যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেস ভেন্যুতে ফুটবল বিশ্বকাপের প্রতিটি ম্যাচের প্রি-ম্যাচ সেরিমনিতে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করছেন বাংলাদেশের তৌহিদুল ইসলাম। মাঠের পতাকা বহন থেকে শুরু করে খেলোয়াড়দের প্রবেশের প্রটোকল নিশ্চিত করা—সবই তাঁর দায়িত্বের অংশ। নিজের অভিজ্ঞতার কথা সজীব মিয়াকে জানান তৌহিদুল।

টেলিভিশনের পর্দায় ম্যাচের আগে যে বর্ণিল আয়োজন দেখা যায়, তা সম্পন্ন হতে সময় লাগে মাত্র কয়েক মিনিট। তবে এই স্বল্প সময়ের নিখুঁত আয়োজনের পেছনে কাজ করেন শতাধিক মানুষ। তৌহিদুল বলেন, "আমি তাঁদেরই একজন। যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেস ভেন্যুতে ফিফার সেরিমনিস টিমের সদস্য হিসেবে কখনো অংশগ্রহণকারী দেশের অফিশিয়াল পতাকা বহন করি, কখনো প্রোটোকলের দায়িত্ব পালন করি, আবার কখনো খেলোয়াড়দের মাঠে প্রবেশের পুরো প্রক্রিয়া নির্বিঘ্ন রাখতে কাজ করি। কোটি কোটি দর্শক যখন ম্যাচের উদ্বোধনী আয়োজন দেখেন, তখন আমিও সেই দৃশ্যেরই একটি ক্ষুদ্র অংশ হয়ে মাঠে দাঁড়িয়ে থাকি।"

লস অ্যাঞ্জেলেস ভেন্যুতে মোট আটটি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হচ্ছে। প্রতিটি ম্যাচের দিন খেলা শুরুর প্রায় পাঁচ ঘণ্টা আগে তৌহিদুল ও তাঁর সহকর্মীদের কাজ শুরু হয়। চেক-ইন শেষে ড্রেসিংরুমে যাওয়ার পর মাঠে পূর্ণাঙ্গ রিহার্সাল চলে। জাতীয় সংগীত, পতাকা বহন এবং মাঠে প্রবেশের প্রতিটি ধাপের মহড়ায় স্থানীয় ফুটবল একাডেমির শিশুরা খেলোয়াড়দের স্থলাভিষিক্ত হয়।

ম্যাচ শুরুর প্রায় আধা ঘণ্টা আগে তাঁরা টানেলে অবস্থান নেন, যেখানে নিরাপত্তার খাতিরে মুঠোফোন জমা রাখতে হয়। ওয়ার্মআপ শেষে খেলোয়াড়দের ড্রেসিংরুমে যাওয়া এবং পুনরায় মাঠে ফেরার সময় তৌহিদুলের বেলজিয়ামের রোমেলু লুকাকু ও স্পেনের লামিন ইয়ামালসহ অনেক আন্তর্জাতিক তারকার সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় ও করমর্দনের সুযোগ হয়েছে। একজন ফুটবলপ্রেমীর জন্য এই মুহূর্তগুলো ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন বলে মনে করেন তিনি।

দায়িত্ব পালনকালে ভিভিআইপি এলাকার পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় ফিফার সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো এবং সাবেক ইংলিশ ফুটবলার ডেভিড বেকহামসহ অনেক পরিচিত মুখকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছেন তৌহিদুল। নিরাপত্তার কারণে ছবি তোলা সম্ভব না হলেও এই স্মৃতিগুলো আজীবনের সম্পদ হিসেবে মনে রাখবেন তিনি।

রাজশাহীতে জন্ম নেওয়া তৌহিদুল ২০২৩ সালে এমবিএ করতে লস অ্যাঞ্জেলেসে আসেন। ছোটবেলা থেকেই ফুটবল তাঁর জীবনের বড় আবেগ। পুরো পরিবার মিলে আর্জেন্টিনার খেলা দেখা, ভিডিও গেম খেলা এবং ইউরোপিয়ান ক্লাব ফুটবলের প্রতি অনুরাগের মধ্য দিয়েই ফুটবল তাঁর জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে।

ফুটবলের পাশাপাশি স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজেও তাঁর আগ্রহ ছিল দীর্ঘদিনের। স্কুলজীবনে স্কাউটিং এবং পরবর্তীতে বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট, রোটারি ও লায়ন্স ক্লাবের বিভিন্ন কার্যক্রমে যুক্ত ছিলেন তিনি। এই অভিজ্ঞতাগুলোই তাঁকে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্রীড়া আসরে কাজ করার সুযোগ এনে দিয়েছে বলে মনে করেন তিনি।

বাংলাদেশে থাকাকালীন ফিফার নিউজলেটারের জন্য নিবন্ধন করেছিলেন তৌহিদুল। ২০২৫ সালের বিশ্বকাপের স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি পাওয়ার পর তিনি আবেদন করেন। এরপর লস অ্যাঞ্জেলেসে ট্রায়আউটে ডাক পান, যেখানে দলগত কাজ, যোগাযোগদক্ষতা ও পরিস্থিতি মোকাবিলার সক্ষমতা যাচাই করা হয়। মে মাসে তিনি সেরিমনিস টিমের জন্য নির্বাচিত হন।

প্রশিক্ষণের পর ১০ সদস্যের একটি বিশেষ 'ফ্ল্যাগ প্রটোকল টিম' গঠন করা হয়, যার সদস্য নির্বাচিত হন তৌহিদুল। এই দায়িত্বের অংশ হিসেবে কানাডা ও দক্ষিণ আফ্রিকার ম্যাচে কানাডা দলের অফিশিয়াল পতাকা বহনের সুযোগ পান তিনি। টেলিভিশনে বহুবার দেখা সেই দৃশ্যের অংশ হয়ে মাঠে হাঁটার অনুভূতিকে তিনি বর্ণনা করেছেন অনন্য হিসেবে।

বিশ্বকাপের এই অভিজ্ঞতা তাঁকে বিভিন্ন দেশের মানুষের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ করে দিয়েছে। সহকর্মীদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক এখন একটি আন্তর্জাতিক পরিবারের মতো। বিভিন্ন দেশের স্বেচ্ছাসেবীরা যখন বাংলাদেশের কথা জানতে চাইতেন, তৌহিদুল তাঁদের দেশের ফুটবল-উন্মাদনার গল্প শোনাতেন। বাংলাদেশের সাজসজ্জার ভিডিও দেখে অনেকে বিস্মিত হয়েছেন এবং কেউ কেউ বাংলাদেশ ভ্রমণের আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।

১০ জুলাই স্পেন ও বেলজিয়ামের কোয়ার্টার ফাইনাল ম্যাচের মাধ্যমে লস অ্যাঞ্জেলেসে তৌহিদুলের কাজ শেষ হয়েছে। সামনে স্বেচ্ছাসেবকদের নিয়ে একটি অনুষ্ঠান থাকলেও তাঁর একটি বড় স্বপ্ন এখনো অপূর্ণ। তিনি বিশ্বাস করেন, একদিন বাংলাদেশও ফিফা বিশ্বকাপের মঞ্চে খেলবে। সেই দিনে লাল-সবুজ পতাকা হাতে বাংলাদেশের জাতীয় দলের সামনে দাঁড়িয়ে প্রি-ম্যাচ সেরিমনিতে অংশ নিতে পারাটাই হবে তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন।