মিয়ানমারের রাখাইন উপকূলে কিয়াউকফিউ নামের একটি ছোট বন্দর রয়েছে। বাইরে থেকে সাধারণ মনে হলেও এই বন্দরকে কেন্দ্র করেই এখন দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম বড় ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা চলছে। চীনের কাছে কিয়াউকফিউ শুধু একটি বন্দর নয়; ভারত মহাসাগরে পৌঁছানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ। এই পথের ধারণার সঙ্গে জড়িয়ে আছে চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডর (সিএমইসি)।

একবিংশ শতাব্দীর বৈশ্বিক অর্থনীতি ও ভূরাজনীতিতে আধিপত্য বজায় রাখার লড়াইয়ে ‘কানেক্টিভিটি’ বা যোগাযোগ অবকাঠামোকে এখন কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই ধারার বড় উদ্যোগগুলোর মধ্যে চীনের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ (বিআরআই) গুরুত্বপূর্ণ। এর ভৌগোলিকভাবে সংবেদনশীল দিকগুলোর একটি হলো সিএমইসি।

চীনের ইউনান প্রদেশ থেকে শুরু হয়ে মিয়ানমারের ভেতর দিয়ে ভারত মহাসাগরের বঙ্গোপসাগর উপকূল পর্যন্ত বিস্তৃত এই করিডর কেবল একটি বাণিজ্যিক রুট হিসেবে নয়; দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মানচিত্র বদলে দেওয়ার বড় পরিকল্পনা হিসেবেও আলোচিত হচ্ছে।

চীনের ইউনান প্রদেশ থেকে শুরু হয়ে মিয়ানমারের ভেতর দিয়ে ভারত মহাসাগরের বঙ্গোপসাগর উপকূল পর্যন্ত বিস্তৃত এ করিডর কেবল একটি বাণিজ্যিক রুট নয়, এটি দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মানচিত্র বদলে দেওয়ার এক মহা পরিকল্পনা।

ভৌগোলিক নকশার দিক থেকে সিএমইসি সুদূরপ্রসারী ও কৌশলগতভাবে বিন্যস্ত। ইউনানের রাজধানী কুনমিং থেকে শুরু করে করিডরটি মিয়ানমারের ভেতর দিয়ে সীমান্ত শহর মুসের মাধ্যমে দেশটির অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক কেন্দ্র মান্দালয়ে প্রবেশ করেছে।

মান্দালয় থেকে করিডরটি প্রধানত দুটি শাখায় ভাগ করা। একটি শাখা গেছে ইয়াঙ্গুনে। অপরটি দক্ষিণ-পশ্চিমে অগ্রসর হয়ে শেষ পর্যন্ত রাখাইন রাজ্যের কিয়াউকপিউ গভীর সমুদ্রবন্দরে গিয়ে ঠেকেছে।

বহুমাত্রিক পরিবহনব্যবস্থার কথাও বলা হচ্ছে। উচ্চগতির রেলপথ (যেমন প্রস্তাবিত মুসে-মান্দালয় রেল প্রকল্প) এবং আধুনিক মহাসড়ক—এসব উদ্যোগের মাধ্যমে চীনের ইউনানকে মিয়ানমারের উপকূলের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।

তবে মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ অস্থিতিশীলতা এ করিডরের সবচেয়ে বড় বাধা। রাখাইন রাজ্যসহ করিডরটি যেসব অঞ্চলের ওপর দিয়ে গেছে, তার বড় অংশজুড়েই দেশটির জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠী ও জান্তা বাহিনীর মধ্যে তীব্র গৃহযুদ্ধ চলছে।

কিয়াউকফিউ বন্দর থেকে চীনের ইউনান পর্যন্ত সমান্তরালভাবে দুটি পাইপলাইন—একটি অপরিশোধিত তেল ও একটি প্রাকৃতিক গ্যাসের জন্য—ইতিমধ্যে সচল রয়েছে। এর মাধ্যমে চীনের মূল ভূখণ্ডে জ্বালানি সরবরাহ আরও সহজ করার লক্ষ্যও আলোচনায় আছে।

এ ছাড়া কিয়াউকফিউ এবং সীমান্ত এলাকাগুলোতে শিল্প পার্ক ও বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপনের পরিকল্পনাও রয়েছে। সেখানে চীনা অর্থায়নে ভারী শিল্প ও প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র গড়ে তোলা হচ্ছে বলে বলা হয়।

চীনের জন্য এই করিডরের গুরুত্ব অনেকটাই ভূরাজনৈতিক। এটি বেইজিংয়ের দীর্ঘদিনের ‘মালাক্কা সংকটের’ এক টেকসই বিকল্প হিসেবে বিবেচিত। চীনের বেশির ভাগ জ্বালানি আমদানি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বর্তমানে দক্ষিণ চীন সাগর ও সংকীর্ণ মালাক্কা প্রণালি দিয়ে সম্পন্ন হয়। যুক্তরাষ্ট্র বা তার মিত্রদের সঙ্গে কোনো আন্তর্জাতিক সংঘাত বা উত্তেজনা তৈরি হলে মালাক্কা প্রণালি অবরুদ্ধ হওয়ার ঝুঁকি চীনের জন্য বড় হয়ে দাঁড়ায়—এ বিষয়টিও আলোচনায় থাকে।

সিএমইসি সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে চীন ভারত মহাসাগরে প্রবেশের বিকল্প ও তুলনামূলক নিরাপদ পথ পেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সে ক্ষেত্রে মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকা থেকে আসা তেলবাহী জাহাজগুলোকে আর মালাক্কা প্রণালি পার হতে হবে না; সেগুলো সরাসরি মিয়ানমারের কিয়াউকফিউ বন্দরে খালাস হয়ে পাইপলাইনের মাধ্যমে ইউনান প্রদেশের কুনমিংয়ে যাবে। এতে সময় ও পরিবহন খরচ কমার পাশাপাশি নিরাপত্তাঝুঁকিও হ্রাস পাওয়ার কথা বলা হয়। পাশাপাশি চীনের তুলনামূলক অনুন্নত পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশগুলোর অর্থনৈতিক বিকাশে এ করিডর মূল চালিকা শক্তি হিসেবে ভূমিকা রাখতে পারে বলেও আলোচনা আছে।

অর্থনৈতিক সংকটে জর্জরিত এবং আন্তর্জাতিকভাবে নানা চাপের মুখে থাকা মিয়ানমারের জান্তা সরকারের জন্য সিএমইসি একটি বড় অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সুযোগ হিসেবেও দেখা হচ্ছে। এই প্রকল্পের মাধ্যমে মিয়ানমারে শত শত কোটি ডলারের বৈদেশিক বিনিয়োগ আসতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়, যা দেশের ভঙ্গুর অবকাঠামো, বিদ্যুৎ খাত ও পরিবহন ব্যবস্থায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনতে পারে। কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং কিয়াউকফিউ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল থেকে বড় অঙ্কের রাজস্ব আয়ের সম্ভাবনাও আলোচনায় আছে।

বঙ্গোপসাগর ও ভারত মহাসাগরে চীনের এই একক আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টাকে যুক্তরাষ্ট্র ও তার ইন্দো-প্যাসিফিক মিত্ররা (কোয়াড জোট) গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। বেইজিংয়ের এ প্রভাব রুখতে পশ্চিমারা এ অঞ্চলে অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করেছে।

তবে মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ অস্থিতিশীলতাই এই করিডরের সবচেয়ে বড় বাধা হিসেবে উঠে আসে। রাখাইন রাজ্যসহ যে অঞ্চলগুলোর ওপর দিয়ে করিডরটি যাবে, সেই বড় অংশজুড়েই দেশটির জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠী ও জান্তা বাহিনীর মধ্যে তীব্র গৃহযুদ্ধ চলছে বলে উল্লেখ করা হয়। এমন পরিস্থিতি প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি কমিয়ে দেয় এবং চীনা বিনিয়োগের নিরাপত্তাকে বড় ধরনের ঝুঁকিতে ফেলতে পারে—এ বিষয়টিও প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

এ ছাড়া করিডরকে কেন্দ্র করে ‘ঋণের ফাঁদ’–এর আশঙ্কা এবং পরিবেশগত বিপর্যয়ের খতিয়ান নিয়ে নাগরিক সমাজে উদ্বেগের কথাও উল্লেখ রয়েছে।

সাম্প্রতিক সময়ে এ অর্থনৈতিক করিডরে যুক্ত হয়েছে নতুন এক মাত্রা, যা বাংলাদেশের জন্য সরাসরি প্রাসঙ্গিক। গত জুন মাসে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বেইজিংয়ে প্রথম সরকারি সফরকালে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের সঙ্গে এক উচ্চপর্যায়ের দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সে বৈঠকে চীনের পক্ষ থেকে মিয়ানমার হয়ে বাংলাদেশ পর্যন্ত এ করিডর সম্প্রসারণ বা একটি নতুন ত্রিপক্ষীয় ‘চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডর’ (সিএমবিইসি) গঠনের আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দেওয়া হয়।

প্রস্তাবের পর বাংলাদেশ সরকারকে সতর্ক ও কৌশলগত অবস্থান নিতে দেখা যায়। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বাংলাদেশ এ প্রস্তাব মূল্যায়ন করছে এবং এখনো কোনো চূড়ান্ত অবস্থান নেয়নি। প্রস্তাবের মূল লক্ষ্য হলো মিয়ানমার ও চীনের করিডরের সঙ্গে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরকে যুক্ত করে একটি বৃহৎ আঞ্চলিক বাণিজ্যিক হাব গড়ে তোলা এবং বহুমাধ্যমভিত্তিক পরিবহনব্যবস্থা জোরদার করা।

বাংলাদেশ যদি এ করিডরে যুক্ত হয়, তাহলে চীনের ইউনান প্রদেশ ও মিয়ানমারের বাজারে সরাসরি সড়ক ও রেল যোগাযোগের মাধ্যমে প্রবেশাধিকার পাওয়া যেতে পারে। এতে বাংলাদেশের রপ্তানি বৃদ্ধিতে ও ট্রানজিট সুবিধায় ভূমিকা রাখার সম্ভাবনার কথাও বলা হয়। তবে মিয়ানমারের বর্তমান অভ্যন্তরীণ সংঘাত এবং রোহিঙ্গা সংকটের মতো অমীমাংসিত দ্বিপক্ষীয় ইস্যুগুলো বাংলাদেশের অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডরকে কেবল দুই বা তিন দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক চুক্তি হিসেবে দেখছে না বিশ্লেষক মহল। ভারত মহাসাগর অঞ্চলে ভূরাজনৈতিক ভারসাম্য বদলে দিতে পারে—এমন দাবিও আলোচনায় আছে।

এ করিডর এবং বিশেষ করে কিয়াউকফিউ গভীর সমুদ্রবন্দরে চীনের শক্তিশালী উপস্থিতি ভারতকে কৌশলগতভাবে উদ্বেগে ফেলেছে। ভারত এটিকে তার ঘরের কাছে চীনের ‘স্ট্রিং অব পার্লস’ বা ভারতকে ঘিরে ফেলার কৌশলের অংশ হিসেবে দেখছে। এর জবাবে ভারতও মিয়ানমারে ‘কালাদান মাল্টি-মোডাল ট্রানজিট ট্রান্সপোর্ট’ প্রকল্পের মতো নিজস্ব অবকাঠামো গড়ে তোলার চেষ্টা করছে।

বঙ্গোপসাগর ও ভারত মহাসাগরে চীনের এই একক আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টাকে যুক্তরাষ্ট্র ও তার ইন্দো-প্যাসিফিক মিত্ররা (কোয়াড জোট) গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে—এ তথ্যও প্রতিবেদনে পুনরুল্লেখ করা হয়েছে। বেইজিংয়ের এ প্রভাব রুখতে পশ্চিমারা এ অঞ্চলে অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করেছে বলে উল্লেখ আছে।

মিয়ানমারের চরম অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও সামরিক অস্থিরতার কারণে বর্তমানে চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডরের মূল অবকাঠামো নির্মাণকাজ বড় ধরনের স্থবিরতার মুখে পড়েছে। করিডরের কেন্দ্রবিন্দু—কুনমিং থেকে রাখাইন রাজ্যের কিয়াউকফিউ গভীর সমুদ্রবন্দর পর্যন্ত ১ হাজার ৭০০ কিলোমিটার দীর্ঘ রেললাইন ও বাণিজ্যপথের একটি বড় অংশ এখন জান্তা সরকারের হাতছাড়া হয়ে আরাকান আর্মিসহ বিভিন্ন বিদ্রোহী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় চীন দফায় দফায় যুদ্ধবিরতির মধ্যস্থতা করলেও মাঠপর্যায়ের অস্থিতিশীলতা এবং বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থানান্তরের মতো নিরাপত্তা–সংকটের কারণে এই মুহূর্তে মিয়ানমারের ভেতর দিয়ে বড় আকারের নিরাপদ বাণিজ্য পরিচালনা করা চীনের জন্য প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।

চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডর দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অর্থনৈতিক ভূগোলে বড় ধরনের রূপান্তর আনার সম্ভাবনার কথা বলা হচ্ছে। মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংঘাত ও ভূরাজনৈতিক টানাপড়েন থাকলেও চীন প্রকল্পটি বাস্তবায়নে বদ্ধপরিকর। বাংলাদেশের মতো উদীয়মান অর্থনীতির দেশের জন্য করিডর নতুন বাণিজ্যের সুযোগ এনে দিতে পারে—তবে এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে নানা জটিল কূটনৈতিক ও কৌশলগত হিসাব। আগামী দিনে বেইজিংয়ের প্রস্তাবিত ত্রিপক্ষীয় করিডর ভারত মহাসাগর অঞ্চলের রাজনীতি ও অর্থনীতিকে কোন দিকে নিয়ে যায়, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

সূত্র: দ্য ডিপ্লোম্যাট ও বিবিসি