বিশ্বকাপে এরই মধ্যে ১০০টি ম্যাচ শেষ হয়েছে। এক মাসের বেশি সময় ধরে এসব খেলায় দেখা মিলেছে রোমাঞ্চকর ফুটবলের। এখন টুর্নামেন্ট শেষের পথে; ফাইনালসহ বাকি মাত্র ৪টি ম্যাচ। এই চার ম্যাচের মধ্যেই শিরোপা লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে আর্জেন্টিনা, ইংল্যান্ড, স্পেন ও ফ্রান্স—এই চার দলই।
বিশ্বকাপ শুরুর আগে ঠিক এই চারটি দলকে সেমিফাইনালে দেখা হবে বলে জানিয়েছিল অপটার সুপারকম্পিউটার। এবার শিরোপা কার হাতে উঠতে পারে—সেই সম্ভাবনাও নতুন করে হিসাব করে দেখিয়েছে তারা।
অপটার সুপারকম্পিউটারের পূর্বাভাস অনুযায়ী, বিশ্বকাপ জয়ের সবচেয়ে বেশি সম্ভাবনা ফ্রান্সের। উত্তর আমেরিকায় দিদিয়ের দেশমের দলটিও এখন পর্যন্ত দারুণ ছন্দে আছে। আক্রমণভাগে নেতৃত্ব দিচ্ছেন কিলিয়ান এমবাপ্পে। এই বিশ্বকাপে লিওনেল মেসির সঙ্গে যৌথভাবে সর্বোচ্চ ৮ গোল করেছেন তিনি। উসমান দেম্বেলেও ৫ গোলের অবদান রেখেছেন। মরক্কোর বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালে দুজনই গোল করে ফ্রান্সকে সেমিফাইনালে তুলেছেন।
একই বিশ্বকাপে দুই খেলোয়াড়ের ৫ বা তার বেশি গোল করার কীর্তি গত ৫০ বছরে খুব কমবারই দেখা গেছে। ফ্রান্সের আগে ২০০২ বিশ্বকাপে ব্রাজিলের হয়ে রোনালদো ৮ গোল, রিভালদো ৫ করেছিলেন। তবে এবার এই কীর্তি গড়েছে ইংল্যান্ডও। তাদের হয়ে হ্যারি কেইন ও জুড বেলিংহাম—দুজনই করেছেন ৬টি করে গোল।
অপটার সুপারকম্পিউটার বাকি ম্যাচগুলো নিয়ে মোট ২৫ হাজারবার সম্ভাব্য ফলাফল বিশ্লেষণ করেছে। তাদের হিসাবে ৫৭.৭ শতাংশ ক্ষেত্রে ফ্রান্স স্পেনকে হারিয়ে টানা তৃতীয়বারের মতো ফাইনালে উঠবে। পাশাপাশি ৩৪ শতাংশ সম্ভাবনায় ফরাসিরাই শিরোপা জিতবে বলে মনে করা হচ্ছে।
ফ্রান্সের পথে বড় বাধা স্পেনও। এবারের বিশ্বকাপে পারফরম্যান্সের বিচারে ফ্রান্সের পর সবচেয়ে বেশি নজর কেড়েছে লুইস দে লা ফুয়েন্তের দলই। কোয়ার্টার ফাইনালে বেলজিয়ামের বিপক্ষে এগিয়ে গেলেও শেষ পর্যন্ত স্পেনই প্রথম গোল হজম করে। ফাবিয়ান রুইজ এগিয়ে দেওয়ার পর চার্লস ডি কেটেলারের হেডে সমতা ফেরান বেলজিয়াম। এই গোলের মধ্য দিয়ে বিশ্বকাপে টানা ৬৪৯ মিনিট গোল না খাওয়ার স্পেনের রেকর্ডও থেমে যায়। পরে অবশ্য শেষ দিকে ম্যাচ ঘুরিয়ে স্পেনের হয়ে জয় নিশ্চিত করেন মিকেল মেরিনো।
শিরোপা জয়ের দৌড়ে ফ্রান্স এগিয়ে থাকলেও ছন্দ হারায়নি স্পেনও। ২০২৪ সালের মার্চে কলম্বিয়ার বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচে ১–০ গোলে হারের পর থেকে স্পেন টানা ৩৬ ম্যাচ অপরাজিত। এই সময়ে তাদের জয় ২৭টি, ড্র ৯টি—যা স্পেনের ইতিহাসে দীর্ঘতম অপরাজিত থাকার রেকর্ড।
অপটার সুপারকম্পিউটারের হিসাব অনুযায়ী স্পেনের ফাইনালে ওঠার সম্ভাবনা ৪২.৩ শতাংশ। তবে শিরোপা জয়ের সম্ভাবনায় তারা এখনো দ্বিতীয় স্থানে আছে—২৩.৪ শতাংশ। সুপারকম্পিউটারের ধারণা, ডালাসে মঙ্গলবারের সেমিফাইনালের বিজয়ী দলই শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপ জেতার সম্ভাবনায় এগিয়ে থাকবে।
ইংল্যান্ড–আর্জেন্টিনা ম্যাচটি কেবল রানার্সআপ ঠিক করার হিসাবের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। পুরো বিশ্বকাপজুড়ে ইংল্যান্ড সবসময় দাপুটে ফুটবল খেলতে পারেনি। তবে অনেকের মতে, চাপের জায়গায় না থেকে খেলার ধরনই দলটিকে আরও বিপজ্জনক করে তুলেছে। নরওয়ের বিপক্ষে পিছিয়ে পড়েও জয়ের পর ইংল্যান্ডের কোচ টমাস টুখেল নিজেও স্বীকার করেছিলেন, তাঁর দল ভালো খেলেনি। তবু প্রয়োজনীয় কাজটি ঠিকই করেছে দল।
জোড়া গোল দিয়ে সেই কাজটা কার্যত একাই এগিয়ে দিয়েছেন জুড বেলিংহাম। গতকাল রাতে নরওয়ের বিপক্ষে জোড়া গোল করা বেলিংহাম মেক্সিকোর বিপক্ষেও জোড়া গোল করেছিলেন। এর ফলে ১৯৮৬ বিশ্বকাপে ডিয়েগো ম্যারাডোনার পর প্রথম ফুটবলার হিসেবে একই বিশ্বকাপের টানা দুই নকআউট ম্যাচে অন্তত দুটি করে গোল করার কীর্তি গড়লেন তিনি। সেবার ম্যারাডোনা ইংল্যান্ড ও বেলজিয়ামের বিপক্ষে জোড়া গোল করেছিলেন।
এই জয়ের মধ্য দিয়ে বড় টুর্নামেন্টে ইংল্যান্ডের ধারাবাহিক সফলতাও টিকে থাকল। ২০১৮ সালের পর থেকে বিশ্বকাপ ও ইউরো মিলিয়ে চারবার সেমিফাইনালে উঠেছে থ্রি লায়ন্সরা। ২০১৮ সালের আগে নিজেদের পুরো ইতিহাসে যতবার (৪) শেষ চারে উঠেছিল, গত আট বছরেই সেই সংখ্যার সমান সেমিফাইনাল খেলেছে তারা।
তবে শেষ পর্যন্ত ‘ফুটবল ঘরে ফিরছে’ কি না—সেটি নির্ভর করছে পরের ধাপগুলোর ওপর। অপটার সুপারকম্পিউটারের হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বকাপ জয়ের সম্ভাবনায় ইংল্যান্ড তৃতীয় স্থানে—২১.৯ শতাংশ। অন্যদিকে ১৯৬৬ সালের পর প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠার সম্ভাবনায় তারা সামান্য এগিয়ে, ৫০.৯ শতাংশ।
তবে এই সুবিধা কাজে লাগানোর সুযোগ থাকলেও তা দিয়ে স্বস্তিতে ভোগার দায় নেই। কারণ, সেমিফাইনালে তাদের সামনে রয়েছে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। এবারের বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো কোনো ম্যাচে গোল করতে পারেননি লিওনেল মেসি। সুইজারল্যান্ডই প্রথম দল, যারা ৩৯ বছর বয়সী এই ফরোয়ার্ডকে গোলশূন্য রাখতে পেরেছে। এরপরও আর্জেন্টিনার অগ্রযাত্রা থেমে যায়নি। ১০ জনের সুইজারল্যান্ডকে ১২০ মিনিটে ৩–১ গোলে হারিয়ে শেষ পর্যন্ত সেমিফাইনালে উঠেছে তারা।
বিশ্বকাপে এটি আর্জেন্টিনার রেকর্ড ১৩তম অতিরিক্ত সময়ের ম্যাচ। এর মধ্যে ১১টিতেই তারা জিতেছে—এ হিসাবের মধ্যে টাইব্রেকারে পাওয়া জয়ও রয়েছে। বর্তমান চ্যাম্পিয়ন হলেও শেষ চারে থাকা চার দলের মধ্যে ২০২৬ বিশ্বকাপ জয়ের সম্ভাবনা সবচেয়ে কম ধরা হচ্ছে আর্জেন্টিনার। অপটার সুপারকম্পিউটারের হিসাবে তাদের শিরোপা জয়ের সম্ভাবনা ২০.৬ শতাংশ।
ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেমিফাইনালের পূর্বাভাসও খুব বেশি ব্যবধানের নয়। ২৫ হাজার সিমুলেশনের মধ্যে ৪৯.১ শতাংশ ক্ষেত্রে বলা হচ্ছে, আর্জেন্টিনা ইংল্যান্ডকে হারিয়ে ফাইনালে উঠবে। অর্থাৎ এই লড়াইয়ের ফল যেকোনো দিকেই যেতে পারে।






