ইরান সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে হত্যার জন্য নতুন পরিকল্পনা তৈরি করেছিল—এমন দাবি করেছে ইসরায়েল। বিষয়টি সম্পর্কে জানেন, এমন দুটি সূত্র মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনকে এ তথ্য জানিয়েছে। যুদ্ধবিরতি চুক্তি ভেঙে পড়ার আশঙ্কার মধ্যেই ইহুদি রাষ্ট্রটির উগ্রপন্থী নেতানিয়াহু সরকারের এমন গোয়েন্দা দাবি দুই দেশের সম্পর্কে টানাপোড়েনকে আরেক ধাপ এগিয়ে দিয়েছে।
ইসরায়েল দাবি করেছে, চলতি সপ্তাহে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। একই সঙ্গে আরেকটি সূত্র বলেছে, ট্রাম্পকে হত্যার সম্ভাব্য পরিকল্পনা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে নিয়মিতভাবে গোয়েন্দা তথ্য পাচ্ছিল। তবে ইসরায়েলের পক্ষ থেকে আসা এই অভিযোগগুলো ছিল নতুন।
কিছু মার্কিন কর্মকর্তা ইঙ্গিত দিয়েছেন, ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় প্রভাব ফেলতে ইসরায়েল এই গোয়েন্দা তথ্য উপস্থাপনের চেষ্টা করতে পারে। কারণ, ট্রাম্প এখন ভাবছেন—ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন সামরিক পদক্ষেপ আরও জোরদার করবেন কি না।
ইসরায়েল যে হত্যার পরিকল্পনার কথা বলছে, সেই পরিকল্পনার বিস্তারিত তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে স্পষ্ট জানা যায়নি। বিষয়টি সম্পর্কে জানেন, এমন দুটি সূত্র বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র নিজে ওই তথ্যটি যাচাই করেনি। ইসরায়েলের দাবি-সংবলিত তথ্য পাওয়ার আগে তারা এটি ট্র্যাকও করছিল না।
মার্কিন সরকার দীর্ঘদিন ধরে সতর্ক করে আসছে—২০২০ সালে ট্রাম্পের নির্দেশে ড্রোন হামলায় ইরানের শীর্ষ জেনারেল কাসেম সোলাইমানি নিহত হওয়ার প্রতিশোধ হিসেবে ইরান ট্রাম্পকে হত্যার চেষ্টা করতে পারে।
ইসরায়েলের এই গোয়েন্দা তথ্য সম্পর্কে মন্তব্য জানতে চাওয়া হলে (ওয়াল স্ট্রিট জার্নালে প্রথম প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল) হোয়াইট হাউস ট্রাম্পের সাম্প্রতিক মন্তব্যের দিকে ইঙ্গিত করেছে। ওই মন্তব্যে ট্রাম্প বলেছেন—
‘তারা মার্কিন নেতাকে, অর্থাৎ আমাকে সরিয়ে দিতে চায়। আমি তাদের সব তালিকায় আছি। আজ সকালে আমি দেখলাম, আমি তাদের প্রতিটি তালিকায় আছি। আর এখন পর্যন্ত, আমি মনে করি আমার ভাগ্য কিছুটা ভালো। কিন্তু হয়তো এটি খুব বেশি দিন টিকবে না। এরা দুষ্ট ও অসুস্থ মানসিকতার মানুষ। আর আমাদের এই ক্যানসারকে উপড়ে ফেলতে হবে। সেই ক্যানসার। আপনারা তো জানেনই কী করতে হয়? ক্যানসারকে শুরুতেই কেটে বাদ দিতে হয়। আর আমি ঠিক তেমনটাই মনে করি।’
পরে ট্রাম্প জানান, তিনি সম্প্রতি একটি নতুন তালিকার কথা জানতে পেরেছেন, যেখানে তাঁকে ইরানের গুপ্তহত্যার শীর্ষ লক্ষ্য হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তবে তিনি নতুন ইসরায়েলি গোয়েন্দা তথ্যের দাবির কথা উল্লেখ করছিলেন কি না, তা স্পষ্ট নয়।
ট্রাম্পের মৃত্যুর দাবিতে শ্লোগান উঠেছে—গত ২৮ ফেব্রুয়ারি নিহত ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির জানাজায় অংশ নেওয়া বহু ইরানি সেদিন এমন দাবি করেন।
ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা আরও বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের হামলার জবাবে ইরানও পাল্টা হামলা চালাচ্ছে বলে খবর উঠেছে; ফলে শত্রুতা অবসানের লক্ষ্যে করা ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতি চুক্তিটি এখন পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে।
সাম্প্রতিক মার্কিন গোয়েন্দা তথ্য সম্পর্কে জানেন এমন দুটি সূত্র বলেছে, হামলার বিষয়ে আলোচনা করা কয়েকজন ব্যক্তির ওপর গোয়েন্দা সংস্থাগুলো নজর রাখছে। তবে এখনো তারা কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।
সূত্রগুলো আরও জানায়, ইরান কয়েকজন বর্তমান ও সাবেক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাকে নিশানা করতে পারে। একই সঙ্গে একটি সূত্র বলেছে, ইসরায়েলের এই প্রতিবেদনকে ইরান বিষয়ে ট্রাম্পের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করার যুদ্ধবাজ বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সরকারের বৃহত্তর অপচেষ্টার অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। গোয়েন্দা সংস্থার ভেতরের কেউ কেউ ইসরায়েলি গোয়েন্দা প্রতিবেদনের ব্যাপারে সব সময়ই সন্দিহান।
যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) পরোয়ানাভুক্ত ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ইরানের সঙ্গে ট্রাম্পের কূটনৈতিক আলোচনার বিষয়ে গভীর সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। লেবাননে ইসরায়েলের নির্বিচার হামলার বিষয়েও ট্রাম্পের সঙ্গে তাঁর মতবিরোধ ছিল—যা আলোচনাকে আরও জটিল করেছে।
গতকাল বৃহস্পতিবার এই দুই নেতা ফোনে কথা বলেছেন। শিগগিরই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে আলোচনার জন্য নেতানিয়াহু ওয়াশিংটন সফরে যেতে পারেন বলে জানিয়েছে সূত্র।
এদিকে গতকাল বৃহস্পতিবার আরেক মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, দুপক্ষের মধ্যে আবার হামলা শুরু হওয়া এবং এক দিন আগে যুদ্ধবিরতি ‘শেষ’ বলে ট্রাম্পের ঘোষণার পরও পর্দার আড়ালে ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনা এখনো চলছে। ওয়াশিংটন ও তেহরান আগস্টের মাঝামাঝি সময়ের মধ্যে পারমাণবিক চুক্তিতে পৌঁছানোর লক্ষ্যে কাজ করছে।
একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বৃহস্পতিবার রাতে প্রয়োজনে সম্ভাব্য হামলার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল। তবে কূটনীতির স্বার্থে তারা আপাতত হামলা থেকে বিরত থেকেছেন। বৃহস্পতিবার শুরুতে মার্কিন রণতরি ‘ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন’-এ ক্রু সদস্যরা যুদ্ধবিমানগুলোতে অস্ত্র বোঝাই করেছিলেন। পাইলটরা হামলা চালানোর সম্ভাব্য নির্দেশনার কথা বিবেচনা করে মহড়া দিয়েছিলেন।
বিমানবাহী রণতরির কমান্ডিং কর্মকর্তা ড্যান কিলার জাহাজে থাকা হাজার হাজার ক্রু সদস্যদের বলেছিলেন, পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠছে।






