প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফর এবং সফর শেষে যে যৌথ ইশতেহার প্রকাশিত হয়েছে, তাতে স্পষ্ট, এই দুই দেশের সম্পর্ক এখন গুণগতভাবে নতুন স্তরে প্রবেশ করেছে। যে সম্পর্কের চালকের আসনে এত দিন বসে ছিল ভারত, এখন সেখানে জায়গা করে নিয়েছে চীন। বিষয়টি ভারতের চোখ এড়ায়নি।
যৌথ ইশতেহার অনুসারে চীন বাংলাদেশের জাতীয় স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা সমুন্নত রাখার প্রচেষ্টায় তার সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে এবং স্বাধীন উন্নয়নের পথ বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের জনগণের সিদ্ধান্তের প্রতি শ্রদ্ধা প্রকাশ করেছে। পরে ঢাকায় চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন এ বক্তব্যের ব্যাখ্যায় বলেছেন, চীন যেকোনো দেশে যেকোনো বিদেশি হস্তক্ষেপের ঘোর বিরোধী। যেকোনো বিদেশি হস্তক্ষেপের বিরোধিতা করতে বাংলাদেশের পাশে আছে চীন।
.জাতীয় স্বার্থের কূটনীতি ও বাংলাদেশের নতুন যাত্রা.সমস্যা হলো, বক্তব্যটি যদি কূটনৈতিক ভাষার প্রচলিত দ্ব্যর্থতা রক্ষা করে দেওয়া হতো, যে দ্ব্যর্থতা রাষ্ট্রদূতের বক্তব্যের প্রথম বাক্যে রয়েছে, তাহলে বিতর্ক কম হতো। কিন্তু তিনি আগবাড়িয়ে বলে রাখছেন, কেউ বাংলাদেশের ব্যাপারে হস্তক্ষেপের চেষ্টা করলে তাঁরা হস্তক্ষেপ করবেন। অর্থাৎ এক বিদেশি হস্তক্ষেপ ঠেকাতে আরেক বিদেশি হস্তক্ষেপ, যার কোনোটাই বাঞ্ছিত নয়।
এ বক্তব্য যে ভারতকে মাথায় রেখে করা, তা বুঝতে রকেটবিজ্ঞানী হতে হয় না। শুধু এ বক্তব্য নয়, সফর শেষে যে চুক্তির কথা বলা হয়েছে, ভারতীয়দের চোখে তা-ও ভালো লাগেনি। সরকারিভাবে তারা অবশ্য কূটনৈতিক প্রটোকল বজায় রেখে ‘বিষয়টি তারা পর্যবেক্ষণ করছে’ বলে ছেড়ে দিয়েছে। কিন্তু ভারতীয় সংবাদমাধ্যম প্রটোকলের ধার ধারে না, বিশেষত বাংলাদেশ প্রসঙ্গে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যথারীতি কথার ফুলঝুরি ছুটেছে।
মোংলা বন্দর ও তিস্তা বাঁধ প্রকল্প নিয়ে নতুন বন্দোবস্ত, কারও কারও চোখে ভারতের জন্য মহাসর্বনাশ। মোদি সরকারের ঘনিষ্ঠ রিলায়েন্স গ্রুপের সিএনএন-নিউজ ১৮ পোর্টালে লেখা হয়েছে, তারেক রহমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর সে দেশের নীতিতে যে পরিবর্তন আসছে, তা ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং আঞ্চলিক সীমান্ত কূটনীতিকে বড় রকমের ধাক্কার মুখে ফেলে দিয়েছে।
.চীনের সঙ্গে সুসম্পর্ক বাংলাদেশের দর–কষাকষির সক্ষমতা বাড়াবে.তারা আরও লিখেছে, ‘একটি বড় নীতি পরিবর্তনের মাধ্যমে ঢাকা মর্যাদাপূর্ণ মোংলা উন্নয়ন প্রকল্পটি চীনের হাতে তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা ২০১৫ সালে মূলত ভারতকে দেওয়া একটি বরাদ্দকে কার্যকরভাবে বাতিল করে করা হয়েছে। ঘটনাটি বঙ্গোপসাগরে নয়াদিল্লির দীর্ঘদিনের প্রভাবকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করে এবং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি গভীর শৈত্যপ্রবাহের ইঙ্গিত দেয়।’
ইন্ডিয়া টুডের ভিডিও ভাষ্যে আরও তির্যকভাবে বলা হয়েছে, মোংলা বন্দর চীনের হাতে চলে যাওয়াটা ভারতের জন্য বিশাল কৌশলগত বিপর্যয়। ভারতের সীমান্তের এত কাছে একটি সমুদ্রবন্দর যদি চীনের নিয়ন্ত্রণে রয়ে যায়, তাহলে ভারতীয় সমুদ্রসীমায় নজরদারি করার বিস্তর সুযোগ সে পেয়ে যাবে। এনডিটিভির আরেক ভাষ্যকার তারা কার্থা প্রায় তর্জনী উঁচিয়ে বলেছেন, ভারতের উচিত হবে এ ব্যাপারে ‘ভীষণ ভীষণ’ সতর্ক হওয়া।
শুধু ভারতীয় নয়, একাধিক আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকও তারেক রহমানের চীন সফরের বিশেষত্ব নিয়ে আলোচনা-পর্যালোচনা করছেন। মাইকেল কুগেলম্যান ফরেন পলিসি পত্রিকায় লিখেছেন, এই সফর শুধু বাংলাদেশ ও তার এক মুখ্য অংশীজনের রুটিন দেখা-সাক্ষাৎ নয়, এটির উদ্দেশ্য ভারতের উদ্দেশে একটি বার্তা পাঠানো।
.বাংলাদেশ, মিয়ানমার ও চীন নিয়ে ত্রিদেশীয় অর্থনৈতিক করিডর বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। প্রস্তাবটি নতুন নয়। হাসিনা আমলেই চীন তার ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’-এর অংশ হিসেবে বাংলাদেশের কাছে প্রস্তাবটি রেখেছিল, কিন্তু নানা কারণে কাজ এগোয়নি। আরও আগে, ১৯৯৯ সালে, ভারতকে অন্তর্ভুক্ত করে এমন একটি করিডরের প্রস্তাব অধ্যাপক রেহমান সোবহানের সিপিডি থেকে করা হয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশ ও মিয়ানমারকে অন্তর্ভুক্ত করে চীনের কুনমিং থেকে কলকাতা পর্যন্ত রেল ও সড়ক যোগাযোগ প্রতিষ্ঠা। মাঠপর্যায়ে কিছু সমীক্ষাও হয়েছিল, কিন্তু প্রকল্পটি এগোয়নি মূলত ভারত-চীনের মধ্যে সম্পর্কের ক্রমাবনতির কারণে।
তা ছাড়া মিয়ানমারের যে অঞ্চল থেকে বাংলাদেশে এই করিডর যাওয়ার কথা, তার অধিকাংশই এখন আরাকান বিদ্রোহীদের হাতে। ফলে মিয়ানমারের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না আসা পর্যন্ত এই করিডর প্রকল্প খুব যে এগোবে, তা মনে হয় না। তা ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র এই অঞ্চলে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব মোটেই ভালো চোখে দেখছে না। সে কথা মাথায় রেখেই বাংলাদেশ সম্ভবত এখন পর্যন্ত চীনের প্রস্তাবে কোনো সম্মতি জানায়নি।
.চীন–ভারত: বড় শক্তির ছায়ায় বাংলাদেশ কীভাবে নিজের ছায়া অক্ষুন্ন রাখবে.ভারতীয় বিশ্লেষকেরা মোংলা, তিস্তা ও সংযোগ করিডর—এই তিন প্রকল্পের ব্যাপারেই সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। তাঁদের একজন হলেন বাংলাদেশে ভারতের সাবেক রাষ্ট্রদূত বীণা সিক্রি। এনডিটিভিকে তিনি বলেছেন, ২০২৪ সালে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার আগে তাঁর শেষ সরকারি সফরের সময় হাসিনার সঙ্গে ভারতের যে সমঝোতা হয়েছিল, তারেক রহমান সেখান থেকে সরে এসেছেন।
সিক্রি অভিযোগের সুরে বলেছেন, সে সময় মোংলা বন্দর আধুনিকীকরণ প্রকল্প এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরে তিস্তা পানি ব্যবস্থাপনা প্রকল্প—দুটোই ভারতকে দেওয়া হয়েছিল। মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তা উল্টে দেন। তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর ভারত আশা করেছিল, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি প্রথম ভারতেই আসবেন। তা যে হলো না, সেটাও একটা বড় পরিবর্তন।
বীণা সিক্রি খোলামেলাভাবেই ইঙ্গিত করছেন, ২০২৪-এর পটপরিবর্তনের পর বাংলাদেশের মতিগতি বদলেছে, ‘কথা ছিল মোংলা আমরা পাব। সেটা যে চীন পেয়ে গেল, তা তো মস্ত পরিবর্তন।’ তিনি বুঝতে পেরেছেন, এই সফরের ভেতর দিয়ে তারেক রহমান যে বার্তা পাঠালেন, তার মোদ্দাকথা হলো গাড়ির ড্রাইভারের সিটে ভারত বসে নেই।
অন্যদিকে তারেক রহমানের চীন সফর নিয়ে ভারতের উষ্মা তার ‘বড় ভাইসুলভ আচরণ’, এমন কথা চীনের তরফ থেকে বলা হচ্ছে। কমিউনিস্ট পার্টির ঘনিষ্ঠ গ্লোবাল টাইমস বলেছে, এতে ভারতের উদ্বেগের কিছু নেই। চাইলে ভারতও চীন-বাংলাদেশের সঙ্গে এককাট্টা হয়ে উন্নয়নের অংশীদার হতে পারে।
.যুক্তরাষ্ট্র–চীন: দুই পরাশক্তির বিশ্বে বাংলাদেশ কী করবে.বাংলাদেশের কর্তাব্যক্তিরা তাঁদের এই নবলব্ধ ‘চীনা তাস’–এর ব্যাপারে উৎফুল্ল, তাতে সন্দেহ নেই। পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান বলেছেন, বাংলাদেশ এখন আর শুধু একটি ‘ক্লায়েন্ট স্টেট’ নয়, সম-অধিকারসম্পন্ন উন্নয়ন অংশীদার। তবে পুরোপুরি গাঁটছড়া বাঁধার আগে চীনের সঙ্গে চুক্তির শর্তগুলো পুরোপুরি যাচাই করে নেওয়া উচিত বলে মনে করি।
চীনের কাছ থেকে বড় ঋণ নিয়ে আফ্রিকার কোনো কোনো দেশ ‘ফাঁদে’ পড়ে গেছে। প্রতিবেশী শ্রীলঙ্কা তার হাম্বানটোটা বন্দর চীনের হাতে ছেড়ে দেওয়ার যে অভিজ্ঞতা, তা-ও খুব ভালো নয়। পাকিস্তানের সঙ্গে চীনের যে ‘ইকোনমিক করিডর’ চুক্তি, তার অভিজ্ঞতাও খুব ভিন্ন নয়। শ্রীলঙ্কার মতো সে-ও ঋণের বোঝায় নুয়ে আছে।
এসব দেশের অভিজ্ঞতা থেকে বাংলাদেশের শেখার রয়েছে। পাকিস্তানি অর্থনীতিবিদ কায়সার বেঙ্গলি বলেছেন, চীন হিসাব-নিকাশে পাকিস্তানকে ফাঁদে ফেলেছে, তা নয়। পাকিস্তানই ভালো-মন্দ বিচার করে এগোয়নি। নিরাপত্তাবিশেষজ্ঞ আয়েশা সিদ্দিকা বলেছেন আরেক কথা। দুই দেশ যে প্রকল্পই হাতে নিক, তা যেন স্বচ্ছ হয়, কোনো গোপন চুক্তির আড়ালে বাস্তবতা ঢাকা না পড়ে যায়। সবচেয়ে বড় কথা, দেশের মানুষকে যুক্ত করতে হবে, প্রতিটি প্রকল্পে মালিকানা তাঁদের হাতে তুলে দিতে হবে।
.প্রায় একই কথা বলেছেন শ্রীলঙ্কার বিশেষজ্ঞরা। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের সাবেক অন্যতম অর্থনীতিবিদ নেশন ভিগনারাজা বলেছেন, চীনা সাহায্য ভালো, কিন্তু নজরদারি নিজের হাতে রাখতে হবে। কোন প্রকল্প উপকারী, কোনটা উপকারী নয়, বিদেশিদের চেয়ে নিজেদের বেশি ভালো জানার কথা। আরেক অর্থনীতিবিদ হার্শা ডি সিলভা সতর্ক করে বলেছেন, উপযোগী নয়—এমন কোনো প্রকল্প, তা যত লোভনীয় হোক না কেন, তাতে অর্থ বিনিয়োগ না করাই ভালো।
প্রতিটি পরামর্শ মনে রাখার মতো। আমাদের উন্নয়নের অংশীদার হয়ে চীন আসুক, আমরা তা অবশ্যই চাই। তবে পা ফেলার আগে প্রতিটি পদক্ষেপ যেন বুঝেশুনে ফেলি। সবচেয়ে বড় কথা, কোনো অবস্থায় যেন আমাদের সার্বভৌমত্ব হুমকির মুখে না পড়ে।
● হাসান ফেরদৌস প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক
* মতামত লেখকের নিজস্ব






