বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিষ্কার বোঝা যায়—মানুষ আসলে জায়গাকে নয়, জায়গার সঙ্গে থাকা মানুষগুলোকেই ভালোবাসে। একে একে যখন আপনজনরা হারিয়ে যান, তখন সেই জায়গাগুলো ধীরে ধীরে স্মৃতির অংশ হয়ে যায়।
আমার শৈশবের সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায়গুলোর একটি মামাবাড়ি। চার মামাই থাকতেন খুলনায়। সারা বছর অপেক্ষা করতাম স্কুলের বার্ষিক পরীক্ষার জন্য। পরীক্ষা শেষ মানেই স্বাধীনতা, আর স্বাধীনতা মানেই খুলনায় মামাবাড়ি যাওয়ার পালা।
যাত্রাটাও ছিল উৎসবের মতো। আগে লঞ্চে করে পিরোজপুর যেতে হতো—বিশাল বড় লঞ্চ। কখনো গভীর রাতে, কখনো ভোর হওয়ার আগেই ঘাটে পৌঁছাতে হতো। ঘাটের কোলাহল, চায়ের দোকানের ধোঁয়া, লঞ্চের হুইসেল আর যাত্রীদের ব্যস্ততা মিলিয়ে মনে হতো, যেন কোনো বড় অভিযানে বের হয়েছি।
লঞ্চে উঠলেই হকারদের আনাগোনা শুরু হতো। বাদাম, চানাচুর, নুট, চিড়াভাজা, সিদ্ধ ডিম, সাগর কলা—কী না পাওয়া যেত।
কাউখালী ঘাটে এলেই বড় বড় সাগর কলা নিয়ে হকাররা লঞ্চে উঠত। অনেক বছর পরও মনে পড়ে, সেই কলার স্বাদ। কলা থেকে এক ধরনের মিষ্টি ঘ্রাণ বের হতো, আকারেও ছিল বেশ বড়। দুটি কলা খেলেই প্রায় পেট ভরে যেত। আজও কাউখালীর নাম শুনলেই আমার আগে সাগর কলার কথাই আসে। আমার কাছে কাউখালী মানেই সাগর কলা।
পিরোজপুর থেকে বাসে যেতাম বাগেরহাট হয়ে রূপসা। মাঝপথে কয়েকটি ফেরি পার হতে হতো। যাত্রাটা খুব আরামদায়ক ছিল না, তবু মামাবাড়ি যাচ্ছি—এই আনন্দের কাছে সব ক্লান্তি আর কষ্ট তুচ্ছ হয়ে যেত।
খুলনায় পৌঁছে বড় মামার বাসায় ঢুকলেই ধোঁয়া ওঠা ভাত আর মুরগির মাংসের গন্ধ নাকে এসে লাগত। আমার মা ছিলেন তাঁদের একমাত্র বোন। তাই ফুফু এলেই পুরো বাসাজুড়ে উৎসবের আবহ তৈরি হতো। মা-ও খালি হাতে যেতেন না—সঙ্গে থাকত নানা রকম পিঠা।
আজও যখন মামাতো ভাইবোনদের সঙ্গে দেখা হয়, তাদের চোখে সেই একই ভালোবাসা দেখতে পাই। মনে হয়, পৃথিবী বদলেছে, সময় বদলেছে, কিন্তু কিছু সম্পর্কের উষ্ণতা বদলায় না।
বড় মামার বাসাটা ছিল ছোটখাটো একটি হোটেলের মতো। সব সময় লোকজন, রান্নাবান্না আর কোলাহলে ভরা থাকত। একসঙ্গে ১০-১২টি মুরগি রান্না হওয়াটা অস্বাভাবিক কিছু ছিল না। বড় বড় পাতিলে গরুর মাংস রান্না হতো—আমরা যত খুশি খেতে পারতাম। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, এত খাওয়ার পরও আমার ওজন এক ছটাকও বাড়ত না। চিকন, হালকা-পাতলা থাকাটা সেভাবেই ছিল। বড় ঝড় এলেও মনে হতো উড়ে যাওয়ার মতো—তার কোনো পরিবর্তন হতো না।
আমি বরাবরই ভীষণ লাজুক প্রকৃতির ছিলাম। মামির ঘরের পাশের ঘরে মামাতো বোনেরা গল্প করত। সেখানে গিয়ে চুপচাপ বসে থাকতাম। খুব বেশি কথা বলতাম না। আজও মনে হয়—বোনদের কাছে আমার অকারণ এই লজ্জার রহস্য অমীমাংসিতই রয়ে গেছে।
তবে সবচেয়ে প্রাণবন্ত জায়গা ছিল মামির ঘর। ঘরটি অনেকটা হলরুমের মতো। মাঝখানে বড় একটি খাট থাকত—সেই খাটে মামি বসতেন রাজরানির মতো। আর আমরা সবাই তাঁকে ঘিরে বসতাম। এরপর শুরু হতো গল্প, হাসি, ঠাট্টা, খুনসুটি।
ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটে যেত। এত বছর পরও চোখ বন্ধ করলে সেই দৃশ্য ভেসে ওঠে। হাসির শব্দ, গল্পের ফাঁকে খাবারের প্লেট, মামাতো বোনদের খিলখিল হাসি—সব যেন এখনো ঘরের ভেতর প্রতিধ্বনিত হয়। জীবনের সবচেয়ে সুন্দর সময়গুলো যে তখনই কাটিয়ে এসেছি, তা বুঝতে পেরেছি অনেক পরে।
বড় মামার বাসার সামনে একটি বড় গাছ ছিল। কত ঢিল ছুড়েছি, তার হিসাব নেই। তখন ছিল ভিসিআরের যুগ। ভিসিআর চালিয়ে টেলিভিশনে সিনেমা দেখা ছিল দারুণ আনন্দের ব্যাপার। সম্ভবত সবচেয়ে বেশি দেখা হয়েছিল ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’। সেই সময়েই প্রথম প্রেমে পড়ি। প্রেমের মানুষটি ছিলেন নায়িকা মৌসুমী। আজ ভাবলে হাসি পায়, কিন্তু তখন বিষয়টি আমার কাছে ছিল ভীষণ গুরুতর। ঘুমালেও মৌসুমীকে দেখতাম, জেগে থাকলেও তাঁর কথাই ভাবতাম। মনে হতো, জীবনে আর কিছু না পেলেও একদিন যদি মৌসুমীকে পাওয়া যায়, তাহলেই বুঝি জীবন সার্থক!
ফিরে আসার সময় বড় মামা হাতে গুঁজে দিতেন একটি ৫০০ টাকার নোট। এখনকার দিনে হয়তো খুব বড় কিছু নয়, কিন্তু তখন ৫০০ টাকা ছিল বিশাল সম্পদ। টাকাটা বারবার বের করে দেখতাম—মনে হতো, পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান জিনিসটি আমার পকেটেই আছে।
বড় মামার বাসার স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে আছে আরেকটি নাম—নীলা আপা। তিনি ছিলেন অপূর্ব সুন্দরী, প্রাণবন্ত আর ভীষণ মিশুক মানুষ। আমাকে খুব আদর করতেন। হঠাৎ একদিন খবর এল, নীলা আপা আর নেই। মৃত্যু যে এত নির্মম হতে পারে, সেটা তখন প্রথম উপলব্ধি করেছিলাম। আজও তাঁর কথা মনে পড়ে, কিন্তু কাউকে বলা হয় না।
পৃথিবীতে এমন কিছু দুঃখ থাকে, যা প্রকাশ করা যায় না। বলার মতো ভাষা থাকে না। কখনো সময় হয় না, কখনো শোনার মানুষ থাকে না। তখন সেই কষ্টগুলো বুকের ভেতর নীরবে জমে থাকে—কোনো এক নিঃশব্দ রাতে হঠাৎ ফিরে এসে চোখ ভিজিয়ে দেয়।
এরপর আসে মেজো মামার কথায়। তিনি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ছিলেন। তাঁর বাসার রান্নাঘরের পাশে একটি সুন্দর বারান্দা ছিল—সেখানে বসে চা খেতে খেতে দূরের খুলনা শহর দেখা যেত।
ড্রয়িংরুমের পাশেও ছিল আরেকটি বারান্দা। সেখানে বসে লিনি আপু আর মামুন ভাইয়ের সঙ্গে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ক্যারম খেলতাম। খেলায় জেতা হতো না, তবু আনন্দের কোনো কমতি ছিল না। মামুন ভাই যখন সাইকেল চালিয়ে সোঁ সোঁ করে চলে যেতেন, আমি মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকতাম—মনে হতো, কবে আমিও তার মতো করে বাতাস কেটে ছুটতে পারব!
মেজ মামা পড়াশোনার ব্যাপারে খুবই সচেতন ছিলেন। তিনি যখন পড়াশোনার খবর নিতেন, তখন একটু ভয়ই লাগত। অনেকেই হয়তো তাঁকে কড়া মেজাজের ভাবতেন, কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বুঝেছি—তাঁর কঠোরতার আড়ালে ছিল এক গভীর মমতা।
তিনি চাইতেন তাঁর ভাগ্নেরা ভালো মানুষ হোক, জীবনে প্রতিষ্ঠিত হোক। আজ যদি তাঁকে আবার বলতে পারতাম, বলতাম—‘মামা, আপনার ভাগ্নেরা পথ হারায়নি। নিজেদের জায়গা থেকে তারা লড়াই করে যাচ্ছে। আপনার স্বপ্নগুলো একেবারে হারিয়ে যায়নি।’ ফেরার সময় তিনি সব সময় কচকচে নতুন টাকা দিতেন। সেই নতুন টাকার গন্ধ আজও যেন নাকে ভাসে।
এরপর সেজ মামার প্রসঙ্গ। তিনি খুলনা শিপইয়ার্ডের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ছিলেন। তাঁর বাসা ছিল ব্যতিক্রমীভাবে সুন্দর। চারপাশে ছিল গাছপালা, নীরবতা আর প্রশান্তি—সেখানে গেলে মনে হতো পৃথিবীর সব ক্লান্তি দূর হয়ে গেছে। বাসার ওপর ঝুঁকে ছিল একটি পেয়ারা গাছ। ডালে উঠে পেয়ারা খেতাম—ছোট ছোট পেয়ারা, ভেতরটা লাল, স্বাদও অসাধারণ।
একদিন গাছের বেশ উঁচু ডালে বসে পেয়ারা খাচ্ছিলাম। হঠাৎ নিচে তাকিয়ে দেখি, অপূর্ব সুন্দরী এক মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সে বলল,
‘একা একা খাচ্ছেন কেন? আমাকে কিছু দেবেন না?’
আমি তখন তার রূপে এত মুগ্ধ যে কথা বলতে ভুলে গেছি। চোখের পলক ফেলতেও যেন কষ্ট হচ্ছিল। সে আবার বলল,
‘এই যে, শুনতে পাচ্ছেন না?’
তখন সম্বিত ফিরে পেলাম। কয়েকটি পেয়ারা ছুড়ে দিলাম। মেয়েটি হাসল, তারপর চলে গেল—আর কোনো দিন তাকে দেখা হয়নি। তবে আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, জীবনের এতগুলো বছর পেরিয়ে গেলেও মাঝে মাঝে সে স্মৃতির ভেতর এসে দাঁড়ায়। মনে হয়, সে কোনো মানুষ ছিল না—শৈশবের আকাশে ভেসে যাওয়া একটি ক্ষণিক মেঘ।
মামি টমেটো দিয়ে কই মাছ রান্না করতেন। আমার কাছে মনে হতো, পৃথিবীর সবচেয়ে সুস্বাদু রান্না এটাই। থালা চেটে-পুটে খেতাম।
একটি খালি বাসায় বসে মামাতো ভাইয়ের সঙ্গে ‘মন শুধু মন ছুঁয়েছে’ গান গাইতাম। টেবিলে তালে তালে শব্দ তুলতাম। তখন মনে হতো, এই পৃথিবীতে এর চেয়ে সুন্দর সুর আর নেই।
সবশেষে ছোট মামা। তাঁর ছেলে ইমন আর আমি প্রায় সমবয়সী—বয়সের পার্থক্য মাত্র ছয় মাস। যদিও নিজেকে ছোট প্রমাণ করার জন্য আমি সবার কাছে বলতাম, পার্থক্য দেড় বছর!
এই মামার বাসাতেই সবচেয়ে বেশি থাকা হতো। রাত হলে ছাদে পাটি বিছিয়ে শুয়ে পড়তাম। চারদিকে জ্যোৎস্না ছড়িয়ে থাকত। আমি আর ইমন গল্প করতে করতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়তাম, টের পেতাম না। মাসুদ রানা, তিন গোয়েন্দা, রহস্য পত্রিকা—কত বিষয় নিয়ে যে আলোচনা হতো!
একদিন ছাদে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। হঠাৎ একপসলা বৃষ্টি এসে পুরো ভিজিয়ে দিল। ঘুম ভাঙার পর দৌড়ে নিচে নামার সেই দৃশ্য আজও মনে পড়লে হাসি পায়।
ছোট মামা সৌদি আরবে থাকতেন। একবার আমাকে একটি খেলনা বন্দুক উপহার দিয়েছিলেন। ট্রিগার চাপলে শব্দ হতো, নানা রঙের বাতি জ্বলত। সেই বন্দুক কাউকে ধরতেও দিতাম না—মনে হতো, পৃথিবীর সবচেয়ে দামি জিনিসের মালিক আমি।
আমার মামাতো বোন রিমি আজ দুটি বিশ্বখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি করে যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছেন। তাঁর এই অর্জনের কথা আমি গর্ব করে মানুষকে বলি—কারণ সাফল্যের পেছনের কষ্টের পথটুকু আমি কিছুটা দেখেছি।
বয়সে আমার মামারা অনেক বড় ছিলেন। তাঁদের কাঁধে চড়ার সুযোগ হয়নি। তবে যে স্নেহ, ভালোবাসা আর মমতা তাঁদের কাছ থেকে পেয়েছি, তা আজকের দিনে বিরল।
কিছুদিন আগে মামাতো বোন কাকলী আপার সঙ্গে দেখা হয়েছিল। সবার সামনে তিনি আমার লেখালেখির এমন প্রশংসা করলেন—আমি লজ্জায় মাথা নিচু করে ফেললাম। তখনই মনে হলো—মামাদের মতো মামাতো ভাই–বোনেরাও কি দূর থেকে আমাদের খেয়াল রাখছেন?
এই ভালোবাসার কোনো মূল্য হয় না। এই ভালোবাসা হঠাৎ করেই চোখের পাতা ভারী করে দেয়।
খুলনা শহরের কথাও আলাদা করে না বললেই নয়। সেখানে রিকশাগুলো ছিল অনেক চওড়া—আরাম করে বসা যেত। অনেকে মজা করে বলত, প্রেমিক-প্রেমিকাদের জন্য একেবারে আদর্শ রিকশা।
তবে সবচেয়ে ভয়ংকর ছিল মশা। কামড়ের চেয়ে কানের কাছে ভন ভন শব্দ করেই তারা বেশি কষ্ট দিত। দল বেঁধে আক্রমণ করত।
তবু খুলনা আমার প্রাণের শহর। আজও কখনো চোখ বন্ধ করলে মনে হয়—স্কুলে ছুটি হয়েছে, ব্যাগ গুছিয়ে আমি খুলনার উদ্দেশে রওনা দিচ্ছি। মামারা অপেক্ষা করছেন। মামি রান্নাঘরে ব্যস্ত। মামাতো ভাইবোনেরা ছুটে এসে জড়িয়ে ধরবে।
কিন্তু চোখ খুললেই বাস্তবতা সামনে এসে দাঁড়ায়—একজন মামি আর একজন মামা ছাড়া প্রায় সবাই চলে গেছেন। ফাঁকা পড়ে আছে সেই বাড়িগুলো। নেই সেই আড্ডা, নেই সেই হাসি, নেই সেই ডাক, নেই সেই মানুষগুলো। এখন খুলনায় গেলে কোথায় যাব? কার দরজায় কড়া নাড়ব—এই প্রশ্নগুলো বুকের ভেতর হাহাকার তোলে।
মানুষ চলে যায়, সময় ফুরিয়ে যায়, ঘরবাড়ি ফাঁকা হয়ে যায়। কিন্তু ভালোবাসা কখনো মরে না—সেটা স্মৃতির ভেতর বেঁচে থাকে আজীবন।
আমার সব মামা-মামি, মামাতো ভাইবোনদের জন্য রইল অশেষ ভালোবাসা ও শুভকামনা।
ঠিকানা
মুনালয়, দক্ষিণ নাজিরপুর, ডাক+থানা-বানারীপাড়া, বরিশাল-৮৫৩০






