দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রধান প্রবেশদ্বার চট্টগ্রাম বন্দর ঘিরে সরকারি রাজস্ব আয় বাড়ার তথ্য পাওয়া গেছে। সদ্য সমাপ্ত ২০২৫–২৬ অর্থবছরে বন্দর দিয়ে প্রায় সোয়া ১১ কোটি টন পণ্য পরিবাহিত হয়েছে। আমদানি ও রপ্তানি মিলিয়ে এসব পণ্যের শুল্কায়িত মূল্য ১১ লাখ কোটি টাকার বেশি। পণ্য পরিবহন ও শুল্কায়নসংক্রান্ত আয় মিলিয়ে সরকারি কোষাগার এবং চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের মোট রাজস্ব আয় হয়েছে প্রায় ৯০ হাজার কোটি টাকা।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের তথ্য বিশ্লেষণে এ চিত্র উঠে এসেছে।
বাংলাদেশের আমদানি–রপ্তানির বড় অংশ পরিচালিত হয় চট্টগ্রাম বন্দরের মাধ্যমে। বন্দর দিয়ে আমদানি হওয়া অধিকাংশ পণ্যের শুল্কায়ন হয় চট্টগ্রাম কাস্টমসে। এ ছাড়া কমলাপুর আইসিডি, কেরানীগঞ্জের পানগাঁও ইনল্যান্ড কনটেইনার টার্মিনাল এবং চট্টগ্রাম ইপিজেড কাস্টমস স্টেশনেও বন্দরের মাধ্যমে পরিবাহিত একাংশ পণ্যের শুল্কায়ন হয়।
সরকারি কোষাগারে ৮৬ হাজার কোটি টাকা
এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, বিদায়ী অর্থবছরে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে ১০ কোটি ৭৫ লাখ টন আমদানি পণ্য খালাস হয়েছে। এসব পণ্যের শুল্কায়িত মূল্য (জাহাজভাড়া, বিমা ও ল্যান্ডিং চার্জসহ পণ্যের মূল্য) ছিল প্রায় ৫ লাখ ৮৫ হাজার কোটি টাকা। এই পণ্যের ওপর চট্টগ্রাম কাস্টমস, কমলাপুর কাস্টমস, পানগাঁও কাস্টমস ও চট্টগ্রাম ইপিজেড কাস্টমস স্টেশনের মাধ্যমে সরকারের রাজস্ব আয় হয়েছে প্রায় ৮৬ হাজার কোটি টাকা।
এর আগের ২০২৪–২৫ অর্থবছরে ১০ কোটি ১৬ লাখ টন আমদানি পণ্য খালাস হয়েছিল। তখন শুল্কায়িত মূল্য ছিল ৭ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা এবং রাজস্ব আদায় হয়েছিল ৭৮ হাজার ৩৯৭ কোটি টাকা। সে হিসাবে এক বছরে আমদানি পণ্য পরিবহন বেড়েছে প্রায় ৬ শতাংশ এবং রাজস্ব আদায় বেড়েছে প্রায় ১০ শতাংশ।
বিদায়ী অর্থবছরে বন্দর দিয়ে ৪৯ লাখ টন রপ্তানি পণ্য পরিবহন হয়েছে। এসব পণ্যের শুল্কায়িত মূল্য ছিল প্রায় ৫ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা। আগের অর্থবছরে রপ্তানি হয়েছিল ৪৭ লাখ ৩৪ হাজার টন পণ্য, যার শুল্কায়িত মূল্য ছিল ৫ লাখ ১৩ হাজার ৭০৭ কোটি টাকা। অর্থাৎ রপ্তানি পণ্য পরিবহন বেড়েছে প্রায় ৪ শতাংশ, যদিও শুল্কায়িত মূল্যের বৃদ্ধি ছিল ১ শতাংশের কম। তবে কয়েকটি নির্দিষ্ট পণ্য ছাড়া রপ্তানি পণ্যে কার্যত শুল্ক–কর নেই। তাই রপ্তানি খাতে তুলনামূলকভাবে রাজস্ব আদায় কম হয়।
চট্টগ্রাম কাস্টমসের সহকারী কমিশনার শরীফ মোহাম্মদ আল আমিন মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘২৪–২৫ অর্থবছরের তুলনায় বিদায়ী অর্থবছরে এককভাবে শুধু চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে রাজস্ব আদায়ে ১২ দশমিক ৩৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। রাজস্ব আদায়ের এই হিসাব এখনো সাময়িক। চূড়ান্ত হিসাব প্রকাশের পর রাজস্বের পরিমাণ আরও কিছুটা বাড়তে পারে।’
বন্দরের আয় চার হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, বিদায়ী অর্থবছরে কনটেইনার ও বাল্ক কার্গো মিলিয়ে সব ধরনের পণ্য পরিবহন থেকে বন্দরের আয় হয়েছে ৪ হাজার ৮৫ কোটি টাকা। আগের অর্থবছরে এই আয় ছিল ৩ হাজার ১৭৩ কোটি টাকা।
চট্টগ্রাম বন্দরের সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘২০২৪–২৫ অর্থবছরের তুলনায় পরিচালন খাতের রাজস্ব আয় প্রায় ২৮ শতাংশ বেড়েছে।’
বন্দর কর্মকর্তাদের মতে, পণ্য পরিবহনের পরিমাণ বৃদ্ধির পাশাপাশি ট্যারিফ সমন্বয়ের কারণে বন্দরের রাজস্ব আয় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। বন্দরের রাজস্ব আয়ের একাংশ সরকারি কোষাগারে জমা হয়। একই সঙ্গে বন্দরের বড় অংশই বন্দরের উন্নয়ন, বেতন–ভাতাসহ নানা খাতে ব্যয় হয়।
বন্দরকে কেন্দ্র করে সরকারি খাতের পাশাপাশি বেসরকারি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও বিস্তৃত হয়েছে। বন্দরের বাইরে থাকা ২০টি বেসরকারি কনটেইনার ডিপো আমদানি–রপ্তানি কনটেইনার ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এ ছাড়া টার্মিনাল অপারেটর, জেটি অপারেটর, শিপিং লাইন, ফ্রেইট ফরোয়ার্ডার, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট, ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান অপারেটরসহ বিভিন্ন সেবা খাতের বড় একটি অংশের ব্যবসা নির্ভর করে এই বন্দরকে ঘিরে।
তবে এসব খাতের সম্মিলিত আর্থিক লেনদেনের কোনো কেন্দ্রীয় পরিসংখ্যান নেই। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ধারণা, সরকারি রাজস্বের বাইরে চট্টগ্রাম বন্দরকে ঘিরে প্রতিবছর কয়েক হাজার কোটি টাকার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়।






