বাল্যবিয়ে একটি সামাজিক ব্যাধি এবং মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন—এই বিশ্বাসকে লালন করে একটি সচেতন সমাজ গঠনের স্বপ্ন দেখছে দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী শ্রীমতি সুরঞ্জনা রাণী। চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার ঝিলিম ইউনিয়নের বিল-বৈলঠা গ্রামের এক দরিদ্র ক্ষুদ্র জাতিসত্তা কোল পরিবারে তার জন্ম। বাবা শ্রী সুশীল কোল ও মা শ্রীমতি আমিয়া রানীর ছোট মেয়ে সুরঞ্জনার পরিবার অন্যের জমিতে কৃষিকাজ করে জীবিকা নির্বাহ করে।
আর্থিক অনটন আর সামাজিক নানা প্রতিকূলতা সুরঞ্জনার শিক্ষার পথে বাধা হতে পারেনি। প্রতিদিন নিজের গ্রাম থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরের পথ পায়ে হেঁটে সে পাড়ি দেয় রাজশাহী জেলার গোদাগাড়ী উপজেলার মোহনপুর ইউনিয়নের বরেন্দ্র অঞ্চলে অবস্থিত বাবুডাইং আলোর পাঠশালায়। অর্থাৎ যাতায়াতে প্রতিদিন তাকে ১০ কিলোমিটার পথ হাঁটতে হয়। মুক্তকণ্ঠ ট্রাস্ট পরিচালিত এই বিদ্যালয়ে বিনামূল্যে পড়াশোনার সুযোগ পেয়ে সে সংশ্লিষ্টদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে। পড়াশোনার পাশাপাশি কৃষিকাজ, নাচ ও আলপনা আঁকাতেও বিশেষ দক্ষতা রয়েছে এই কিশোরীর।
ভবিষ্যতে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে সামাজিক উন্নয়নমূলক কাজে অংশ নিতে চায় সুরঞ্জনা। বাল্যবিয়ের ভয়াবহ প্রভাব নিয়ে নিজের সচেতন চিন্তাভাবনা তুলে ধরে সে বলে, 'দারিদ্র্য, অসচেতনতা, কন্যাসন্তানকে বোঝা মনে করা, সামাজিক নিরাপত্তাহীনতার অজুহাত ও কুসংস্কারের কারণে অনেক পরিবার কন্যাসন্তানকে দ্রুত বিয়ে দিয়ে দেয়। এর ফলে অল্প বয়সে গর্ভধারণের কারণে মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যুর হার বাড়ে। আমি বাল্যবিয়ে যাতে না হয় সেইজন্য কাজ করতে চাই।'
তৃণমূল পর্যায়ে বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে বেশ কিছু কার্যকর পদক্ষেপের কথা জানায় সুরঞ্জনা। তার মতে, প্রত্যন্ত অঞ্চলের অভিভাবকদের নিয়ে নিয়মিত উঠান বৈঠক করা, বাল্যবিয়ের শারীরিক ও আইনি কুফল সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি এবং শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করা জরুরি। কোথাও বাল্যবিয়ের আয়োজন চললে তাৎক্ষণিক আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের ওপরও সে গুরুত্বারোপ করে। সুরঞ্জনা বিশ্বাস করে, বাল্যবিয়েমুক্ত সমাজ গঠন কেবল সরকারের একার পক্ষে সম্ভব নয়; এর জন্য প্রয়োজন সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলন, যেখানে তরুণ প্রজন্মকে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে।






