বাকপ্রতিবন্ধী ৭০ বছর বয়সী ববি বেগম ২৫ বছর ধরে নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার মেথিকান্দা স্টেশনে ভিক্ষাবৃত্তি ও প্ল্যাটফর্ম পরিষ্কার করে ৪০ হাজার টাকা জমিয়েছিলেন। কিন্তু সেই টাকা নিয়েই দুর্বৃত্তরা তাঁকে ঘুম থেকে তুলে পিটিয়ে হত্যা করে।

জীবদ্দশায় তিনি কোনো কথা বলতে পারেননি—ফলে তাঁর অতীত, স্বপ্ন, অপেক্ষা কিংবা শেষ মুহূর্তের আর্তনাদও অজানাই রয়ে যায়। তাঁর মৃত্যুতে শোকসভা বা মিছিল নেই; হয়তো কবরে নামফলকও থাকবে না। ববির মৃত্যু আমাদের সামনে এমন এক বাস্তবতা তুলে ধরে—সমাজের সবচেয়ে প্রান্তিক, আশ্রয়হীন মানুষের জীবন কত সহজেই অবহেলিত হয়ে পড়ে। একই সঙ্গে প্রশ্ন ওঠে, তাদের নীরব মৃত্যুর দায় থেকে আমরা কতটা দূরে সরে থাকি।

কোনো কথা না বলেও ববি বেগম অনেক কথা বলে গেলেন। তবে সেই কথাগুলো বুঝে নেওয়ার দায়িত্ব নেবে—এমন আশার জায়গা করে দিয়েছে কি, সেটাই এখন বড়।

আমরা যত অত্যাচারী হব, ততোধিক উদ্যমে গোকুল তার ত্রাতাকে বড় করতে থাকবে। হয়তো একদিন ওই ত্রাতাই ববি হন্তারকের টুটি চেপে ধরবে। অন্য কোনো আশা–ভরসা আমাদের নেই।

প্রাচ্য পুরাণের প্রসঙ্গ টেনে বলা যায়, অত্যাচারী রাজা কংস তার বোন দেবকীর অষ্টম সন্তান শ্রীকৃষ্ণকে বধ করতে চেয়েছিলেন—কারণ দৈববাণী হয়েছিল যে সেই শিশুই কংসের মৃত্যুর কারণ হবে। এই পটভূমি থেকেই ‘তোমারে বধিবে যে গোকুলে বাড়িছে সে’ প্রবাদটির জন্ম। অর্থাৎ যার দ্বারা আপনার পতন বা ধ্বংস হবে, সে অলক্ষ্যে বা অগোচরেই বেড়ে উঠছে।

এখন আমরা সবাই আইরিশ নাট্যকার স্যামুয়েল বেকেটের ‘ওয়েটিং ফর গডো’ ট্র্যাজিকমেডির ভ্লাদিমির ও এস্ট্রাগন—অবিরত ও নিস্ফলভাবে গডোর জন্য অপেক্ষা করে যাচ্ছি। তিনি কবে এসে আমাদের এই ভাঙাচোরা মেথিকান্দাকে নিমজ্জিত অতল গহ্বর থেকে উদ্ধার করবেন, সেটাই যেন অনিশ্চিত।

ববি বেগম, মর্ম যাতনায় ভোগা মানুষ হিসেবে আমরা আপনার কাছে চরম ও পরমভাবে লজ্জিত। আমাদের সামষ্টিক অপরাধের কোনো ক্ষমা নেই, নিদানও নেই। প্রায়শ্চিত্ত আমাদের করুণ নিয়তি। অপমান আমাদের ললাটের লিখন।

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর বয়ানে আমাদের সমস্বর কণ্ঠ হয়ে উঠেছেন—

হে মোর দুর্ভাগা দেশ, যাদের করেছ অপমান,

অপমানে হতে হবে তাহাদের সবার সমান!

মানুষের অধিকারে

বঞ্চিত করেছ যারে,

সম্মুখে দাঁড়ায়ে রেখে তবু কোলে দাও নাই স্থান,

অপমানে হতে হবে তাহাদের সবার সমান।

লেখক: সাংবাদিক