যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যকার যুদ্ধের অবসান ঘটাতে গত ১৭ জুন একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। লক্ষ্য ছিল ৬০ দিনের মধ্যে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানো। তবে তাড়াহুড়ো করে তৈরি করা ১৪ দফার ওই দলিলের অস্পষ্ট ধারাগুলো ভিন্ন ব্যাখ্যার সুযোগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালির নৌযান চলাচল সংক্রান্ত ৫ নম্বর ধারাটিই গত সপ্তাহের বড় সংঘর্ষের মূল কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তেহরানের কাছে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ একটি বিশাল কৌশলগত সম্পদ, যা ভবিষ্যৎ আক্রমণ ঠেকাতে পারমাণবিক অস্ত্রের মতোই কার্যকর। ২০২৫ সালের জুন এবং ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর এই প্রতিরোধব্যবস্থার গুরুত্ব ইরানের কাছে আরও বেড়েছে। এছাড়া এই নিয়ন্ত্রণ এখন ইরানি সরকারের কাছে জাতীয় গৌরব এবং যুদ্ধের বড় অর্জন। অর্থনৈতিকভাবেও এটি লাভজনক; আলোচনা শেষে ইরান এখান থেকে সার্ভিস ফি বা টোল আদায়ের ঘোষণা দিয়েছে, যা থেকে বছরে শত কোটি ডলার আয় হতে পারে।
অন্যদিকে, ওয়াশিংটন এই অর্থনৈতিক সুবিধা নিজেদের কবজায় নিতে চায়। ১৩ জুলাই ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেন, হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাওয়া কার্গোর ওপর যুক্তরাষ্ট্র ২০ শতাংশ কর আরোপ করবে এবং তিনি নিজেকে ‘হরমুজ প্রণালির অভিভাবক’ হিসেবে দাবি করেন। এর জবাবে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেন, "যারা নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করবে, ক্ষতিপূরণ তাদেরই পাওয়া উচিত।" তেহরানকেই হরমুজ প্রণালির চিরন্তন অভিভাবক উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, "ট্রাম্পের ২০ শতাংশের দাবি অনেক বেশি, ইরান ন্যায্য ফি নির্ধারণ করবে।"
এই পরিস্থিতির কারণে ইরান ২৮ ফেব্রুয়ারির আগের অবস্থায় ফিরবে না, যা যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ বা উপসাগরীয় মিত্রদের জন্য মেনে নেওয়া অসম্ভব। ফলে তৈরি হয়েছে এক কৌশলগত অচলাবস্থা। যুদ্ধের মূল উদ্দেশ্য ছিল ইরানের শাসনব্যবস্থার পতন, মার্কিন-ইসরায়েলপন্থী সরকার প্রতিষ্ঠা এবং সামরিক সক্ষমতা ধ্বংস করা। কিন্তু বাস্তবে ইসলামি প্রজাতন্ত্রটি টিকে থেকে আঞ্চলিক প্রভাব বাড়িয়েছে। মার্চের মাঝামাঝি সময়ে ট্রাম্প স্বীকার করেছিলেন, "ইরান যে উপসাগরীয় দেশগুলোতে পাল্টা আঘাত করবে, তা তাঁরা ভাবেননি।"
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে মার্কিন প্রশাসনের সামনে কোনো সহজ সামরিক সমাধান নেই। "বর্তমান পরিস্থিতিতে মার্কিন প্রশাসনের সামনে ভালো কোনো বিকল্প খোলা নেই। হরমুজ সংকটের কোনো সহজ সামরিক সমাধান নেই। জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন ঘটাতে ইরানের নৌবাহিনীর আধিপত্যের প্রয়োজন নেই; তাদের ছোট স্পিডবোট, ড্রোন, মিসাইল ও মাইনই এর জন্য যথেষ্ট।"
পশ্চিমা দেশগুলোর ধারণা ছিল ইরানি সরকার জনপ্রিয়তাহীন এবং সামান্য ধাক্কায় ভেঙে পড়বে। এই লক্ষ্যে ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে বিক্ষোভ উসকে দেওয়া হয়েছিল এবং সশস্ত্র বিদ্রোহীদের অস্ত্র দেওয়া হয়েছিল। তবে ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রায় তিন কোটি মানুষের ভোট এবং সম্প্রতি নিহত সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনির জানাজায় লাখ লাখ মানুষের উপস্থিতি প্রমাণ করে যে, যুদ্ধের ফলে ইরানিদের জাতীয় ঐক্য আরও বেড়েছে।
স্থলসেনা পাঠিয়ে সরকার পরিবর্তন করা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ব্যয়বহুল এবং রাজনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ, বিশেষ করে নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে। এছাড়া সমঝোতা স্মারকের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ধারাগুলো মার্কিনদের জন্য অস্বস্তিকর। চুক্তিতে হিজবুল্লাহ, হুতি, হাশদ আল-শাবি বা হামাসের মতো আঞ্চলিক মিত্রদের দমনের কোনো উল্লেখ নেই এবং ব্যালিস্টিক মিসাইল কর্মসূচি নিয়েও কিছু বলা হয়নি। জুনে সমঝোতা সইয়ের সময় ট্রাম্প সুর নরম করে বলেছিলেন, "ইরানের শত্রুদের যখন মিসাইল আছে, তখন ইরানের তা থাকাটা অন্যায় নয়।"
সবচেয়ে বড় অমীমাংসিত ইস্যু ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ। তেহরান বেসামরিক ব্যবহারের অধিকার দাবি করলেও যুক্তরাষ্ট্র শূন্য-সমৃদ্ধকরণ নীতিতে অনড়। সমঝোতা স্মারকে কেবল আলোচনার কথা বলা হয়েছে, তবে এর মাধ্যমে সমাধান হওয়ার সম্ভাবনা কম। ট্রাম্প একে ‘ছোট সফর’ এবং দ্রুত শেষ হওয়ার যুদ্ধ বললেও, বাস্তবতা হলো এটি একটি দীর্ঘস্থায়ী কৌশলগত সংঘাতের সূচনা। এখন দুই পক্ষকেই এই নতুন আঞ্চলিক বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে হবে, যেখানে ইরান আগের চেয়ে অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী ও শক্তিশালী।
— মোহাম্মদ এলমাসরি, দোহা ইনস্টিটিউট ফর গ্র্যাজুয়েট স্টাডিজের অধ্যাপক। (মিডল ইস্ট আই থেকে অনূদিত)