বাংলাদেশের সংবিধান শিক্ষা গ্রহণের সমান সুযোগ নিশ্চিত করার কথা বললেও, বাস্তব চিত্র ভিন্ন। রাষ্ট্রের উন্নয়ন পরিকল্পনায় শিক্ষাকে সামাজিক বৈষম্য দূর করার প্রধান হাতিয়ার হিসেবে দেখা হলেও, দেশের প্রান্তিক ও পাহাড়ি অঞ্চলের অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এখনো ন্যূনতম অবকাঠামোগত সুবিধা থেকে বঞ্চিত। চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার কয়লা পশ্চিম সোনাই উচ্চবিদ্যালয়ের বর্তমান পরিস্থিতি সেই নির্মম বাস্তবতারই এক জলজ্যান্ত উদাহরণ।

স্থানীয় শিক্ষানুরাগীদের প্রচেষ্টায় ১৯৯৫ সালে বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয়। দীর্ঘ ৩১ বছর ধরে টিন ও বেড়ার ঘরেই এখানে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। প্রায় ১০ বর্গকিলোমিটার এলাকার একমাত্র উচ্চবিদ্যালয় হওয়া সত্ত্বেও প্রতিষ্ঠানটিতে কোনো স্থায়ী ভবন নেই। পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ, নিরাপদ শৌচাগার, সুপেয় পানির ব্যবস্থা, লাইব্রেরি কিংবা ছাত্রীদের জন্য কমনরুমের মতো মৌলিক সুবিধাসমূহ এখানে অনুপস্থিত। এমনকি কক্ষসংকটের কারণে একই কক্ষে একাধিক শ্রেণির পরীক্ষা নিতে হয়। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জানিয়েছেন, "অনেক সময় সাপ, কুকুর, বিড়াল কিংবা শিয়ালও বিদ্যালয়ের ভেতরে ঢুকে পড়ে।"

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এখানে অধ্যয়নরত ৩১০ শিক্ষার্থীর মধ্যে শতাধিক শিক্ষার্থী ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর সদস্য। পাহাড়ি ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য শিক্ষা কেবল ব্যক্তিগত উন্নতির পথ নয়, বরং এটি সামাজিক অন্তর্ভুক্তি এবং দারিদ্র্যের চক্র ভাঙার অন্যতম মাধ্যম। অথচ এই শিক্ষার্থীরা সরকারি সুবিধা হিসেবে কেবল বিনামূল্যে পাঠ্যবই পায়। বিদ্যালয়টি এখনো এমপিওভুক্ত না হওয়ায় শিক্ষকেরা নিয়মিত বেতন পান না এবং প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন কাজ স্থবির হয়ে আছে।

তবে সীমাহীন প্রতিকূলতার মাঝেও এখানকার শিক্ষকেরা শিক্ষার আলো জ্বালিয়ে রেখেছেন এবং শিক্ষার্থীরাও ভালো ফলাফল করছে। স্থানীয় অভিভাবকদের মতে, এই বিদ্যালয়টি না থাকলে শিক্ষার্থীদের অন্তত ১৭ কিলোমিটার দূরে গিয়ে পড়াশোনা করতে হতো, যা দরিদ্র পরিবারের পক্ষে প্রায় অসম্ভব। ফলে প্রতিষ্ঠানটি পুরো এলাকার শিক্ষার প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তারা বিদ্যালয়টি পরিদর্শন করে ভবন নির্মাণ ও এমপিওভুক্তির বিষয়ে ইতিবাচক আশ্বাস দিয়েছেন। তবে অতীতে এমন অনেক আশ্বাস বাস্তবায়নের অপেক্ষায় বছরের পর বছর ঝুলে থাকার নজির রয়েছে। তাই এখন প্রয়োজন দ্রুত ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ।

উন্নয়ন তখনই অর্থবহ হয়, যখন তার সুফল দেশের সবচেয়ে প্রান্তিক মানুষও সমানভাবে ভোগ করতে পারে। পাহাড়ের শিশুরাও সমতলের শিক্ষার্থীদের মতো নিরাপদ ও মানসম্মত শিক্ষার অধিকার রাখে এবং সেই অধিকার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

এমতাবস্থায়, সরকারের উচিত দ্রুত এই বিদ্যালয়টির এমপিওভুক্তির প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা। পাশাপাশি স্থায়ী ভবন নির্মাণ, নিরাপদ পানি, স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগার, লাইব্রেরি, বিজ্ঞানাগার এবং ছাত্রীদের জন্য প্রয়োজনীয় সুবিধা নিশ্চিত করা জরুরি। সেই সঙ্গে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ সহায়তা ও বৃত্তির ব্যবস্থাও বিবেচনা করা প্রয়োজন।