ঘাড়, কাঁধ ও হাতে ব্যথা কিংবা ঝিনঝিন অনুভূতি হলে সাধারণত আমরা একে সার্ভাইক্যাল স্পন্ডেলাইসিস বা ডিস্কের সমস্যা বলে মনে করি। তবে অনেক ক্ষেত্রে এই উপসর্গের প্রকৃত কারণ হতে পারে থোরাসিক আউটলেট সিনড্রোম। সময়মতো এই রোগ শনাক্ত করা না গেলে দীর্ঘমেয়াদী ব্যথা ও দুর্বলতার পাশাপাশি হাতের কার্যক্ষমতা হ্রাস পাওয়ার ঝুঁকি থাকে।

শারীরিক গঠন অনুযায়ী ঘাড়ের নিচে কলার বোন (ক্ল্যাভিকল) ও প্রথম পাঁজরের মধ্যবর্তী একটি সরু পথ থাকে, যাকে থোরাসিক আউটলেট বলা হয়। এই পথ দিয়েই হাতে যাওয়ার গুরুত্বপূর্ণ স্নায়ু (ব্রাকিয়াল প্লেক্সাস), ধমনি (সাবক্লেভিয়ান আর্টারি) ও শিরাগুলো (সাবক্লেভিয়ান ভেইন) অতিক্রম করে। কোনো কারণে এই পথ সংকুচিত হয়ে স্নায়ু বা রক্তনালির ওপর চাপ সৃষ্টি হলে থোরাসিক আউটলেট সিনড্রোম দেখা দেয়।

এই সমস্যার প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে জন্মগতভাবে অতিরিক্ত একটি পাঁজর (ক্ল্যাভিকল রিব) থাকা, ঘাড় বা কাঁধে আঘাত পাওয়া কিংবা দীর্ঘসময় ভুল ভঙ্গিতে বসে কাজ করা। এছাড়া কম্পিউটারে দীর্ঘক্ষণ কাজ করা, বারবার মাথার ওপর হাত তুলে কাজ করা, এক কাঁধে ভারী ব্যাগ বহন করা, কাঁধের চারপাশের পেশির অতিরিক্ত টান বা দুর্বলতা এবং স্থূলতা কিংবা গর্ভাবস্থার কারণে শরীরের ভঙ্গির পরিবর্তন এই রোগের ঝুঁকি বাড়ায়।

রোগের উপসর্গ মূলত নির্ভর করে স্নায়ু নাকি রক্তনালি—কোনটি বেশি চাপে রয়েছে তার ওপর। স্নায়ু আক্রান্ত হলে ঘাড়, কাঁধ ও হাতে ব্যথা, হাতে ঝিনঝিন বা অবশ ভাব, আঙুলে সুচ ফোটার মতো অনুভূতি, হাত দুর্বল হয়ে যাওয়া, জিনিস ধরতে কষ্ট হওয়া এবং দীর্ঘক্ষণ হাত ওপরে তুললে উপসর্গ বেড়ে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দেয়। অন্যদিকে, রক্তনালি আক্রান্ত হলে হাত ঠান্ডা হয়ে যাওয়া, ফ্যাকাশে বা নীলচে হওয়া, হাত ফুলে যাওয়া, দ্রুত ক্লান্তি এবং নাড়ির স্পন্দন কমে যাওয়ার লক্ষণগুলো প্রকাশ পায়।

রোগ নির্ণয়ে রোগীর ইতিহাস এবং শারীরিক পরীক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চিকিৎসক সাধারণত ঘাড় ও কাঁধের পাশাপাশি হাতের শক্তি ও অনুভূতি পরীক্ষা করেন। প্রয়োজনে এক্স-রে, নার্ভ কন্ডাকশন স্টাডি ও ইএমজি, আলট্রাসাউন্ড ডপলার, সিটি বা এমআর এনজিওগ্রাফি এবং এমআরআই করার প্রয়োজন হতে পারে।

এই সমস্যা প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে কিছু সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি। যেমন—দীর্ঘক্ষণ মাথার ওপরে হাত তুলে কাজ না করা, কম্পিউটারের মনিটর চোখের সমতলে রাখা এবং প্রতি ২০-৩০ মিনিট পর ২ মিনিট বিরতি নিয়ে ঘাড় ও কাঁধের হালকা ব্যায়াম করা। এছাড়া এক কাঁধে ভারী ব্যাগ বহন না করা, সোজা হয়ে বসা ও দাঁড়ানো, কাঁধ ঝুলিয়ে বসা বা কুঁজো হয়ে কাজ করা এড়িয়ে চলা এবং খুব উঁচু বা শক্ত বালিশ ব্যবহার না করার পরামর্শ দেওয়া হয়। পাশাপাশি ওজন নিয়ন্ত্রণ এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত ব্যায়াম করা প্রয়োজন। তবে বিশেষ ক্ষেত্রে চিকিৎসক অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।

তথ্য প্রদান করেছেন: ডা. সাকিব আল নাহিয়ান, সহকারী অধ্যাপক, ফিজিক্যাল মেডিসিন, গ্রিন লাইফ মেডিক্যাল কলেজ, ঢাকা।