স্পেনের আলমেরিয়া প্রদেশের ৫৮ বছর বয়সী কৃষক লুই মেন্দেজ বলছিলেন, ‘ভেবেছিলাম দূরে ছোট কোনো ধোঁয়ার কুণ্ডলী হবে, কিন্তু ঘণ্টাখানেকের মধ্যে আমাদের চারপাশটা টকটকে কমলা রং ধারণ করল।’ তিনি তখন নিজের গুদামঘর থেকে কিছু সরঞ্জাম সরানোর চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু বাতাসের গতি বদলে যাওয়ার পর জীবন বাঁচাতে তাঁকে দ্রুত সরে আসতে হয়।

রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বৃহস্পতিবার শুরু হওয়া এই দাবানলে এখন পর্যন্ত ১২ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়েছে। আঞ্চলিক জরুরি সেবা বিভাগ জানিয়েছে, নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। উদ্ধারকারী দলগুলো বর্তমানে পাহাড়ের দুর্গম ও বিচ্ছিন্ন বাড়িগুলোতে পৌঁছানোর চেষ্টা করছে। এ পর্যন্ত বনভূমি ও কৃষিজমিসহ হাজার হাজার হেক্টর এলাকা পুড়ে গেছে।

কাছের একটি গ্রামের স্কুলশিক্ষিকা এলেনা আশ্রয়কেন্দ্রে আসার ঘটনা বর্ণনা করেছেন ভয়াবহ অভিজ্ঞতা হিসেবে। জিমনেসিয়ামে বানানো অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে বসে তিনি বলেন, ‘পুলিশ মাঝরাতে ঘরের কড়া নেড়ে আমাদের বলল, আমাদের হাতে মাত্র পাঁচ মিনিট সময় আছে।’ তিনি কেবল তাঁর পোষা বিড়াল এবং মেয়ের ওষুধপত্র সঙ্গে নিতে পেরেছিলেন। বাকিটা সবকিছুই হারিয়ে গেছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

আলমেরিয়া অঞ্চলে বর্তমানে ঐতিহাসিক তাপপ্রবাহ চললেও তীব্র দাবানলের পেছনে আবহাওয়ার ভূমিকার কথাও উঠে এসেছে। এখানে তাপমাত্রা ৪৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে গেছে। একই সঙ্গে অত্যন্ত নিম্ন আর্দ্রতা এবং প্রচণ্ড ঝোড়ো হাওয়া পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করেছে বলে বলা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আগুনের গতি এতই বেশি ছিল যে অনেকের পক্ষে সময়মতো নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি।

দক্ষিণাঞ্চলীয় প্রদেশগুলোতে বর্তমানে ফায়ার সার্ভিসের ৬০০-এর বেশি কর্মী এবং পানি ছিটানোর ২০টি বিমান মোতায়েন করা হয়েছে। ফায়ার সার্ভিসের একজন মুখপাত্র বলেন, ‘পাহাড়ি এলাকা হওয়ায় কাজ করা কঠিন হয়ে পড়ছে। এই মুহূর্তে বাতাসই আমাদের সবচেয়ে বড় শত্রু।’ আবাসিক এলাকাগুলোকে রক্ষা করতে অনেক কর্মী ৪৮ ঘণ্টা ধরে কাজ করে যাচ্ছেন বলে জানানো হয়েছে।

দাবানলের প্রভাব শুধু বাহ্যিক ক্ষয়ক্ষতিতেই সীমিত নয়—বেঁচে ফেরা মানুষের ওপরও মানসিক চাপ তৈরি হয়েছে। স্থানীয় এক দোকানি পেদ্রো জানিয়েছেন, তাঁর ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে। তিনি বলেন, ‘আমরা শুধু ঘরবাড়িই হারাইনি; আমরা আমাদের ইতিহাস এবং জীবিকাও হারিয়ে ফেলেছি।’

স্পেনের প্রধানমন্ত্রী ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলো পুনর্গঠনে জরুরি আর্থিক সহায়তার ঘোষণা দিয়েছেন। তবে নিখোঁজ ব্যক্তিদের খুঁজে বের করা এবং সক্রিয় আগুন নেভানো—এ দুটিই এখন প্রধান অগ্রাধিকার বলে উল্লেখ করা হয়েছে। আবহাওয়া পূর্বাভাসে আগামী দিনগুলোতে আরও উচ্চ তাপমাত্রার সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে, ফলে জরুরি অবস্থা বহাল রাখা হয়েছে।

সূর্য ডুবলেও পরিস্থিতি এখনো স্বাভাবিক হয়নি। লুই ও এলেনার মতো মানুষ ধোঁয়া পরিষ্কার হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন এবং তাঁরা আবার ঘরে ফিরতে চান। তবে ঘুরে দাঁড়ানোর পথ দীর্ঘ হবে বলে মনে করা হচ্ছে। আপাতত, গত রাতের সেই বিভীষিকা থেকে বেঁচে ফিরতে পারাটাই তাঁদের জন্য স্বস্তির।

সাম্প্রতিক মাসগুলোতে পশ্চিম ইউরোপের এক বড় অংশ বারবার ভয়াবহ তাপপ্রবাহের কবলে পড়েছে—যার মধ্যে স্পেন সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। দেশটিতে শুধু জুন মাসের তীব্র তাপপ্রবাহে ১ হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে এবং অনেক এলাকায় তাপমাত্রা অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে বলেও বলা হয়েছে।

স্পেনের তপ্ত ও শুষ্ক গ্রীষ্মকাল স্বাভাবিক হলেও বর্তমানের এই চরম আবহাওয়া বিধ্বংসী দাবানল সৃষ্টির জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। গতকাল স্থানীয় সময় বিকেল ৪টা ৪০ মিনিটে কৃত্রিম উপগ্রহ বা স্যাটেলাইটের ছবিতে নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় তাপমাত্রার অস্বাভাবিক পরিবর্তন ধরা পড়েছে।

দক্ষিণ-পূর্ব দিক থেকে আসা দমকা হাওয়ার গতি ঘণ্টায় ২৫ মাইলের বেশি হওয়ায় তা আগুনের শিখাকে আরও ছড়িয়ে দিচ্ছে বলে বর্ণনা করা হয়। ফলে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে আগুন দ্রুত ওপরের দিকে ছড়িয়ে পড়ছে। স্যাটেলাইট ইমেজে দেখা গেছে, সন্ধ্যার আগেই আগুনের বিস্তৃতি বিশাল আকার ধারণ করেছে এবং এর তীব্রতা বহুগুণ বেড়ে গেছে।