সুদানের গৃহযুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগে অভিযুক্ত আধা সামরিক বাহিনী র‍্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেসের (আরএসএফ) সরবরাহ নেটওয়ার্কে কয়েকটি পুরোনো বোয়িং উড়োজাহাজের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এসব উড়োজাহাজ পরিচালনা করেছে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর স্পেশাল ফোর্সের সাবেক এক সদস্যের নিয়ন্ত্রণাধীন কয়েকটি কোম্পানি। প্রায় তিন বছর ধরে চলা এই যুদ্ধে অস্ত্র, জ্বালানি ও যোদ্ধা পরিবহনের বিমান চলাচলের তথ্য নিয়ে এটিই প্রথম বড় অনুসন্ধান।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ৬৩ বছর বয়সী স্টিভেন শলিস নামের ওই সাবেক সেনাসদস্যের নিয়ন্ত্রণাধীন প্রতিষ্ঠানগুলো অন্তত তিনটি পুরোনো বোয়িং উড়োজাহাজ পরিচালনা করেছে। এই বিমানগুলো আফ্রিকার চাদ, লিবিয়া ও সোমালিয়ার এমন কিছু বিমানবন্দরে যাতায়াত করেছে, যেগুলোকে আরএসএফ-এর গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহকেন্দ্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

শলিস বর্তমানে সিঙ্গাপুরভিত্তিক সেন্ট্রাল এশিয়া ডেভেলপমেন্ট গ্রুপের (সিএডিজি) প্রধান। গত দুই দশকে তাঁর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান যুক্তরাষ্ট্র সরকার ও জাতিসংঘের কাছ থেকে সামরিক ও উন্নয়ন প্রকল্পে অন্তত ৪১ কোটি ৯০ লাখ ডলারের (প্রায় ৫ হাজার ১১২ কোটি টাকা) কাজ পেয়েছে। "আফগানিস্তানে মার্কিন সেনাদের অবকাঠামো নির্মাণ, ইরাকে সরঞ্জাম সরবরাহ এবং কেনিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তরের বিমানঘাঁটির কাজও করেছে শলিসের প্রতিষ্ঠান সিএডিজি।"

তবে রয়টার্সের অনুসন্ধানে এমন কোনো প্রমাণ মেলেনি যে, শলিস বা তাঁর কোনো প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার আওতায় রয়েছে কিংবা তাঁদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছে।

২০২৫ সালের মে মাসে সুদানের দারফুর অঞ্চলের নিয়ালা বিমানবন্দরে বোয়িং ৭৩৭ মডেলের একটি উড়োজাহাজ বিধ্বস্ত হলে এই অনুসন্ধানের সূত্রপাত হয়। সুদানের সেনাবাহিনীর হামলায় ওই বিমানে থাকা ৫৪ জনের ৫১ জনই আরএসএফ যোদ্ধা ছিলেন। উড়োজাহাজটির পাইলট ও গ্রাউন্ড ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন শলিসের মালিকানাধীন সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক অক্সিডেন্টাল সাপোর্ট সার্ভিসেস প্রতিষ্ঠানের কর্মী। পরবর্তীতে রয়টার্স আরও দুটি বোয়িং ৭২৭ উড়োজাহাজ শনাক্ত করে, যেগুলো যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রাজিল থেকে আফ্রিকায় নেওয়া হয়েছিল এবং শলিস-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে ছিল।

করপোরেট নথি, বিমান নিবন্ধন, স্যাটেলাইট ছবি, ফ্লাইট ট্র্যাকিং এবং ৪০ জনের বেশি বিশেষজ্ঞ ও কূটনীতিকের সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে রয়টার্স জানতে পারে, শলিস-সংশ্লিষ্ট ৩টি উড়োজাহাজ অন্তত ১৬ বার সোমালিয়ার বোসাসো, লিবিয়ার কুফরা এবং দারফুরের নিয়ালায় অবতরণ করেছে। এছাড়া বিমানগুলো দীর্ঘ সময় চাদের রাজধানী এন’জামেনার বিমানবন্দরের সামরিক অংশে অবস্থান করেছিল, যার নিয়ন্ত্রণ দেশটির সেনাবাহিনীর হাতে।

"গত দুই দশকে স্টিভেন শলিসের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান যুক্তরাষ্ট্র সরকার ও জাতিসংঘের কাছ থেকে সামরিক ও উন্নয়ন প্রকল্পে অন্তত ৪১৯ মিলিয়ন ডলারের (প্রায় ৫ হাজার ১১২ কোটি টাকা) কাজ পেয়েছে।"

২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত দারফুরের আল-ফাশির শহর অবরোধের সময় এই সরবরাহপথগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। দীর্ঘ ১৮ মাসের অবরোধ শেষে আরএসএফ শহরটির নিয়ন্ত্রণ নেয়, যা নিয়ে জাতিসংঘ জাতিগত নিধনের অভিযোগ তুলেছে।

শলিস সেনাবাহিনী ছাড়ার পর ২০০২ সালে সিএডিজি প্রতিষ্ঠা করেন। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির দুবাইয়ে বড় গুদাম এবং আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যে কার্যক্রম রয়েছে। জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থার কাছ থেকে প্রতিষ্ঠানটি ১৬ কোটি ডলারের (প্রায় ১ হাজার ৯৫২ কোটি টাকা) বেশি মূল্যের কাজ পেয়েছে। তবে জাতিসংঘের মহাসচিবের মুখপাত্র স্টিফান ডুজারিক রয়টার্সকে জানিয়েছেন, সিএডিজি অতীতে জাতিসংঘের কিছু কাজ করলেও সুদানে এই উড়োজাহাজগুলোর কার্যক্রম সম্পর্কে জাতিসংঘ অবগত নয় এবং বর্তমানে সেখানে সংস্থাটির কোনো কাজ নেই।

নিয়ালায় বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার কয়েক সপ্তাহ পর শলিস-সংশ্লিষ্ট একটি প্রতিষ্ঠান যুক্তরাষ্ট্রের এক ঠিকাদারের কাছ থেকে একটি পুরোনো বোয়িং ৭২৭ কেনে। এছাড়া ব্রাজিল থেকে প্রায় ১০ লাখ ডলারে (প্রায় ১২ কোটি ২০ লাখ টাকা) কেনা আরেকটি বোয়িং ৭২৭ চাদ ও লিবিয়ার কুফরা বিমানবন্দরে দেখা গেছে।

শলিসের দীর্ঘদিনের ব্যবসায়িক সহযোগী ও দক্ষিণ আফ্রিকাভিত্তিক কন্ট্র্যাক্টর এয়ারওয়েজের পরিচালক ক্রেইগ মনরো দাবি করেছেন, তাঁদের প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আরএসএফ-এর কোনো সম্পর্ক নেই এবং উড়োজাহাজগুলো চিকিৎসাসামগ্রী বহনের মতো স্বাভাবিক বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহৃত হয়েছে। তবে উড়োজাহাজগুলোতে নিয়মিত কী পরিবহন হতো বা অর্থ জোগাত কারা, তা নিশ্চিত হতে পারেনি রয়টার্স এবং শলিসও এ বিষয়ে বিস্তারিত জবাব দেননি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নিষেধাজ্ঞার আওতাভুক্ত কোনো গোষ্ঠীকে পরিবহন বা সরবরাহ সহায়তা দেওয়া যুক্তরাষ্ট্র ও জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘনের শামিল হতে পারে। এদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিরুদ্ধে আরএসএফ-কে অস্ত্র ও ভাড়াটে যোদ্ধা দিয়ে সহায়তার অভিযোগ তুললেও আমিরাত তা অস্বীকার করেছে। অন্যদিকে সুদানের সেনাবাহিনী মিসর, তুরস্ক, সৌদি আরব ও কাতারের সমর্থন পেয়েছে।

রয়টার্সের এই অনুসন্ধান স্পষ্ট করে যে, সুদানের গৃহযুদ্ধ কেবল অভ্যন্তরীণ সংঘাত নয়, বরং এর সরবরাহ নেটওয়ার্কে আন্তর্জাতিক ব্যবসায়ী, আঞ্চলিক শক্তি এবং রহস্যময় বিমানপথের এক জটিল সম্পৃক্ততা রয়েছে।