স্বাস্থ্য, শিক্ষা, বাসস্থান, নাগরিক অধিকার, যানজট, দূষণ এবং জীবনযাত্রার ব্যয়—সব মিলিয়ে ঢাকা যে বসবাসের উপযোগী নগর নয়, তা প্রায় আড়াই কোটি নাগরিক প্রতিনিয়ত অনুভব করছেন। নগর-পরিকল্পনাবিদ, জনস্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞ ও পরিবেশকর্মীরা দীর্ঘ সময় ধরে ঢাকাকে বাসযোগ্য করার জন্য অসংখ্য পরামর্শ দিলেও নীতিনির্ধারকদের কাছে তা কেবল প্রতিশ্রুতি হিসেবেই রয়ে গেছে।
বিভিন্ন বৈশ্বিক সূচকে ঢাকা দীর্ঘদিন ধরেই নিচের দিকে অবস্থান করছে। তবে যুক্তরাজ্যভিত্তিক গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান ইকোনমিস্ট গ্রুপের গবেষণা বিভাগ ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (ইআইইউ) সাম্প্রতিক সূচকে ঢাকার বাসযোগ্যতা নিয়ে যে চিত্র ফুটে উঠেছে, তা অত্যন্ত হতাশাজনক। উল্লেখ্য, গত বছরের সূচকেও ঢাকার অবস্থান একই ছিল।
মুক্তকণ্ঠের খবর জানাচ্ছে, স্থিতিশীলতা, স্বাস্থ্যসেবা, সংস্কৃতি ও পরিবেশ, শিক্ষা ও অবকাঠামো—এই পাঁচটি সূচকের ভিত্তিতে গত সোমবার ইআইইউ বিশ্বের ১৭৩টি নগরের বাসযোগ্যতার ওপর একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। সেখানে বিশ্বের সবচেয়ে কম বাসযোগ্য শহরের তালিকায় ঢাকার অবস্থান তৃতীয়। ঢাকার চেয়ে কেবল সিরিয়ার দামেস্ক ও লিবিয়ার ত্রিপোলি—এই যুদ্ধবিধ্বস্ত দুটি শহরের অবস্থা খারাপ। ১০০-এর মধ্যে ঢাকার স্কোর ৪২, যার অর্থ ঢাকা একেবারে অসহনীয় শহরের চেয়ে সামান্য উপরে অবস্থান করছে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, পাঁচটি সূচকের মধ্যে শিক্ষা ছাড়া বাকি চারটিতেই ঢাকার স্কোর উল্লেখযোগ্যভাবে কম। শিক্ষায় ঢাকার স্কোর ৬৭ হলেও সংঘাত ও অস্থিরতার ঝুঁকিতে স্কোর ৪৫ এবং স্বাস্থ্যসেবায় স্কোর ৪২। এর মাধ্যমে বোঝা যায়, ঢাকায় শিক্ষার সুযোগ ভালো থাকলেও অপরাধপ্রবণতার কারণে শহরটি ঝুঁকিপূর্ণ এবং স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তির সুযোগ অত্যন্ত সীমিত। সংস্কৃতি ও পরিবেশের ক্ষেত্রেও নিম্ন সূচক নির্দেশ করে যে, একটি প্রাণবন্ত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নগর গড়ে তোলার ক্ষেত্রে আমরা পিছিয়ে আছি, যা বিদেশিদের আকৃষ্ট করার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অবকাঠামো সূচকে ঢাকার অবস্থা শোচনীয়, যেখানে স্কোর মাত্র ২৭। এর অর্থ সড়ক যোগাযোগ, গণপরিবহনের মান, মানসম্মত আবাসন এবং জ্বালানি ও পানির মতো মৌলিক সেবা প্রাপ্তিতে নগরবাসী চরম ভোগান্তির শিকার। প্রশ্ন উঠছে, প্রতি বছর বাজেটে অবকাঠামো খাতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ দেওয়া সত্ত্বেও কেন এমন দুরবস্থা? এর ইঙ্গিত এই যে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত পরিবহন অবকাঠামো মূলত ১০-১৫ শতাংশ নাগরিকের স্বার্থে তৈরি করা হয়েছে। আবাসনের ক্ষেত্রেও একই বৈষম্যমূলক নীতি চলছে, যার ফলে লাখ লাখ নিম্ন আয়ের মানুষ ন্যূনতম নাগরিক সুবিধা ছাড়াই বস্তিতে বাস করতে বাধ্য হচ্ছেন। অসম উন্নয়নের কারণে নগরমুখী মানুষের স্রোত থামানো যাচ্ছে না এবং চাহিদা অনুযায়ী পানি ও জ্বালানি সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না।
ইআইইউ-এর এই সূচক থেকে নীতিনির্ধারকদের শিক্ষা নেওয়া প্রয়োজন। অবকাঠামো খাতে প্রচলিত বৈষম্যমূলক উন্নয়ন নীতি থেকে বেরিয়ে আসা জরুরি। সিটি করপোরেশনের উচিত প্রতিটি ওয়ার্ড ধরে সমস্যাগুলো বিশ্লেষণ করে সমাধান করা।
সরকার বর্তমানে থমকে যাওয়া অর্থনীতির গতি ফেরাতে বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে চাইছে। তবে সরকারকে মনে রাখতে হবে, ঢাকার বাসযোগ্যতার সূচক বৃদ্ধি না করলে অনেক বিদেশি বিনিয়োগকারী ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশে আসতে আগ্রহী নাও হতে পারেন।






