কানাডা সীমান্তের এক মাইলের কম দূরত্ব থেকে নীতীশ কুশল নামের এক ভারতীয় বংশোদ্ভূত গ্যাংস্টারকে গ্রেপ্তার করেছে মার্কিন নিরাপত্তা বাহিনী। মার্কিন আদালতের নথিতে জানা গেছে, নীতীশ কুশল জগ্গু ভগবানপুরিয়া অপরাধী চক্রের সদস্য এবং যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা এফবিআই দীর্ঘ সময় ধরে তাকে খুঁজছিল।
তদন্তকারীদের দাবি, নীতীশ বেশ কিছুদিন ধরে গোয়েন্দাদের নজর এড়িয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছিলেন। নিজের অবস্থান গোপন করতে তিনি মুঠোফোন ফেলে দেন এবং নিউ জার্সির একটি ভুয়া ড্রাইভিং লাইসেন্স ব্যবহার করে পরিচয় লুকানোর চেষ্টা করেন। ‘লালা’ নামে পরিচিত এই ব্যক্তি এফবিআই-এর শীর্ষ পলাতক আসামিদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পর গত ১৬ জুলাই ভারমন্ট অঙ্গরাজ্যের আলবার্গ থেকে গ্রেপ্তার হন।
সরকারি আইনজীবীরা আদালতের কাছে আবেদন করেছেন যেন বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত কুশলকে কারাগারেই রাখা হয়। তাঁদের মতে, এই ব্যক্তি সমাজের জন্য বিপজ্জনক এবং তাঁর পালিয়ে যাওয়ার প্রবল ঝুঁকি রয়েছে। নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে, নীতীশ একটি আন্তর্জাতিক অপরাধী চক্রের সদস্য যার মূল কেন্দ্র ভারতের পাঞ্জাবে। এই চক্রের বিরুদ্ধে খুন, অপহরণ, মাদক ও অস্ত্র পাচার, চাঁদাবাজি, অর্থ পাচার এবং মানব পাচারের মতো গুরুতর অভিযোগ রয়েছে।
গত ২৫ জুন লস অ্যাঞ্জেলেসের ফেডারেল গ্র্যান্ড জুরি কুশলের বিরুদ্ধে অবৈধ কারবারিদের দ্বারা প্রভাবিত এবং দুর্নীতিগ্রস্ত সংগঠনের (রিকো) মাধ্যমে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ এনে অভিযোগ গঠন করে। এর আগে ৭ জুলাই তাঁকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছিল। অভিযোগ গঠনের খবর পেয়েই তিনি মুঠোফোন ফেলে উধাও হয়ে যান, যার ফলে এফবিআই তাঁকে মোস্ট ওয়ান্টেড তালিকায় যুক্ত করে।
আইনজীবীদের দাবি, কানাডা সীমান্ত থেকে মাত্র কয়েক ফুট দূরে একটি গাড়ি ফেলে দিয়ে পালানোর চেষ্টা করেন কুশল। ১৬ জুলাই সীমান্ত থেকে এক মাইলের মধ্যে তাঁকে ধরা হয়। ওই দিন সকালে কানাডার পুলিশ একজনকে পায়ে হেঁটে সীমান্ত পার হতে দেখলেও সেই ব্যক্তি কুশল কি না, তা নিশ্চিত করা হয়নি। ভারমন্টের এক বাসিন্দা সিসিটিভি ক্যামেরায় সন্দেহভাজন একজনকে একটি গাড়িতে উঁকি দিতে এবং পরে একটি গোলাবাড়িতে ঢুকতে দেখেন। গ্রেপ্তারের সময় তিনি অন্য ব্যক্তির নামে নিউ জার্সির ড্রাইভিং লাইসেন্স দেখালেও হাতের ছাপ এবং শরীরে থাকা সিংহের একটি বিশেষ ট্যাটুর মাধ্যমে তাঁর আসল পরিচয় নিশ্চিত করা হয়।
ভারতের বার্তা সংস্থা আইএএনএস-এর প্রাপ্ত ৪৪ পৃষ্ঠার অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, জগ্গু ভগবানপুরিয়া অপরাধী চক্রের অভিযুক্ত ১৫ জনের একজন নীতীশ কুশল। পাঞ্জাবে জন্ম নেওয়া এই চক্রের প্রধান জগ্গু একসময় লরেন্স বিষ্ণোইয়ের সহযোগী ছিলেন। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, যুক্তরাজ্য, ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডজুড়ে এই চক্রের কার্যক্রম বিস্তৃত এবং বিশ্বব্যাপী এর সদস্য সংখ্যা এক হাজারের বেশি, যার মধ্যে একশ জনের বেশি যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছেন।
অভিযোগপত্রে দাবি করা হয়েছে, এই চক্রটি ভাড়ায় খুন, অপহরণ ও মাদক পাচারের মাধ্যমে অর্থ উপার্জন করে এবং প্রতিদ্বন্দ্বীদের সরিয়ে দিতে সহিংসতার আশ্রয় নেয়। কুশলের বিরুদ্ধে বিশেষত সহিংস কর্মকাণ্ড চালানোর অভিযোগ রয়েছে। ২০২৪ সালের ১০ জুলাই এক ব্যক্তিকে মাদক চালানের ক্ষতিপূরণ হিসেবে ৫০ হাজার মার্কিন ডলার দাবি করে ক্যালিফোর্নিয়ার ম্যানটেকা ও ফ্রেসনো শহরে অপহরণ ও মারধরের ঘটনায় নীতীশ, অমৃতপাল সিং বাল, হর্ষপ্রীত সিং ও আমারবীর সিং জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগ আনা হয়েছে। পরবর্তীতে জগ্গু ভগবানপুরিয়ার নির্দেশে ওই ব্যক্তিকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
আদালতের নথি অনুযায়ী, এই চক্রটি দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়া থেকে পূর্ব যুক্তরাষ্ট্র এবং কানাডা সীমান্তে ১০০ কেজি বা তার বেশি ওজনের কোকেন ও মেথামফেটামিন পাচার করত।
নীতীশের অতীত সম্পর্কে জানা গেছে, তিনি ২০২২ সালে অ্যারিজোনার ইউমা সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করেন। ২০২৩ সালে তাঁর বিরুদ্ধে খুন, খুনের চেষ্টা ও ষড়যন্ত্রের অভিযোগ উঠলেও শেষ পর্যন্ত একটি আগ্নেয়াস্ত্রের অপরাধে তিনি দোষী সাব্যস্ত হয়ে ৬০ দিনের কারাদণ্ড ভোগ করেন। এছাড়া ২০২৬ সালে তাঁর বিরুদ্ধে একটি ছোটখাটো মাদক মামলা ছিল বলেও নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।