রাষ্ট্রায়ত্ত ৯টি ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ১ লাখ ৮৮ হাজার ৭০১ দশমিক ৭৫ কোটি টাকা বলে জাতীয় সংসদে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।

আজ রোববার স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সংসদের প্রশ্নোত্তর পর্বে সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য সাবিকুন্নাহার এই প্রশ্ন করেন। অর্থমন্ত্রী জানান, অগ্রণী, জনতা, রূপালী, সোনালী, বেসিক ব্যাংক, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক, কৃষি ব্যাংক, রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ও প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক—এই ৯টি প্রতিষ্ঠানের সিআইবি ডেটাবেজে গত ৩১ মে পর্যন্ত পাঠানো তথ্য অনুযায়ী খেলাপি ঋণের পরিমাণ ১ লাখ ৮৮ হাজার ৭০১ দশমিক ৭৫ কোটি টাকা।

সংসদে ‘মুজিব বর্ষ’ পালনের ব্যয় নিয়ে জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মাহবুবুর রহমানের প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘মুজিব বর্ষ’ পালন উপলক্ষে প্রতিটি জেলা-উপজেলায় বিভিন্ন ধরনের কর্মসূচি বাস্তবায়নে এবং শেখ মুজিবের ছবি ও বেদি তৈরি, বিভিন্ন সরকারি অফিসে ব্রোঞ্জ, তামা, মার্বেল পাথরের মূর্তি বানাতে এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে সময় গণনার ডিজিটাল বোর্ড তৈরিতে সব মন্ত্রণালয়–বিভাগ মোট ৯৮২ কোটি ৯১ লাখ ৭৪ হাজার টাকা ব্যয় করেছে।

মন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মোট ৬২টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মধ্যে ৪৩টি বিভাগ এই অর্থ ব্যয় করেছে। এর মধ্যে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় সর্বোচ্চ ২৮৩ কোটি ১৫ লাখ টাকা ব্যয় করেছে। এছাড়া রেলপথ মন্ত্রণালয় ২০৬ কোটি ৭৩ লাখ ৭১ হাজার টাকা, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ১৪০ কোটি ৪৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা, গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় ১৩৩ কোটি ৩ লাখ ২০ হাজার টাকা, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ৪৭ কোটি ৬৬ লাখ ৫৬ হাজার টাকা, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় ২৬ কোটি ২৬ লাখ ৪১ হাজার টাকা, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ২৪ কোটি ৩০ লাখ ৪৩ হাজার টাকা, সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ ২৩ কোটি ২০ হাজার টাকা এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ ২০ কোটি ৪৯ লাখ ২০ হাজার টাকা ব্যয় করেছে।

মাহবুবুর রহমানের সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী জানান, মুজিব বর্ষের ব্যয় নিরীক্ষা বা তদন্তের বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। তিনি বলেন, মুজিব বর্ষ ছাড়াও আগের সরকারের সময় বিভিন্ন খাতে ব্যয়ের আরও অনেক বিষয় রয়েছে। সরকার পর্যায়ক্রমে সেগুলোর হিসাব যাচাই করছে এবং এর ভিত্তিতে ভবিষ্যতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। অর্থমন্ত্রী আরও উল্লেখ করেন, এটা তো শুধু মুজিব বর্ষ। প্রধানমন্ত্রীর এক বছরে খাওয়াদাওয়ার খরচ হয়েছে ৩৫ কোটি টাকা।

সরকারের মোট ঋণের বিষয়ে জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য গোলাম রصুলের প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী জানান, গত ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশ সরকারের মোট ঋণের পরিমাণ ২২ লাখ ৬ হাজার ৪৬২ কোটি টাকা। এর মধ্যে বৈদেশিক ঋণ ৯ লাখ ৫৯ হাজার ৩১১ কোটি এবং অভ্যন্তরীণ ঋণ ১২ লাখ ৪৭ হাজার ১৫১ কোটি টাকা।

অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরীর প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী জানান, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৪ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সমপরিমাণ বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ করা হয়েছে। এর মধ্যে আসল বাবদ পরিশোধ করা হয়েছে ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং সুদ বাবদ ১ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের অধীন বিভিন্ন কাস্টমস হাউসের বকেয়া শুল্ক নিয়ে সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য নিলোফার চৌধুরীর (মনি) প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী জানান, গত পাঁচ বছরে আমদানি করা পণ্যের বিপরীতে বকেয়া শুল্ক করাদির পরিমাণ ২৫ হাজার ৫০৪ দশমিক ৩ কোটি টাকা।

শেয়ারবাজারের অনিয়ম প্রসঙ্গে জামায়াতের সংসদ সদস্য কামরুল হাসানের প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, গত ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে শেয়ারবাজার লুটপাটের সঙ্গে জড়িত তথা কারসাজি, অনিয়ম ও দুর্নীতিকারী এবং প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হিসেবে ১ হাজার ৪৯৭ কোটি টাকা অর্থদণ্ড আরোপ করেছে। এর মধ্যে বেক্সিমকোর শেয়ারসংক্রান্ত লেনদেনে কারসাজির কারণে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে ৪২৮ কোটি টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

অর্থমন্ত্রীর তথ্য অনুযায়ী, বসুন্ধরা গ্রুপ অব কোম্পানির সহযোগী প্রতিষ্ঠান এবিজি লিমিটেড কর্তৃক চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের স্ট্র্যাটেজিক পার্টনার হিসেবে ২৫ শতাংশ শেয়ার অর্জনে অনিয়মসংক্রান্ত বিষয়ে এনফোর্সমেন্ট কার্যক্রম চলমান আছে। তিনি আরও জানান, তামহা সিকিউরিটিস লিমিটেড, বাংকো সিকিউরিটিজ, ক্রেস্ট সিকিউরিটিজ ও মশিউর সিকিউরিটিজের মতো বিনিয়োগকারীর অর্থ আত্মসাৎকারী স্টক-ব্রোকার কোম্পানিগুলোর ট্রেডিং কার্যক্রম বাতিল করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে এবং দুর্নীতি ও সম্ভাব্য অর্থ পাচারের বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে দুদকে চিঠি পাঠানো হয়েছে।

কামরুল হাসানের সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, নতুন বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে শেয়ারবাজারে ধারাবাহিক ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা গেছে। গত দুই মাসে সূচকে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে, যা গত পাঁচ বছরের তুলনায় বেশি। তিনি জানান, দেশীয় বিনিয়োগকারী ও তালিকাভুক্ত কোম্পানির পাশাপাশি বিদেশি ফান্ড ম্যানেজাররাও বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে আগ্রহ দেখাচ্ছেন।

বিদেশে অর্থ পাচারকারীদের বিষয়ে স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানার প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, জনগণের অর্থ লুট করে বিদেশে পাচারকারীদের বিরুদ্ধে সরকারের আইনি ব্যবস্থা অব্যাহত থাকবে। দেশের টাকা লুট করে যারা বিদেশে পালিয়ে গেছে, তাদের সঙ্গে বিএনপি কোনো আপস করবে না। এই সরকারও কোনো আপস করবে না।

তরুণদের ঋণ সুবিধা নিয়ে জামায়াতের সংসদ সদস্য মাহবুবুল আলমের প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী জানান, বাংলাদেশ ব্যাংক কটেজ, মাইক্রো ও ক্ষুদ্র খাতে নতুন উদ্যোক্তা পুনঃ অর্থায়ন স্কিমের তহবিল ১০০ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫০০ কোটি টাকায় উন্নীত করেছে। এই তহবিল থেকে নতুন উদ্যোক্তারা বিনা জামানতে সর্বোচ্চ ৭ শতাংশ সুদে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা এবং জামানত সাপেক্ষে সর্বোচ্চ ৩৫ লাখ টাকা ঋণসুবিধা পাবেন।

সবশেষে, ঢাকা-১৮ আসনের সংসদ সদস্য এস এম জাহাঙ্গীর হোসেনের প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী জানান, কৃষকদের অনুকূলে শস্য, ফসল, পশুপালন ও মৎস্য খাতসহ অন্যান্য কৃষিঋণের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত সুদসহ মওকুফ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এর আওতায় ২ জুলাই ১৪ লাখ ৩৪ হাজার ৪৮২ কৃষকের কাছে ব্যাংকের প্রাপ্য ১ হাজার ৩৫২ দশমিক ৭৪ কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়েছে।