যাঁরা সংবাদপত্রে কাজ করেন, তাদের কাছে সাংবাদিকতা আর বার্তা সংস্থা বা বেতার-টিভিতে সাংবাদিকতার পার্থক্যটা ছিল সবসময়ই স্পষ্ট—বিশেষ করে খবর প্রকাশের তাড়ায়। অতীতে সংবাদপত্রের ডেডলাইন ছিল আলাদা, আর বার্তা সংস্থা ও সম্প্রচারমাধ্যমের ডেডলাইন ছিল অন্যরকম। তবে এখন পত্রিকাগুলোও মাল্টিমিডিয়ায় বেশি মনোযোগী হওয়ায় সেই কাঠামোও বদলাচ্ছে। আগের মতো কেবল রাতের বেলায় প্রতিবেদন লিখে জমা দেওয়ার যে অভ্যাস ছিল, সেটাও সবাইকে বদলাতে হচ্ছে—বা অনেক ক্ষেত্রেই বদলানো হয়ে গেছে।

বেতার-টিভিতে ২৪ ঘণ্টার সংবাদ প্রচারের রেওয়াজও নতুন নয়, যদিও এটি এখনও বহু দিনের সংস্কৃতির অংশ হয়ে উঠেছে। কিন্তু বার্তা সংস্থায় খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবেদন লেখা ও প্রকাশের তাড়া আগেও ছিল, এখনও আছে। আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থায় সেই তাড়ার মাত্রা আরও তীব্র। সেখানে মাঠ পর্যায়ের রিপোর্টাররা কোন সংবাদটি গ্রাহকের জন্য জরুরি—এই বিচার করেন না; তাদের কাজ দ্রুততম সময়ে সংবাদটি তৈরি করে পাঠানো।

আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থায় কাজ করা একজন রিপোর্টারের কাছে গতির গুরুত্ব অপরিসীম। বিশ্বের যে প্রান্তেই ঘটনা ঘটুক, কোন সংবাদমাধ্যম কোন খবরটিকে জরুরি বিবেচনায় প্রকাশ করবে—মাঠের রিপোর্টারের সিদ্ধান্ত নয়; বরং দ্রুত প্রস্তুতি ও প্রেরণটাই তাদের কাছে মূল। অর্থনীতি ও আর্থিক বাজারসংক্রান্ত খবরের ক্ষেত্রে সংবাদ সংস্থা রয়টার্সের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও বিশ্বজোড়া সুখ্যাতি রয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদের হার কমাল, নাকি বাড়াল—এমন খবর, বা মুদ্রার দরপতন কিংবা বৃদ্ধি, কিংবা শেয়ারবাজারে সূচকের ওঠানামার তথ্য মুহূর্তের ব্যবধানে অনেকের আর্থিক ফল বদলে দিতে পারে।

এসব কৌতূহল মেটানোর মতো একটা বই রয়টার্সের দিনগুলো। সুখপাঠ্য এ বইয়ের লেখক প্রতিষ্ঠানটির ঢাকা ব্যুরোর সাবেক প্রধান সিরাজুল ইসলাম কাদির। প্রায় আড়াই দশকের অভিজ্ঞতার নানা দিক তিনি তাঁর জবানিতে তুলে এনেছেন। বইটি পড়লে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার কথা যেমন মনে পড়বে, তেমনই ঘটনার পেছনের কিছু ঘটনাও এতে পাওয়া যাবে।

আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থার মতো একটি প্রতিষ্ঠানে কাজ করার পথ, সেখানে শেখার প্রক্রিয়া, আর সাফল্যের দিকে এগোনোর ধাপ—এসব বিষয়ে তরুণ সাংবাদিক ও সাংবাদিকতার শিক্ষার্থীদের কৌতূহল থাকাটাই স্বাভাবিক। দেশে বর্তমানে বহু বিশ্ববিদ্যালয়ে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিষয়ে শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছেন। তাদের পেশাগত ভবিষ্যৎ নিয়ে আগ্রহ তৈরি হওয়াও প্রত্যাশিত।

এ প্রসঙ্গেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে রয়টার্সের দিনগুলো—যার লেখক প্রতিষ্ঠানটির ঢাকা ব্যুরোর সাবেক প্রধান সিরাজুল ইসলাম কাদির। প্রায় আড়াই দশকের অভিজ্ঞতার নানা দিক তিনি নিজের ভাষায় তুলে ধরেছেন। বইটি পড়লে শুধু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার বয়ানই নয়, অনেক ঘটনার পেছনের কিছু অজানা দিকও দেখা যায়। লেখকের বর্ণনায় আছে, ১৯৯৬ সালে ঢাকার শেয়ারবাজার ফুলে ওঠার পটভূমিতে কিছু টুকরো ঘটনা—যেগুলো খবর হিসেবে ছাপার মতো মনে নাও হতে পারে। কিন্তু বাজারের তখনকার গতিপ্রকৃতি এবং পরে যে ধরনের আকস্মিক বাজারধসের দিকটি দৃশ্যমান হয়েছে, সেটি বুঝতে সহায়ক হয় এই বর্ণনা।

কাদির তাঁর বইতে যাঁদের নাম উল্লেখ করেছেন, তাঁদের প্রত্যেকই তখনকার বাজার ম্যানিপুলেশনের জন্য পরে অভিযুক্ত হয়েছেন। আগ্রহী ব্যক্তিরা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অর্থনীতিবিদ আমীরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে তাঁদের সেই বিতর্কিত ভূমিকার বিবরণ পাবেন।

বইয়ের বর্ণনায় আরও দেখা যায়, রয়টার্সের সাংবাদিক হিসেবে শেয়ারবাজার বিষয়ে কাদিরকে বিশেষজ্ঞ হিসেবে ভাবতে শুরু করেছিলেন লন্ডনপ্রবাসী এক নারী। তিনি কাদিরের কাছে শরণাপন্ন হন—যেন তিনি এমন কারও সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দেন, যিনি দ্রুত উচ্চ মুনাফার ব্যবস্থা করতে পারেন। কাদিরের বর্ণনায় বলা হয়, তখন ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের নেতৃত্বে যাঁরা ছিলেন—এমন কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী ওই নারীকে ব্রোকারেজ হাউসে নিয়ে গেলে তাঁরা সবাই তাঁকে ফিরিয়ে দেন। তাদের বক্তব্য ছিল—উত্তপ্ত বাজারে বিনিয়োগ করলে যেকোনো সময় পুঁজি হারানোর বিপদ আছে। এসব ব্রোকারেজ হাউসের মালিক ও এক্সচেঞ্জের পরিচালকেরা সে সময় বুঝতে পেরেছিলেন, ভবিষ্যতে কাদির বিভ্রান্ত হলে তাঁরা রয়টার্সের সাংবাদিকের কাছে বিব্রত অবস্থায় পড়তে পারেন, আর ভবিষ্যতের কোনো প্রতিবেদনে তাঁদের বক্তব্য ব্যবহৃতও হতে পারে। বাস্তবেও বাজারকে ফুলিয়ে–ফাঁপিয়ে তোলায় তাঁদেরই ভূমিকা ছিল বলে কাদির উল্লেখ করেছেন।

এতে রানা প্লাজার মতো বড় ও মর্মান্তিক শিল্প দুর্ঘটনার খবর, পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠন ও স্বার্থের প্রভাব-প্রতিপত্তির বিষয়েও অনেক অজানা কাহিনির কথা আছে। সব মিলিয়ে বইটি কাদিরের দীর্ঘ কর্মজীবনের একটি অংশের অভিজ্ঞতার ঝুলি। সাংবাদিকতা বিষয়ে যাঁদের আগ্রহ আছে, শুধু তাঁদের নয়, অর্থনীতি ও রাজনীতির গবেষণা ও ইতিহাস অনুসন্ধিৎসুদের জন্য বইটি অবশ্যপাঠ্য।

বইটিতে বাংলাদেশের ব্যাংকগুলোর মন্দ ঋণের বোঝা প্রথম যখন প্রকাশ পায়, তখন রয়টার্স তা প্রচার করায় আন্তর্জাতিক লেনদেনে কী ধরনের প্রভাব পড়েছিল—সেই স্মৃতিচারণা রয়েছে। পাশাপাশি স্থানীয় পত্রিকায় টাকার অবমূল্যায়নের সূত্রবিহীন খবর ছাপা হওয়ার মতো আরেকটি ঘটনার কথাও উল্লেখ আছে। অর্থনৈতিক বাজারের নাটকীয় সব পর্বের পাশাপাশি রাজনীতির অঙ্গনের টালমাটাল পরিস্থিতি ও পরিবর্তন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার, সেনাসমর্থিত সরকার এবং একাধিক নির্বাচন ঘিরে বিভিন্ন নাটকীয় ঘটনা বৈশ্বিক পাঠক-দর্শকের কাছে কীভাবে উপস্থাপন করতে হয়েছে—সেই প্রক্রিয়া ও খুঁটিনাটি নিয়েও বর্ণনা আছে। লেখকের ভাষ্যমতে, এসব সবটা হয়তো পত্রিকার খবরের সঙ্গে পুরোপুরি নাও মিলে যেতে পারে।


  • রয়টার্সের দিনগুলো
    সিরাজুল ইসলাম কাদির

    প্রকাশক: ইউপিএল
    প্রকাশ: ফেব্রুয়ারি ২০২৫
    প্রচ্ছদ: কাজী যুবাইর মাহমুদ
    পৃষ্ঠা: ৪৪৬; মূল্য: ১২০০ টাকা