২০২২ বিশ্বকাপের ফাইনাল। লুসাইল স্টেডিয়ামে তখনো বিরতির বাঁশি বাজেনি। চতুর্থ রেফারি সাবস্টিউশন বোর্ড উঁচিয়ে ঘোষণা দিয়ে জানান, উসমান দেম্বেলেকে বদলি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন ফ্রান্সের কোচ দিদিয়ের দেশম।
দেম্বেলের আগের ৪১ মিনিটের পারফরম্যান্সের পরিসমাপ্তি ঘটে ঠিকই; তবে পরিস্থিতি আরও খারাপ দিকে যায়। আনহেল দি মারিয়াকে করা দেম্বেলের ফাউলে পাওয়া পেনাল্টি থেকে গোল করে এগিয়ে যায় আর্জেন্টিনা, এবং ব্যবধান প্রথমার্ধ শেষ হওয়ার আগেই দাঁড়ায় ২–০।
বিরতির সময় ফ্রান্সের ফুটবলাররা ড্রেসিংরুমে ফেরার পর উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। ক্ষোভ প্রকাশ করে কোচ দিদিয়ের দেশম বলেন, ‘তোমাদের দেখে একদমই মনে হচ্ছে না ফাইনালে খেলছ!’ সেদিন ফ্রান্সের হয়ে পরে হ্যাটট্রিক করা কিলিয়ান এমবাপ্পে তখন হতাশা নিয়েই ভাবেন। সতীর্থদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘তোমরা এসব কী করছ! বিশ্বকাপ কিন্তু প্রতি চার বছরে একবার আসে!’
ড্রেসিংরুমের এক কোণায় বসে ওইসব কথা শুনে ফেলা ছাড়া দেম্বেলের তখন আর কিছু করার ছিল না। বিশ্বকাপ ফাইনাল—যেটার মতো বড় মঞ্চে তাঁর যাত্রা—প্রথমার্ধ শেষ হওয়ার আগেই থেমে গিয়েছিল। এর পর দেম্বেলের মনে ঘুরপাক খাচ্ছিল প্যারিস স্কয়ারে জড়ো হওয়া মানুষদের কথা, যাঁদের তিনি হতাশ করেছেন। বিশেষজ্ঞের মাইক্রোফোনের সামনে গ্যারি নেভিলও ততক্ষণে মন্তব্য করেছিলেন, ‘ও তো ছোট বাচ্চাদের মতো খেলল!’ পরদিন ফ্রান্সের দৈনিক লেকিপ দেম্বেলের পারফরম্যান্সকে দশের মধ্যে শূন্য দিয়ে শিরোনাম করে ‘দেম্বেলে, মহাবিপর্যয়’।
গত বিশ্বকাপের সেই ঘটনাকে কেন্দ্র করে গত মাসে এক সাক্ষাৎকারে কথা বলেছেন দেম্বেলে। তিনি জানান ‘দেশকে ডুবিয়ে দেওয়া’র পর নিজের যন্ত্রণাদায়ক অনুভূতির কথা, ‘সত্যি বলতে, পরের দিন সকালে আমার মনে হচ্ছিল, ফুটবল খেলাটা আর কখনো দেখতেই পারব না।’ আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে তাঁর বিদায়ঘণ্টা কি লুসাইলেই বেজে উঠেছিল—সেই সংশয়ও তখন তাঁর মনে ছিল বলে জানা যায়। সময়ের ঘড়ি তখন এগিয়েছে সাড়ে তিন বছর। স্পেনের বিপক্ষে আজ ফ্রান্সের হয়ে দেম্বেলে যখন আরও একটি বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল খেলতে নামবেন, তিনি দুবার চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জেতা ফুটবলার—এবং জিতেছেন ব্যালন ডি’অরও।
এবারের বিশ্বকাপে অপ্রতিরোধ্য ফ্রান্সের আক্রমণের অবিচ্ছেদ্য অংশ দেম্বেলে। ছয় ম্যাচে পাঁচটা গোল করেছেন, আছে দুটি অ্যাসিস্টও। সামনের ডিসেম্বরে আরও একটি ব্যালন ডি’অর ঘরে তোলার সব সম্ভাবনাও সামনে রাখছেন তিনি।
দেম্বেলের এই প্রত্যাবর্তনকে কী বলা যায়—রাজকীয়ই বলছেন অনেকে। ফিরে আসার গল্পটাও যেন তেমনই। তিনি এখন ভারমুক্ত, দলের তাঁর প্রতি আছে অগাধ আস্থা, নিজের ওপর আছে আত্মবিশ্বাস। সতীর্থদের জন্যই খেলছেন তিনি।
যদিও বিশ্বকাপ শুরুর আগে দেম্বেলেকে ঘিরে জোর গুঞ্জন উঠেছিল তাঁর আর এমবাপ্পের দ্বন্দ্ব নিয়ে। তবে সময়ের সঙ্গে সেই ধারণা উবে গেছে বলেই প্রতীয়মান। এমবাপ্পের পাস থেকে দেম্বেলে গোল করেছেন, আবার দেম্বেলেও একের পর এক পাস বাড়িয়েছেন এমবাপ্পের জন্য। প্রথম ম্যাচে সেনেগালের বিপক্ষে গোল না পেয়ে সমালোচিত হলে অধিনায়ক এমবাপ্পেই দাঁড়িয়েছেন দেম্বেলের পাশে।
বড় টুর্নামেন্টে ১৯ ম্যাচে গোলশূন্য থাকার প্রসঙ্গেও দেম্বেলেকে নিয়ে এমবাপ্পে মন্তব্য করেছিলেন, ‘আক্রমণভাগে আমাদের চারজনের মধ্যে দেম্বেলেই সেরা। ও খারাপ খেলেছে, এমন কথার সঙ্গে আমি একমত নই।’ স্প্যানিশ ফুটবল ম্যাগাজিন দোন বালোন দেম্বেলেকে নিয়ে লিখেছিল, তিনি নাকি ‘বিষণ্ন, উদাসীন ও অতিরিক্ত মাত্রায় স্বার্থপর।’ আর আর্জেন্টাইন কোচ হোর্হে সাম্পাওলি বলেছেন, ‘অন্যদেরকে মাঠে ভালো খেলানোর কোনো ক্ষমতাই তার নেই, সে কেবল নিজে একা জ্বলে উঠতে জানে।’
ফ্রান্স বা পিএসজির সাম্প্রতিক বাস্তবতায় দেম্বেলের ভূমিকার দিকে তাকিয়ে দেখা যায় ভিন্ন চিত্র। গত দুই বছরে সতীর্থদের কাছ থেকে সেরাটা বের করে আনতে দেম্বেলের চেয়ে এগিয়ে রাখার মতো কাউকে খুঁজে পাওয়া কঠিন—এমন কথাই উঠে আসে বিশ্লেষণে। এমবাপ্পে ও ওলিসের সঙ্গে দলের ডাইনিং টেবিলের সবচেয়ে ভালো আসনটাও এখন বরাদ্দ থাকে তাঁর জন্যই।
দেম্বেলে এখন আগের মতোই কিছুটা অলস, আড্ডাবাজ এবং রসিক। তাঁর দেওয়া ‘মবুতু’ ডাকনাম থেকেই এমবাপ্পের ‘স্বৈরাচার’ মিমসগুলো ছড়িয়ে পড়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। তবে সময়ের সঙ্গে নিজেকে গড়েপিটে দেম্বেলে এখন দলে ভূমিকা রাখতে পারেন—সতীর্থদের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে টেনে নিয়ে যান দলকে।
সাড়ে তিন বছর আগের সেই ‘ছোট্ট ছেলেটা’ এখন এতটাই বড় হয়ে গেছেন যে এই বিশ্বকাপে দলের হয়ে একমাত্র হ্যাটট্রিকটিও তাঁর। আজ সেমিফাইনালে তাই এমবাপ্পে–ওলিসদের মতো প্রত্যাশা থাকবে দেম্বেলেকে ঘিরেও।
ফ্রান্স কোচ বললেন, স্পেনই ফেবারিট






