নারীর জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায় হলো মেনোপজ। সাধারণত ৪৮ থেকে ৫০ বছর বয়সে ডিম্বাশয় থেকে ইস্ট্রোজেন হরমোন নিঃসরণ কমে যাওয়ার ফলে ধীরে ধীরে মাসিক বন্ধ হয়ে যায়। টানা এক বছর মাসিক বন্ধ থাকলে তাকে মেনোপজ বা রজোনিবৃত্তি বলা হয়। তবে এই সময়ে কেবল মাসিক বন্ধ হয় না, বরং শরীরে ও মনে নানা ধরনের পরিবর্তন ও জটিলতা দেখা দেয়, যাকে মেনোপজাল সিনড্রোম বলা হয়।

ইস্ট্রোজেন হরমোনের ঘাটতির কারণে মাসিক পুরোপুরি বন্ধ হওয়ার আগে থেকেই কিছু উপসর্গ দেখা দিতে পারে। এর মধ্যে অন্যতম হলো ‘হট ফ্লাশ’। হঠাৎ প্রচণ্ড গরম অনুভূত হওয়া, মুখ, গলা ও ঘাড় ঘামানো এবং পরবর্তীতে তা নিজে নিজেই কমে যাওয়ার এই সমস্যাটি অত্যন্ত বিব্রতকর। এর ফলে রাতে ঘুমের ব্যাঘাত ঘটে, অস্থিরতা বাড়ে, মনঃসংযোগ কমে এবং বুক ধড়ফড় করার পাশাপাশি ক্লান্তি ও অবসাদ অনুভূত হয়।

মানসিক পরিবর্তনের ক্ষেত্রে নারীরা অনেক সময় অকারণে মন খারাপ, একাকীত্ব ও অসহায় বোধ করতে পারেন। অনেকের ক্ষেত্রে ‘ব্রেন ফগ’ বা হঠাৎ সবকিছু ভুলে যাওয়ার অনুভূতি হতে পারে। কেউ আবেগপ্রবণ হয়ে কান্নাকাটি করেন, আবার কারও মেজাজ খিটখিটে হয়ে পড়ে।

জননতন্ত্রের সমস্যা হিসেবে মূত্রাশয়ের নিয়ন্ত্রণ হারানো, বারবার প্রস্রাবের বেগ হওয়া এবং প্রস্রাব পুরোপুরি পরিষ্কার না হওয়ার অনুভূতি হতে পারে। এছাড়া যৌন আকাঙ্ক্ষা হ্রাস, যোনিপথ শুষ্ক হওয়া এবং সহবাসে ব্যথার মতো সমস্যা দেখা দেয়। মেনোপজের পর প্রস্রাবের সংক্রমণ বা ইউরিনারি ট্র্যাক্ট ইনফেকশনের ঝুঁকিও বাড়ে।

হাড় ও পেশির স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে অস্টিওপোরোসিস বা হাড় দুর্বল হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে, ফলে হাড় ভঙ্গুর হয়ে পড়ে এবং পড়ে যাওয়ার প্রবণতা বাড়ে। একই সঙ্গে পেশির ক্ষয় শুরু হওয়ায় শরীরের ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে এবং ব্যথাবেদনা দেখা দেয়।

হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি ও ওজন বৃদ্ধির বিষয়টিও আশঙ্কাজনক। এই বয়সে রক্তে চর্বি ও শরীরের ওজন বৃদ্ধি পায়। ইস্ট্রোজেন হরমোন সাধারণত হৃদ্‌রোগ থেকে সুরক্ষা দেয়, কিন্তু মেনোপজের পর এই সুরক্ষা নষ্ট হওয়ায় নারীদের হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি পুরুষের সমান হয়ে পড়ে।

গবেষণায় দেখা গেছে, ৬০-৮০ শতাংশ নারী হট ফ্লাশ সমস্যায় ভোগেন। তবে এই উপসর্গগুলোর তীব্রতা ও সময় একেকজনের ক্ষেত্রে একেক রকম হয়। কেউ মেনোপজের আগে থেকেই লক্ষণগুলো অনুভব করেন, আবার কারও ক্ষেত্রে ৫-১০ বছর পর তা শুরু হতে পারে।

এই জটিলতাগুলো কাটিয়ে উঠতে জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন অত্যন্ত জরুরি। সুষম খাবার হিসেবে প্রচুর শাকসবজি, তাজা ফলমূল এবং আঁশযুক্ত খাবার গ্রহণ করা উচিত। সাদা শর্করা ও তেল-চর্বিযুক্ত খাবার এড়িয়ে জটিল শর্করা গ্রহণ করার পরামর্শ দেওয়া হয়। হাড়ের সুস্থতায় দুধ, টক দই ও ছোট মাছের মতো ক্যালসিয়াম সমৃদ্ধ খাবার এবং পেশির জন্য ডিম, মাছ, মাংসের মতো পর্যাপ্ত আমিষ প্রয়োজন।

ভিটামিন ডি-এর জন্য প্রতিদিন বেলা ১১টা থেকে বিকেল ৪টার মধ্যে ২০-২৫ মিনিট সূর্যের আলোয় থাকা প্রয়োজন। প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শে সাপ্লিমেন্ট নেওয়া যেতে পারে। এছাড়া ফিটনেস ধরে রাখতে সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট হাঁটা, ব্যালান্সিং এক্সারসাইজ এবং ওয়েট লিফটিং জরুরি। তবে আর্থ্রাইটিস বা পিএলআইডি থাকলে ব্যায়ামের আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া আবশ্যক।

মানসিক প্রশান্তি ও ভালো ঘুমের জন্য শোবার ঘরের পরিবেশ শান্ত রাখা, ঘুমানোর তিন ঘণ্টা আগে খাবার শেষ করা এবং স্ক্রিন ব্যবহার এড়িয়ে চলা প্রয়োজন। ধূমপান, মদ্যপান, অতিরিক্ত চা-কফি ও মসলাদার খাবার এড়িয়ে চলা উচিত। স্ট্রেস কমাতে যোগব্যায়াম, মেডিটেশন এবং প্রিয়জনদের সঙ্গে সময় কাটানো কার্যকর। বাগান করা, গান শোনা বা পোষা প্রাণীর যত্নের মতো শখের কাজে সময় ব্যয় করলে হতাশাবোধ কমে।

এই সময়ে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা জরুরি। রক্তচাপ, রক্তের শর্করা ও চর্বি পরীক্ষা করার পাশাপাশি ফ্যাটি লিভার, থাইরয়েড সমস্যা এবং রক্তশূন্যতা আছে কি না তা যাচাই করা উচিত। বুকে ব্যথা বা বুক ধড়ফড় করলে কার্ডিওলজিস্টের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। এছাড়া প্রস্রাবে জ্বালাপোড়া হলে পরীক্ষা এবং বিষণ্নতা বেশি হলে মনোরোগচিকিৎসকের সাহায্য নেওয়া উচিত। জননতন্ত্রের জটিলতা কমাতে পেলভিক এক্সারসাইজ সহায়ক হতে পারে।

উপসর্গ কমাতে হরমোন থেরাপি বা নন-হরমোনাল ওষুধের ব্যবস্থা থাকলেও সেগুলোর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থাকায় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ ও নিয়মিত মনিটরিং বাধ্যতামূলক। মনে রাখতে হবে, মেনোপজ কোনো অসুস্থতা নয়, বরং জীবনের এক পরিপূর্ণ পর্যায়। তাই সঠিক যত্নের মাধ্যমে এই সময়টিকে উপভোগ করা সম্ভব।