বাস্তবতার নিরেট বয়ান আর তাকে ছাপিয়ে যাওয়া কল্পনার মিশেলে উত্তরার গ্যালারি কায়ায় শুরু হয়েছে কলকাতার প্রখ্যাত শিল্পী চন্দ্র ভট্টাচার্যের একক শিল্পকর্ম প্রদর্শনী। ‘সাক্ষী ও কল্পনার মাঝে’ শীর্ষক এই আয়োজনে স্থান পেয়েছে শিল্পীর সাম্প্রতিক সময়ের ৩২টি শিল্পকর্ম।
গতকাল শুক্রবার এক মেঘলা সন্ধ্যায় প্রদর্শনীর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন এর পৃষ্ঠপোষক প্রতিষ্ঠান স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ইনামুল হক। উদ্বোধনী বক্তব্যে তিনি বলেন, সামাজিক দায়িত্ববোধ থেকেই তাঁরা শিল্প-সংস্কৃতির বিকাশের সহায়তা দিয়ে থাকেন।
প্রদর্শনীর সূচনা বক্তব্যে গ্যালারি কায়ার পরিচালক শিল্পী গৌতম চক্রবর্তী চন্দ্র ভট্টাচার্যের কাজের বিশেষত্ব তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘জলরং বলতে সাধারণত যে ধারার ছবি দেখতে আমরা অভ্যস্ত, তাঁর কাজ এর অন্য প্রান্তে। সময়, সমাজ, পৃথিবী এসব সম্পর্কে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ যে চিন্তার স্রোত আমাদের মাথায় প্রবাহিত হয়, সেখান থেকে উপাত্ত নিয়ে নিজস্ব রীতিতে নান্দনিক দৃশ্যকল্প চন্দ্র ভট্টাচার্য তাঁর ছবিতে উপস্থাপন করেছেন। তাঁর ছবিতে রঙের ব্যবহার সীমিত, প্রায়ই সাদাকালোর কাছাকাছি। যেন দূর থেকে ভেসে আসা সুর। এতে আছে প্রতিদিন দেখেও না দেখা অনেক উপাদান, বহুবার দেখেও অচেনা মানুষগুলোর গল্প।’
ঢাকায় এর আগে যৌথ প্রদর্শনীতে অংশ নিলেও এটিই চন্দ্র ভট্টাচার্যের প্রথম একক প্রদর্শনী। নিজের অনুভূতি ব্যক্ত করতে গিয়ে শিল্পী বলেন, তাঁর কাজের ধরন এমন যে তা নিয়ে বিশেষ ব্যাখ্যার প্রয়োজন পড়ে না। বর্তমান সময়ের ভোগবাদী প্রবণতা ও প্রকৃতির বিনাশ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘বর্তমানে শিল্পকলার সঙ্গে বাণিজ্যিক বিষয় নিবিড়ভাবে জড়িয়ে গেছে। ভোগবাদী প্রবণতা প্রবল হচ্ছে। প্রকৃতিকে ধ্বংস করা হচ্ছে। সমাজের নিচতলার মানুষের দিকে তাকানোর অবকাশ ও ইচ্ছা নেই। সে কারণে এমন বড় আকারে তিনি তাঁদের ছবি এঁকেছেন যেন ঘাড় উঁচু করে সেই ছবি দেখতে হয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘শিল্পের ভাষা, প্রকাশভঙ্গি এসবেরও পরিবর্তন এসেছে। বিষয়বস্তুকে এমন করে দেখানো যায়, যা দর্শককে ভাবিত করে। নাড়া দেয়। তিনি তাঁর ছবিতে সেই চেষ্টাই করেছেন।’
প্রদর্শনীতে থাকা ৩২টি কাজের মধ্যে চারকোলে আঁকা বিশাল আকারের চারটি অবয়বধর্মী কাজ দর্শকদের বিশেষভাবে আকৃষ্ট করে। এসব ছবিতে উঠে এসেছে প্রান্তিক মানুষের জীবনযুদ্ধ—ফুটপাতে শুয়ে থাকা কিংবা পোঁটলা হাতে হেঁটে চলার দৃশ্য। বাকি কাজগুলো জলরঙের হলেও তা প্রথাগত রীতির বাইরে। বনের দৃশ্য, ঝরা পাতা কিংবা নিষ্পত্র শাখায় বকের ঝিমুনির মতো দৃশ্যগুলো বাস্তবধর্মী অঙ্কন রীতিতে ফুটে উঠেছে।
বড় আকারের কাজগুলোতে ধূসর নেপথ্যের সঙ্গে কমলা ও হলুদ রঙের ব্যবহার এক কাব্যিক ব্যঞ্জনা তৈরি করেছে। অন্যদিকে ছোট ছবিগুলোতে সাদাকালোর প্রাধান্য থাকলেও সেখানে আলোর ঝলকানি ও রহস্যময়তার ছোঁয়া স্পষ্ট। বিশেষ করে জলরঙের কাজগুলোতে শিল্পীর সূক্ষ্ম তুলির কাজ ও ধৈর্য দর্শকদের এক ভিন্নধর্মী অভিজ্ঞতা প্রদান করে, যা অনেক ক্ষেত্রে এচিং বা ছাপচিত্রের ভ্রম তৈরি করে।
শিল্পানুরাগীদের জন্য এই প্রদর্শনী আগামী ২১ জুলাই পর্যন্ত প্রতিদিন বেলা সাড়ে ১১টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত উন্মুক্ত থাকবে।






