ভৌগোলিক দূরত্ব, জাতীয় সীমান্ত কিংবা প্রাকৃতিক বাধা উপেক্ষা করে মতুয়া সম্প্রদায়ের মানুষ কীভাবে তাদের আত্মিক ও সাংস্কৃতিক বন্ধন টিকিয়ে রেখেছেন, তা উঠে এসেছে এক গবেষণায়। জার্মানির ইউনিভার্সিটি অব টুবিনজেনের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ক্যারোলা লোরিয়া এই সম্প্রদায়ের ওপর একটি বিস্তৃত গবেষণা প্রকাশ করেছেন। উচ্ছেদ ও জোরপূর্বক অভিবাসনের শিকার হয়ে ভারত, বাংলাদেশসহ বিশ্বের আরও ৩২টি দেশে ছড়িয়ে থাকা প্রায় ৫ কোটি (৫০ মিলিয়ন) মানুষের জীবনযাত্রা ও সংস্কৃতি নিয়ে এই গবেষণা চালানো হয়।
দীর্ঘ ১০ বছরেরও বেশি সময় ধরে পরিচালিত মাঠপর্যায়ের গবেষণার ভিত্তিতে লোরিয়া দেখিয়েছেন, গত কয়েক দশকে এই সম্প্রদায়ের পারস্পরিক সংহতি আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। গবেষণায় উঠে এসেছে, ধর্মীয় গান, ঢাকের ছন্দ এবং গল্পের মতো সাংস্কৃতিক উপাদানগুলো মতুয়া সমাজে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, যা এমনকি একটি প্রতিবাদী আন্দোলন গড়ে তুলতেও সহায়ক হয়েছে।
মতুয়াদের সামাজিক অবস্থান ও রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে অধ্যাপক ক্যারোলা লোরিয়া বলেন, “মতুয়ারা সমাজে চরমভাবে সুবিধাবঞ্চিত এবং ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে তাদের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে নীতিনির্ধারক ও গবেষক মতুয়াদের উপেক্ষা করেছেন।” তিনি আরও যোগ করেন, “তবে তারা এখন খুব ভালোভাবে সংগঠিত এবং তাদের ভোট নির্বাচনের ফলাফলকে প্রভাবিত করতে পারে। এ কারণে রাজনৈতিক দল ও নেতারা এখন মতুয়াদের সমর্থন পাওয়ার চেষ্টা করছেন।”
মতুয়াদের জীবনদর্শন ও আধ্যাত্মিকতা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে লোরিয়া বলেন, “আপনি যদি তাদের বুঝতে চান, তবে আপনাকে তাদের সংগীত ও ধর্মকে বুঝতে হবে। মতুয়া ধর্মীয় সাধনার মূলে রয়েছে ঢাক, করতাল ও সাধারণ একতারা–দোতারার মতো তারের যন্ত্রের সহযোগে গাওয়া কীর্তন ও গান। তারা একটি পবিত্র নৃত্য পরিবেশন করে। তাদের বিশ্বাস, এই নৃত্য তাদের চেতনার এক উচ্চতর স্তরে নিয়ে যায়। তাদের গান ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে গাওয়া হয়, যেখানে বারবার পদের পুনরাবৃত্তি ও বৈচিত্র্য আনা হয়।”
এই সংগীত ও উৎসবের পরিবেশ তাদের মধ্যে একটি যৌথ পরিচয় ও উদ্দীপনা তৈরি করে, যার আকর্ষণে অনেকে শত শত কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে উৎসবে যোগ দেন। এই সংহতি বজায় রাখতে প্রচারক-গায়কদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ; তাঁরা গুরু, নিরাময়কারী, পারফর্মার এবং সামাজিক নেতা হিসেবে দূরদূরান্তে ভ্রমণ করেন।
গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে, ভারত মহাসাগরের আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ মতুয়াদের একটি গুরুত্বপূর্ণ বসতি এলাকা। মূল ভূখণ্ড থেকে ১ হাজার ৪০০ কিলোমিটারেরও বেশি দূরে অবস্থিত এই ২০০টি দ্বীপের ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা সত্ত্বেও সংগীত ও সাংস্কৃতিক উপকরণগুলো মতুয়া সম্প্রদায়ের বিভিন্ন অংশকে একসূত্রে গেঁথে রেখেছে।