আয়তনের দিক দিয়ে ক্ষুদ্র রাষ্ট্র হওয়া সত্ত্বেও বিপুল সম্পদ ও আন্তর্জাতিক প্রভাবের মাধ্যমে কাতারকে একটি শক্তিশালী রাষ্ট্রে পরিণত করার পেছনে প্রধান কারিগর ছিলেন সাবেক আমির শেখ হামাদ বিন খলিফা আল থানি। বর্তমান আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল-থানির পিতা এবং কাতারে 'বাবা আমির' হিসেবে পরিচিত এই নেতার মৃত্যুর খবর গতকাল রোববার আমিরের কার্যালয় থেকে এক বিবৃতিতে জানানো হয়। তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৪ বছর।

রাজধানী দোহার ইমাম মুহাম্মদ ইবন আবদ আল-ওয়াহাব মসজিদে মাগরিবের নামাজের পর কোনো আড়ম্বর ছাড়াই তাঁর জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরিহিত শোকাহত মানুষের উপস্থিতিতে জানাজা শেষে বর্তমান আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল-থানি ও পরিবারের ঘনিষ্ঠ সদস্যরা মরদেহটি মসজিদ থেকে বের করে নিয়ে যান। পরবর্তীতে দোহার উত্তরে অবস্থিত লুসাইল কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়।

উপসাগরীয় অঞ্চলের একটি প্রান্তিক রাষ্ট্র থেকে কাতারকে রাজনৈতিক, কূটনৈতিক ও মানবিক ক্ষেত্রে প্রভাবশালী শক্তিতে রূপান্তর করার পেছনে শেখ হামাদের দূরদর্শী দৃষ্টিভঙ্গি কাজ করেছে। ১৯৯৫ সালে ক্ষমতা গ্রহণের আগেই তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে, কাতারের প্রচলিত শক্তির উপাদান সীমিত এবং দেশের প্রভাব বাড়াতে ‘সফট পাওয়ার’–এ বিনিয়োগ করা প্রয়োজন। এই লক্ষ্যেই তিনি শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বৈজ্ঞানিক গবেষণা, ক্রীড়া এবং জ্বালানি খাতে বড় বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করেন, যা দেশের সম্পদকে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক প্রভাবের হাতিয়ারে পরিণত করে।

তাঁর শাসনামলে কাতার মধ্যপ্রাচ্যে এক অনন্য কূটনৈতিক অবস্থান তৈরি করে। পূর্ব ভূমধ্যসাগর থেকে হর্ন অব আফ্রিকা পর্যন্ত বিস্তৃত বিভিন্ন সংঘাত নিরসনে কাতার সফল মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করেছে। ২০০৮ সালে লেবাননের নেতাদের মধ্যে ঐতিহাসিক চুক্তি সম্পাদনে দোহা সহায়তা করে, যা দেশটিকে গৃহযুদ্ধের হাত থেকে রক্ষা করে। এছাড়া সুদানের দারফুর সংকটে ৩০ মাস আলোচনার পৃষ্ঠপোষকতা করার মাধ্যমে ২০১১ সালে ‘দোহা ডকুমেন্ট ফর পিস’ স্বাক্ষরিত হয়। ইয়েমেন, সোমালিয়া, ইরিত্রিয়া ও জিবুতির মধ্যকার বিরোধ মীমাংসায়ও কাতার বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।

ফিলিস্তিন ইস্যুতেও শেখ হামাদের ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। ২০১২ সালে ইসরায়েলি যুদ্ধের পর গাজা উপত্যকা সফরকারী প্রথম আরব নেতা ছিলেন তিনি, যেখানে তিনি ৪০ কোটি ডলারের অনুদানের মাধ্যমে আবাসন ও পুনর্গঠন প্রকল্প শুরুর ঘোষণা দিয়েছিলেন। এছাড়া হামাস ও ফাতাহর মধ্যে সংলাপ অব্যাহত রাখতে কাতার পৃষ্ঠপোষকতা করে যাচ্ছে।

কূটনৈতিক কৌশলের অংশ হিসেবে শেখ হামাদের সময়েই কাতার আল-উদেইদ সামরিক ঘাঁটি প্রতিষ্ঠা করে। এই বিষয়ে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, "শেখ হামাদের শাসনামলেই কাতার আল উদেইদ সামরিক ঘাঁটি প্রতিষ্ঠা করে। বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সামরিক উপস্থিতি রয়েছে এই আল উদেইদ সামরিক ঘাঁটিতে। একই সঙ্গে কাতার রাজধানী দোহায় হামাস নেতৃত্বকেও আশ্রয় দেয়। আল উদেইদ সামরিক ঘাঁটি থেকে দোহা খুব দূরে নয়।"

আঞ্চলিক রাজনীতিতে কাতারের অবস্থান সম্পর্কে বলা হয়েছে, "উপসাগরীয় এই দেশ ‘আরব বসন্ত’ আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানিয়েছিল এবং এমন নীতি গ্রহণ করেছিল, যা স্পষ্টভাবে এই অঞ্চলের জনগণের স্বাধীনতা ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের অধিকারের পক্ষে ছিল।"

সংঘাতের সব পক্ষের সঙ্গে, এমনকি ইসরায়েলের সঙ্গেও যোগাযোগের পথ খোলা রাখা কাতারের রাজনৈতিক কৌশলের অংশ ছিল। অর্থনৈতিক আধুনিকায়নের পাশাপাশি একটি স্বতন্ত্র রাজনৈতিক পরিচয় গড়ে তোলার স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে করতে ২০১৩ সালে তিনি ক্ষমতা থেকে সরে দাঁড়ান এবং তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন পুত্র শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানি।