ডান উপত্যকা এবং পরে অন্যান্য এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে।
স্মোট্রিচ গত মাসে জানিয়েছিলেন, গাজায় তিনটি বসতি স্থাপনের পরিকল্পনা চূড়ান্ত এবং নেতানিয়াহু সবুজসংকেত দিলেই কাজ শুরু হতে পারে। তবে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এই বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি।
ইসরায়েলের ডেপুটি চিফ অব স্টাফ মেজর জেনারেল তামির ইয়াদাই প্রতিরক্ষামন্ত্রী কাৎজকে জানিয়েছেন, ইসরায়েল এখন গাজার ৬৫ শতাংশ এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে। এটি গত বছর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় হওয়া যুদ্ধবিরতি চুক্তির ৫৩ শতাংশের সীমার চেয়ে অনেক বেশি।
ইসরায়েলের ধ্বংসাত্মক যুদ্ধে টিকে থাকা প্রায় ২০ লাখ ফিলিস্তিনি এখন গাজার অবশিষ্ট এক-তৃতীয়াংশ এলাকায় ঠাসাঠাসি করে বাস করছেন। ইয়াদাই জানান, এখানে ৭০ হাজারের বেশি গাজাবাসীকে হত্যা করা হয়েছে, যার মধ্যে ২১ হাজার শিশু রয়েছে।






