জাপানের ২০২১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী ছিলেন ফুমিও কিশিদা। একই সময়ে তিনি ক্ষমতাসীন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) প্রেসিডেন্টও ছিলেন। এর আগে ২০১২ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত কিশিদা দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে তাঁকে এলডিপির প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ হিসেবেই দেখা হয়।
প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে কিশিদাকে করোনা মহামারির চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়েছে। পাশাপাশি সাবেক প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে হত্যাকাণ্ড, ইউনিফিকেশন গির্জা এবং এলডিপির অভ্যন্তরীণ অর্থ কেলেঙ্কারিসহ একাধিক জটিল পরিস্থিতির সাথেও তাঁকে সংশ্লিষ্ট থাকতে হয়। ২০২২ সালে ইউক্রেনে রুশ আক্রমণের প্রেক্ষাপটে প্রথম জাপানি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোর শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দেন কিশিদা।
২০২৩ সালে গোপনে ইউক্রেন সফর করেন তিনি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর কোনো জাপানি প্রধানমন্ত্রীর সক্রিয় যুদ্ধক্ষেত্রে প্রথম সফর হিসেবে ওই সফরের কথা বলা হয়। একই বছর সফলভাবে হিরোশিমায় জি-৭ শীর্ষ সম্মেলন আয়োজন করে জাপান। ঘটনাবহুল সময় পাড়ি দিয়ে ২০২৪ সালে কিশিদা পদত্যাগ করেন; তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন শিগেরু ইশিবা।
দলীয় ও সরকারপ্রধানের পদ ছাড়লেও কিশিদা কূটনীতি ও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে সক্রিয় রয়েছেন বলে বিভিন্ন পর্যবেক্ষণে এসেছে। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির বিশেষ দূত হিসেবে তিনি ফিলিপাইন সফর করেছেন। পদত্যাগের পরও তাঁর চলমান কূটনৈতিক ভূমিকার ইঙ্গিতবাহী হিসেবেই এই সফরকে দেখা হচ্ছে। জাপানের রাজনীতিতে আবারও প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব হিসেবে কিশিদার ভূমিকা জোরদার হওয়ার কথা আলোচনায় আছে।
রাজধানী টোকিওতে বিদেশি সাংবাদিকদের ক্লাব এফসিসিজেতে গত ২৬ জুন কিশিদা উপস্থিত হন। সেখানে তিনি ‘অনিশ্চিত বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে জাপানের কূটনীতি’ বিষয়ে বক্তব্য দেন। ইউক্রেন আর ইরান যুদ্ধের পাশাপাশি জাপানের চারপাশে চীন-রাশিয়ার সক্রিয় সামরিক উপস্থিতি এবং চলমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যে তাঁর বক্তব্যের প্রতি আগ্রহ দেখা যায় সেখানকার সাংবাদিকদের মধ্যে।
বক্তব্যে কিশিদা বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতিবন্ধকতা এবং ভবিষ্যতে জাপানি কূটনীতি কেমন হওয়া উচিত—এসব বিষয়েও নিজের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন।
সাম্প্রতিক ইতিহাসের গতিধারা
কিশিদা বলেন, শীতল যুদ্ধের অবসানের পর আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দুতে এককভাবে চলে আসে যুক্তরাষ্ট্র। সেই সময় বিশ্ব কিছুটা শান্ত ও স্থিতিশীল সময় উপভোগ করলেও সেটি দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। বিশেষ করে চীনের সামরিক ও অর্থনৈতিক উত্থান কৌশলগত প্রেক্ষাপট বদলে দেয়।
বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার কথাও উল্লেখ করেন তিনি। কিশিদার মতে, এর কেন্দ্র ছিল মূলত অসাম্য ও বিভাজন; বৈশ্বিক প্রতিবন্ধকতাগুলো ব্যাপক আকার ধারণ করে। ধীরে ধীরে ক্ষমতার ভারসাম্যও বদলে যেতে থাকে। এটিকে আরও জটিল করে তোলে ইউক্রেনে রুশ আক্রমণ।
কিশিদার মতে, এটি বল প্রয়োগের মাধ্যমে স্থিতাবস্থার পরিবর্তন—যা জাতিসংঘ স্বীকৃত আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার মৌলিক নীতির লঙ্ঘন। চার বছরের বেশি সময় পরও এ লড়াই চলছে এবং বিশ্ব ভুক্তভোগী হচ্ছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন। তাঁর বক্তব্যে আসে, এর মধ্য দিয়ে স্নায়ুযুদ্ধ-পরবর্তী যুগের অবসান ঘটছে—এমন এক সন্ধিক্ষণ, যা মানব ইতিহাসের পরবর্তী অধ্যায়ের আদলকে নির্ধারণ করবে।
‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির প্রত্যাবর্তন
যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ পরিবর্তন প্রসঙ্গেও কিশিদার বক্তব্যে গুরুত্ব পায়। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ক্ষমতায় ফিরে আসা আবারও ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতিকে দেশটির পররাষ্ট্রনীতির কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। তবে কিশিদা বর্তমান পরিস্থিতিকে আরও বৃহত্তর দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার পক্ষপাতী।
জাপানের সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান নীতিমালা মার্কিন জনগণের একটি অংশের সমর্থন পেয়েছে। তাই এটিকে কেবল একজন নেতার ব্যক্তিত্ব দ্বারা প্রভাবিত একটি অস্থায়ী ঘটনা হিসেবে দেখাটা ঠিক হবে না। একে আরও গভীর ও কাঠামোগতভাবে দেখতে হবে—এমন কথাও বলেন তিনি। তাঁর মতে, এটি এমন এক প্রবণতা, যা যুক্তরাষ্ট্রসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আগামী বছরগুলোয় মোকাবিলা করতে হবে।
কিশিদা আরও বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন অংশে চরম ডানপন্থী রাজনৈতিক শক্তির উত্থান ঘটেছে; কোথাও কোথাও প্রবল হচ্ছে অন্তর্মুখী প্রবণতা। তিনি জানান, এসব ঘটনাপ্রবাহ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার দাবি রাখে, কারণ এগুলো বর্তমান আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার গভীরে বিদ্যমান হতাশা ও উদ্বেগের প্রতিফলন।
জাপানের সামনে কোন পথ
কিশিদা বলেন, পরিবর্তনশীল বিশ্বের জনবিন্যাস দ্রুত বদলাচ্ছে। আগামী ৫০ বছরে জাপানসহ অনেক উন্নত অর্থনীতির দেশই বয়স্ক জনগোষ্ঠী এবং ক্রমহ্রাসমান জন্মহারের মুখোমুখি হবে। এই নতুন প্রেক্ষাপটে এশিয়া ও আফ্রিকার দেশগুলো তাদের বৃহত্তর অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে কাজে লাগাবে বলে তাঁর পর্যবেক্ষণ। একইসঙ্গে বিশ্ব পরিসরে এমন পরিবর্তনশীল ভবিষ্যৎ দেখা দিচ্ছে বলেও তিনি জানান।
এ অবস্থায় জাপানের সামনে কোন পথ খোলা আছে—এ প্রশ্নের উত্তর হিসেবে কিশিদা বলেন, এর উত্তরটি সহজ। সেটি হচ্ছে, আইনের শাসনের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান। তাঁর ভাষায়, অর্থাৎ বহুপক্ষীয়তা, স্বাধীনতা, গণতন্ত্র, মুক্ত ও অবাধ বাণিজ্যের পক্ষে অবস্থান নেওয়া। এসব মূল্যবোধের ওপর ভিত্তি করেই অংশীদারত্ব গড়ে তোলার কথা বলেন কিশিদা। দেশগুলোকে একত্র করা এবং তাদের মধ্যে সেতুবন্ধ হিসেবে কাজ করাও গুরুত্বপূর্ণ বলে তাঁর মত।
প্রাকৃতিক সম্পদ ও অভ্যন্তরীণ বাজারের সীমাবদ্ধতা থাকায় জাপানের মতো দ্বীপরাষ্ট্রের জন্য এই নীতি ও মূল্যবোধ ছাড়া ভবিষ্যতের সুরক্ষা সম্ভব নয় বলেও উল্লেখ করেন তিনি। আবার অস্থিতিশীল নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে দৃঢ়তার সঙ্গে জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করা ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প নেই বলে কিশিদার বক্তব্য। ফলে বিশ্বের প্রধান শক্তিগুলোর সঙ্গে বিচক্ষণতার সঙ্গে কাজ করার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন তিনি।
কিশিদা বলেন, জাপানকে কূটনৈতিকভাবে দুটি পর্যায়ে এগোতে হবে। প্রথমত, আদর্শের অনুসরণ। দ্বিতীয়ত, প্রজ্ঞা ও দৃঢ়তার সঙ্গে বাস্তবতার মোকাবিলা করা। জাপানের কূটনীতির ভবিষ্যৎ এই দুইয়ের সমন্বয়ের মধ্যেই নিহিত বলে তাঁর বক্তব্য—যেখানে কূটনীতি হবে নীতিভিত্তিক এবং পরিচালিত হবে জাতীয় স্বার্থের দ্বারা।
কিশিদা আরও বলেন, ‘পারমাণবিক অস্ত্রহীন বিশ্ব কোনো কল্পনা নয়, এটি একটি আদর্শ। একটি আদর্শকে ধাপে ধাপে বাস্তবসম্মতভাবে অনুসরণ করতে হয়।’
আগামী দিনে করণীয় কী
কিশিদা এসব ধারণাকে বাস্তবে পরিণত করার একটি রূপরেখাও তুলে ধরেন। তাঁর মতে, আন্তর্জাতিক শৃঙ্খলা চাপের মুখে থাকায় রাজনীতিতে এমন ধারণা প্রয়োজন, যা মানুষকে একত্র করে এবং স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনে। এর কেন্দ্রে মানবিক মর্যাদার বিষয়টি থাকবে বলেই তিনি মনে করেন।
জাপানের সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ কারণে জাপান দীর্ঘদিন ধরেই মানব নিরাপত্তার ধারণাকে সমর্থন করে আসছে। জাতিসংঘ সনদে অন্তর্ভুক্ত নীতি ও মূল্যবোধকে সমুন্নত রাখাই জাপানের অঙ্গীকার। সারা বিশ্বের উচিত সেই অঙ্গীকারের দিকে ফিরে যাওয়া।
তিনি বলেন, একটি মুক্ত ও অবাধ প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের যে দৃষ্টিভঙ্গি জাপান কয়েক দশক ধরে ধারণ করে আসছে, সেটার মূলেও এমন চিন্তাধারা আছে। কিশিদা জানান, এর মূলনীতি সমষ্টিকে শক্তিশালী করা, সমৃদ্ধিকে উৎসাহিত করা, জবরদস্তি ও ভীতি প্রদর্শনকে প্রত্যাখ্যান করা এবং এমন দৃষ্টিভঙ্গি লালন করা, যা স্বাধীনতা ও আইনের শাসনকে সম্মান করে।
কিশিদা আরও বলেন, ‘আমাদের অবশ্যই সেই নীতিগুলোকে সমুন্নত রাখতে হবে, যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে শান্তি আর সমৃদ্ধির ভিত্তি স্থাপন করেছে। একই সঙ্গে, জাপানকে অবশ্যই সেসব পরাশক্তির বিরুদ্ধে দৃঢ়তার সঙ্গে জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করতে হবে, যারা বলপূর্বক স্থিতাবস্থা পরিবর্তন করতে চায়। এই প্রতিশ্রুতি আমাদের সময়ের দাবি।’
বিশ্ব সম্প্রদায় যাতে আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলে, আইনের শাসন সমুন্নত রাখে এবং বহুপক্ষীয়তা ও মুক্ত বাণিজ্য ব্যবস্থা বজায় রাখে—সেসব নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন কিশিদা। তাঁর মতে, সীমিত প্রাকৃতিক সম্পদ থাকা জাপানের মতো দুর্বল দেশগুলোর সুরক্ষার জন্য আন্তর্জাতিক আইন হলো রক্ষাকবচ।