চলতি অর্থবছরে (২০২৬–২৭) বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির হার সাড়ে চার শতাংশ হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)। আজ প্রকাশিত এডিবির 'এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট আউটলুক' জুলাই সংস্করণে এই প্রাক্কলন করা হয়েছে। সংস্থাটির পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, দুর্বল রপ্তানি, বেসরকারি বিনিয়োগের স্থবিরতা, জ্বালানির উচ্চমূল্য, মূল্যস্ফীতির চাপ এবং বৈশ্বিক প্রতিকূল পরিবেশের কারণে প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কিছুটা কমানো হয়েছে।
এডিবি মনে করে, বিদায়ী অর্থবছরে (২০২৫–২৬) জিডিপি প্রবৃদ্ধি হবে ৩ দশমিক ৭ শতাংশ। তবে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সাময়িক হিসাব অনুযায়ী, সদ্যবিদায়ী অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ১৪ শতাংশে।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে এডিবির আবাসিক মিশনের ভারপ্রাপ্ত প্রধান আকিরা মাতসুনাগা বলেন, “কঠিন বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক পরিবেশের মধ্যেও শক্তিশালী প্রবাসী আয় (রেমিট্যান্স) এবং সেবা খাতের স্থিতিশীল কার্যক্রমের কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতি সহনশীলতা দেখিয়ে যাচ্ছে। তবে শক্তিশালী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক পুনরুদ্ধারের জন্য সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা জোরদার, বিনিয়োগ পরিবেশের উন্নয়ন, আর্থিক খাতের সুশাসন নিশ্চিত করা এবং জ্বালানি ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা দূর করতে সংস্কার কার্যক্রম অব্যাহত রাখা জরুরি।”
মূল্যস্ফীতি প্রসঙ্গে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সম্প্রতি পেট্রোলিয়াম, গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম সমন্বয়ের প্রভাব পরিবহন, পরিষেবা ও অন্যান্য ভোক্তাপণ্যের দামে পড়তে থাকবে। ফলে ২০২৬–২৭ অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমে ৮ দশমিক ৮ শতাংশে নামতে পারে। উল্লেখ্য, এপ্রিলে এডিবি মূল্যস্ফীতির পূর্বাভাস দিয়েছিল সাড়ে ৮ শতাংশ, যা বর্তমান প্রাক্কলনের চেয়ে কম। জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির দ্বিতীয় দফার প্রভাব, বিনিময় হার সমন্বয় এবং খাদ্য ও সেবা খাতে মূল্যস্ফীতি কমার ধীরগতির কারণে এই বৃদ্ধি হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
এডিবি বিশ্লেষণ করে জানিয়েছে, উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে এবং ব্যক্তিগত ভোগব্যয় সীমিত হচ্ছে। বৈদেশিক চাহিদার দুর্বলতা ও বেসরকারি বিনিয়োগের স্থবিরতার ফলে রপ্তানি দুর্বল এবং আমদানির প্রবৃদ্ধি মাঝারি পর্যায়ে রয়েছে। উচ্চ জ্বালানি মূল্য ও কাঠামোগত প্রতিবন্ধকতার কারণে রপ্তানিমুখী উৎপাদন খাত চাপে থাকবে এবং সারের ঘাটতির কারণে কৃষি খাত ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। তবে রেমিট্যান্সনির্ভর পারিবারিক আয়ের কারণে সেবা খাত প্রবৃদ্ধিতে সহায়তা করবে।
সংস্থাটির মতে, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা, জ্বালানিসংকট ও প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতার ঘাটতির কারণে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি ধীরে ধীরে বাড়বে, তবে তা শক্তিশালী হবে না।
ঝুঁকির বিষয়ে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত তীব্র হলে জ্বালানি ও পণ্য পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি পেতে পারে, যা বৈদেশিক খাতে চাপ সৃষ্টি করবে এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতির মাধ্যমে প্রবৃদ্ধিকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। এতে রেমিট্যান্স প্রবাহও দুর্বল হতে পারে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লে আমদানি ব্যয় এবং জ্বালানি ভর্তুকির কারণে সরকারের আর্থিক চাপ বাড়বে। এছাড়া উচ্চ শুল্ক, বাণিজ্য প্রতিবন্ধকতা বা প্রধান অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি দুর্বল হলে রপ্তানি চাহিদা কমে উৎপাদন খাতের দুর্বলতা দীর্ঘায়িত হতে পারে।
পাশাপাশি বিনিময় হারের ওপর অব্যাহত চাপ, বৈদেশিক অর্থায়নের কঠোর পরিস্থিতি এবং জলবায়ুজনিত অভিঘাত বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি হিসেবে রয়ে গেছে বলে মনে করে এডিবি।






