মালামাল ভর্তি কয়েকটি বস্তা, পুরোনো হাঁড়ি-পাতিল আর কিছু কাপড়চোপড়—একটি বিদ্যালয়ের বারান্দায় এসব নিয়ে বসে আছেন দুই বৃদ্ধা। বন্যায় ঘর হারিয়ে দুজন বিদ্যালয়টিতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। তবে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ দ্রুত আশ্রয়কেন্দ্রটি ছেড়ে যেতে বলায় বিপাকে পড়েছেন দুজন। ঘর হারিয়ে এখন পরিবার নিয়ে কোথায় থাকবেন, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে তাঁদের।

গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে বান্দরবান সদরের উজানীপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের আশ্রয়কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায় এই দুই বৃদ্ধাকে। বন্যার পানি কমায় সবাই একে একে আশ্রয়কেন্দ্র ছাড়তে শুরু করলেও দুজন নির্বাক হয়ে বসে ছিলেন বিদ্যালয়ের বারান্দায়।

.

ওই দুই বৃদ্ধা হলেন পাইনুচিং মারমা (৬৫) ও গীতা বড়ুয়া (৬০)। সাঙ্গু নদের তীরে পাশাপাশি দুটি ঘরে ছেলে-মেয়ে ও নাতি-নাতনিদের নিয়ে তাঁদের বসবাস ছিল। বন্যায় পাইনুচিং মারমার ঘর পুরোপুরি নদীতে ভেসে গেছে। আর গীতা বড়ুয়ার ঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মেরামত ছাড়া সেখানে বসবাস করা সম্ভব নয়।

.
কাজকর্ম করে, খেয়ে না খেয়ে বেঁচে ছিলাম। ঘর একটা ছিল বলে মাথা গোঁজার ঠাঁই ছিল। এখন সেটাও পানিতে চলে গেল।
পাইনুচিং মারমা, বাসিন্দা, উজানীপাড়া-বান্দরবান
.

গতকাল সরেজমিন উজানীপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, আশ্রয় নেওয়া ৮-১০টি পরিবারের সদস্যরা মালপত্র গুছিয়ে বাড়ি ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তাঁদের দুজন শিরিনা আক্তার ও রনজিৎ মল্লিক। তাঁরা বলেন, বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক কক্ষ ছেড়ে দিতে বলেছেন। তাই সবাই চলে যাচ্ছেন। শুধু পাইনুচিং ও গীতা যেতে পারছেন না।

আশ্রয়কেন্দ্র থেকে ১০০ মিটারের ভেতরেই পাইনুচিং মারমা ও গীতা বড়ুয়ার বাড়ি। পাইনুচিং জানান, ভিটেতে এখন কেবল একটি বাঁশের বেড়া, কয়েক খণ্ড ঢেউটিন আর ভাঙা গাছ পড়ে আছে। সামনে বয়ে চলা সাঙ্গু নদের দিকে তাকিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘নদী সব নিয়ে গেছে। এখন কোথায় যাব জানি না।’

.

পাইনুচিং মারমা জানান, ২০২৩ সালে তাঁর স্বামী মারা যান। নদীর পাড়ের কাঁচা ঘরটিই ছিল তাঁর শেষ সম্বল। সেই ঘরটিই ভেসে গেছে। ৭ জুলাই আশ্রয়কেন্দ্রে ওঠেন তিনি। এত দিন পৌরসভার দেওয়া খিচুড়ি খেয়ে দিন কেটেছে। এখন সেই খাবার বিতরণ বন্ধ হয়ে গেছে। ত্রাণ হিসেবে পাওয়া আট কেজি চালও প্রায় শেষ। এরপর কীভাবে চলবে, সেই উত্তর তাঁর জানা নেই। তিনি বলেন, ‘কাজকর্ম করে, খেয়ে না–খেয়ে বেঁচে ছিলাম। ঘর একটা ছিল বলে মাথা গোঁজার ঠাঁই ছিল। এখন সেটাও পানিতে চলে গেল। আমার ছেলে নেই। দুই মেয়ের বিয়ে হয়েছে, তাঁদের আর্থিক অবস্থাও ভালো না। দুই নাতি আমার সঙ্গে থাকে। তাদের নিয়েই আশ্রয়কেন্দ্রে আছি। নতুন করে ঘর করার সামর্থ্য তো আমার নেই।’

প্রায় একই অবস্থা গীতা বড়ুয়ার। ১৭ বছর আগে তাঁর স্বামীর মৃত্যু হয়েছে। এরপর মানুষের বাসাবাড়িতে কাজ করে দুই ছেলে ও দুই মেয়েকে বড় করেছেন। দুই মেয়ের বিয়ে হয়েছে। বড় ছেলে পক্ষাঘাতগ্রস্ত। তিনি হাঁটাচলা করতে পারেন না। আরেক ছেলে উচ্চমাধ্যমিকে পড়ে। মেয়েদের একজন স্বামী-সন্তান নিয়ে তাঁর সঙ্গেই থাকেন। সবাইকে নিয়েই গীতা বড়ুয়া রয়েছেন আশ্রয়কেন্দ্রে।

.

গীতা বড়ুয়া জানান, তাঁর ঘরে ছোট্ট তিনটি কক্ষ ছিল। সেখানে সবাই মিলে থাকতেন। বন্যায় তাঁদের ঘর পুরোপুরি ভেসে না গেলেও মেরামত ছাড়া সেখানে থাকা সম্ভব নয়। তাঁর কাছে ত্রাণের আট কেজি চাল ছাড়া আর কোনো সম্বল নেই।

স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নদীর পানি বাড়তে শুরু করলে ৭ জুলাই পাইনুচিং মারমা ও গীতা বড়ুয়া বাড়ি ছাড়েন। পরে ৯ জুলাই পাহাড়ি ঢলের তীব্র স্রোতে পাইনুচিং মারমার ঘর ভেসে যায়। গীতা বড়ুয়ার ঘরটি গাছের খুঁটির ওপর নির্মিত হওয়ায় পুরোপুরি ভেসে যায়নি। তবে স্রোতের আঘাতে দুমড়েমুচড়ে গেছে।

জানতে চাইলে উজানীপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা তিংম্যায়ী মারমা গতকাল মুক্তকণ্ঠকে বলেন, পাইনুচিং ও গীতা বড়ুয়ার পরিবারের অসহায় পরিস্থিতি বিবেচনায় বিদ্যালয়ের একটি কক্ষে তাঁদের আরও পাঁচ দিন থাকার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে তাঁদের অন্য কোনো ব্যবস্থা করতে বলা হয়েছে।

জানতে চাইলে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক ও পৌরসভার প্রশাসক এস এম মনজুরুল হক বলেন, গৃহহারা দুই বৃদ্ধা নারীর বিষয়টি জেনেছি। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা তাঁদের আরও কয়েক দিন থাকতে দিয়েছেন। তাঁদের ঘরের বিষয়টি নিয়ে কী করা যায়, তা বিবেচনা করা হচ্ছে।