বাংলাদেশে স্বাস্থ্য গবেষণার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে ব্যাপক আলোচনা হলেও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার সঙ্গে তথ্যের সংযোগের অভাব প্রকট। নীতিনির্ধারক, বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণাপ্রতিষ্ঠান এবং উন্নয়ন সহযোগীরা গবেষণার গুরুত্ব স্বীকার করলেও প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে, এই গবেষণার ফল গ্রামীণ ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জীবনে কতটা পরিবর্তন আনতে পারছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের স্বাস্থ্য গবেষণা পিছিয়ে থাকার অন্যতম প্রধান কারণ হলো মাঠভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবা, নিয়মিত তথ্য সংগ্রহ এবং গবেষণার মধ্যে কার্যকর সংযোগের অভাব। দেশে পর্যাপ্ত বাস্তবভিত্তিক স্বাস্থ্যচর্চার অভাব থাকায় ধারাবাহিক ও নির্ভরযোগ্য তথ্য উৎপন্ন হচ্ছে না, যার ফলে গবেষকেরা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর প্রকৃত স্বাস্থ্যচিত্র বুঝতে পারছেন না।

দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা এখনো পুরোপুরি ইলেকট্রনিক তথ্যব্যবস্থার আওতায় আসেনি। হাসপাতাল, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, কমিউনিটি ক্লিনিক এবং বেসরকারি চিকিৎসাকেন্দ্রে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক রোগী সেবা নিলেও তাঁদের রোগের ইতিহাস, চিকিৎসা, পরীক্ষার ফলাফল এবং দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য পরিণতির তথ্য সমন্বিতভাবে সংরক্ষিত হচ্ছে না। ফলে নির্দিষ্ট অঞ্চলে কোন রোগ বাড়ছে বা কোন সামাজিক কারণে স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হচ্ছে, তা জানা কঠিন হয়ে পড়ছে। সঠিক স্বাস্থ্য প্রোফাইল ছাড়া কার্যকর পরিকল্পনা ও নীতি প্রণয়ন সম্ভব নয়।

সরকার ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিয়মিত গবেষণা পরিচালনা করলেও গবেষণাগারের সিদ্ধান্ত ও শ্রেণিকক্ষের তত্ত্বের সঙ্গে মাঠের বাস্তবতার বড় ব্যবধান রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা কেবল একাডেমিক প্রকাশনাতেই সীমাবদ্ধ থাকে; এর ফলাফল স্থানীয় স্বাস্থ্যকর্মী বা নীতিনির্ধারকদের কাছে পৌঁছায় না। অন্যদিকে, মাঠপর্যায়ে কর্মরতদের অভিজ্ঞতা গবেষণার প্রশ্ন নির্ধারণে খুব কমই ব্যবহৃত হয়, ফলে গবেষণার বিষয়গুলো অনেক সময় বাস্তব সমস্যার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয় না।

আমাদের গ্রাম ক্যানসার কেয়ার অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টারের প্রতিষ্ঠাকালীন পরিচালক রেজা সেলিম তাঁর প্রায় ৩০ বছরের রামপালভিত্তিক ‘আমাদের গ্রাম’ স্বাস্থ্য কার্যক্রমের অভিজ্ঞতা থেকে বলেন, গবেষণার সূচনা হওয়া উচিত স্থানীয় সমস্যা বোঝার মধ্য দিয়ে। স্থানীয় মানুষ কী ধরনের রোগে ভুগছেন, চিকিৎসাসেবা নিতে তাঁদের কী বাধা রয়েছে, রোগ সম্পর্কে তাঁদের ধারণা কী, অর্থনৈতিক অবস্থা চিকিৎসার সিদ্ধান্তকে কীভাবে প্রভাবিত করছে এবং পরিবেশগত পরিবর্তন কীভাবে রোগের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে—এসব বিষয় স্থানীয়ভাবে বুঝতে হবে।

তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, মাঠ থেকে সংগৃহীত তথ্য শুধু গবেষণাপত্র প্রকাশের উপকরণ নয়, বরং এটি স্থানীয় স্বাস্থ্য-পরিকল্পনা এবং জাতীয় স্বাস্থ্যনীতিতে অবদান রাখতে পারে। নিচ থেকে ওপরের দিকে তথ্যপ্রবাহ তৈরি না হলে স্বাস্থ্যনীতি অনেক সময় সাধারণ অনুমান বা অসম্পূর্ণ তথ্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।

বিশেষ করে উপকূলীয় এলাকা, উত্তরাঞ্চল, শহর এবং প্রত্যন্ত গ্রামের রোগপ্রবণতা ভিন্ন হওয়ায় কেবল জাতীয় গড়ের ওপর নির্ভর করলে স্থানীয় বৈষম্য আড়ালে থেকে যায়। আঞ্চলিক তথ্য বিশ্লেষণ করলে রোগের কারণ ও প্রতিরোধের উপায় সম্পর্কে কার্যকর সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব।

বর্তমানে হৃদ্‌রোগ, ক্যানসার, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, কিডনির রোগ এবং দীর্ঘমেয়াদি শ্বাসতন্ত্রের মতো অসংক্রামক রোগ (এনসিডি) বড় ঝুঁকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এসব রোগের ক্ষেত্রে রোগীর বয়স, ওজন, রক্তচাপ, পারিবারিক ইতিহাস ও জীবনযাত্রার তথ্য দীর্ঘ মেয়াদে সংরক্ষণ করা গেলে গুরুত্বপূর্ণ গবেষণার সুযোগ তৈরি হয় এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে চিহ্নিত করা সহজ হয়।

তবে তথ্য সংগ্রহের পাশাপাশি তথ্যের মান, গোপনীয়তা, নিরাপত্তা এবং নৈতিক ব্যবহার নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশে একটি সমন্বিত স্বাস্থ্য গবেষণা কাঠামো প্রয়োজন, যেখানে বিশ্ববিদ্যালয় পদ্ধতিগত দক্ষতা দেবে, মাঠপর্যায়ের প্রতিষ্ঠান বাস্তব তথ্য দেবে, প্রযুক্তিবিদেরা ইলেকট্রনিক ব্যবস্থা তৈরি করবেন এবং সরকার সেই ফলাফলকে নীতিতে রূপান্তর করবে।

গ্রামীণ বাংলাদেশকে কেবল নমুনা সংগ্রহের জায়গা হিসেবে না দেখে গ্রামবাসীদের গবেষণার অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করার আহ্বান জানানো হয়েছে। স্বাস্থ্য গবেষণা তখনই অর্থবহ হবে, যখন এর ফল দেশের সবচেয়ে অবহেলিত ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জীবনে প্রভাব ফেলবে। গবেষণাপত্র বা সেমিনারের চেয়ে গ্রামের একজন দরিদ্র রোগীর রোগ প্রতিরোধ ও মানসম্মত চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ বৃদ্ধি করা বেশি জরুরি।

পরিশেষে, মাঠের স্বাস্থ্যচর্চা, ইলেকট্রনিক তথ্যব্যবস্থা, একাডেমিক গবেষণা এবং সরকারি নীতিনির্ধারণকে একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার মধ্যে আনলে তবেই বাংলাদেশের স্বাস্থ্য গবেষণা বাস্তব পরিবর্তনের শক্তি হয়ে উঠবে।