যুক্তরাষ্ট্রের দুটি মানবাধিকার সংগঠন ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছে। তাদের অভিযোগ, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) কর্মকর্তা, জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞ এবং ফিলিস্তিনি অধিকার সংস্থাগুলোর ওপর মার্কিন প্রশাসনের আরোপিত নিষেধাজ্ঞা দেশটির নাগরিকদের সংবিধানের প্রথম সংশোধনীর আওতায় থাকা মতপ্রকাশের অধিকারকে বেআইনিভাবে খুণ্ন করেছে।

গত বুধবার ম্যানহাটানের ফেডারেল আদালতে দায়ের করা এই মামলায় যুক্তি দেওয়া হয়েছে যে, ২০২৫ সালে ফিলিস্তিন-সম্পর্কিত অধিকার আন্দোলনের ওপর আরোপিত ব্যাপক নিষেধাজ্ঞা মার্কিন নাগরিকদের পেশাদার সম্পর্ক ছিন্ন করতে এবং সংবিধানে সুরক্ষিত কাজগুলো ছেড়ে দিতে বাধ্য করছে, যার ফলে এই আন্দোলনগুলোর ওপর ‘গভীর’ নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।

মামলাটি দায়ের করেছে নিউইয়র্কভিত্তিক সংগঠন ‘ট্যাক্সপেয়ার অ্যালায়েন্স এগেইনস্ট জেনোসাইড’ এবং ওয়াশিংটনভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন ‘ডেমোক্রেসি ইন দ্য আরব ওয়ার্ল্ড নাও’ (ডন)। ডন-এর নির্বাহী পরিচালক ওমর শাকির বলেন, ‘কেবল মানবাধিকারকর্মীদের শাস্তি দেওয়ার জন্যই নয়, বরং লাখ লাখ মার্কিন নাগরিকের রাজনৈতিক মতামত প্রকাশকে নিয়ন্ত্রণ (পুলিশিং) করার জন্যও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার মতো একটি স্থূল হাতিয়ারকে ব্যবহার করছে ট্রাম্প প্রশাসন।’

৪৩ পৃষ্ঠার আইনি অভিযোগে জানানো হয়েছে, উভয় সংস্থাই অধিকৃত পশ্চিম তীর ও গাজায় ইসরায়েলি যুদ্ধাপরাধের প্রমাণ নথিভুক্ত করে আইসিসির কাছে জমা দেওয়ার কাজে নিয়োজিত ছিল। এছাড়া ডন তিনটি ফিলিস্তিনি এনজিও এবং জাতিসংঘের বিশেষ দূত ফ্রান্সেসকা আলবানিজের সঙ্গেও কাজ করেছে, যারা বর্তমানে নিষেধাজ্ঞার আওতায় রয়েছেন। মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে, ‘এই কার্যক্রমগুলোর প্রতিটিই বাক্‌স্বাধীনতা এবং সংগঠনের স্বাধীনতার দ্বারা সুরক্ষিত, যা পুরোপুরিভাবে (মার্কিন সংবিধানের) প্রথম সংশোধনীর মূল কাঠামোর মধ্যে পড়ে।’ অভিযোগ করা হয়েছে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের ১৪২০৩ নম্বর নির্বাহী আদেশের কারণে এই কাজ অব্যাহত রাখলে মার্কিন কর্মীদের ফৌজদারি মামলা ও দেওয়ানি জরিমানার মুখে পড়তে হতে পারে।

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও আন্তর্জাতিক আদালতের অস্তিত্ব বিলীন করার হুমকি দেওয়ার ঠিক দুই দিন পর এই আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হলো। যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কয়েকজন আইনবিশেষজ্ঞ এই দাবির পক্ষে সমর্থন জানিয়েছেন। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনজীবী আকিলা রাধাকৃষ্ণান বলেন, ‘বিশ্বজুড়ে ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর সমর্থনে আমার কাজের কিছু কিছু দিক আমাকে বন্ধ করতে হয়েছে।’ তিনি গত বছর আইসিসিকে যৌন ও লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার বিষয়ে পরামর্শ দেওয়ার কাজ বন্ধ করতে বাধ্য হওয়ায় প্রশাসনের বিরুদ্ধে মামলা করেছিলেন। আকিলা আরও বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের এই আক্রমণ আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থার পরিবেশকে ব্যাহত করেছে, যা বিশ্বজুড়ে ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার পাওয়ার সম্ভাবনাকে ধূলিসাৎ করে দিচ্ছে।’

আকিলা রাধাকৃষ্ণান এবং নিউইয়র্কের সাম্প্রতিক আবেদনে দাবি করা হয়েছে, আইসিসির ওপর ট্রাম্পের এই নিষেধাজ্ঞা ‘ইন্টারন্যাশনাল ইমার্জেন্সি ইকোনমিক পাওয়ার্স অ্যাক্ট’-এর অধীনে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতার সীমা লঙ্ঘন করেছে, কারণ ওই আইনে অবাণিজ্যিক ‘ব্যক্তিগত যোগাযোগ’ নিষেধাজ্ঞার আওতামুক্ত রাখা হয়েছে। মামলায় সতর্ক করা হয়েছে, ‘শাসন বিভাগকে (এক্সিকিউটিভ) যদি এখানে সাংবিধানিক ও আইনি সীমাবদ্ধতাগুলো লঙ্ঘন করার অনুমতি দেওয়া হয়, তবে ভবিষ্যতে যেকোনো বিরোধীদের দমাতেও এই আইনকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হতে পারে।’ উদাহরণ হিসেবে বলা হয়েছে, ভবিষ্যতে কোনো প্রেসিডেন্ট জ্বালানির দামের দোহাই দিয়ে ‘জাতীয় জরুরি অবস্থা’ ঘোষণা করে জলবায়ুকর্মীদের বিদেশি গোষ্ঠীর সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দিতে পারেন।

এই মামলায় বিবাদী করা হয়েছে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও, অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট, ভারপ্রাপ্ত অ্যাটর্নি জেনারেল টড ব্ল্যাঞ্চ এবং অফিস অব ফরেন অ্যাসেটস কন্ট্রোলের পরিচালক ব্র্যাড স্মিথকে।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের সাবেক নির্বাহী পরিচালক কেনেথ রথ বলেন, ‘ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের জাতিগত নিধন ও যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে বিচারের আওতায় আনার প্রচেষ্টা থেকে তাদের রক্ষায় ট্রাম্প প্রশাসন যে অস্বাভাবিক ক্ষমতা ব্যবহার করছে, তা এমনিতেই যথেষ্ট উদ্বেগজনক।’ তিনি আরও বলেন, ‘এ ধরনের প্রচেষ্টায় সহায়তা করার জন্য ট্রাম্প যেভাবে মার্কিন নাগরিক ও বাসিন্দাদের হুমকি দিচ্ছেন, তা স্পষ্টতই অসাংবিধানিক।’