বিশ্বকাপ ফুটবলে রেফারি হওয়া অত্যন্ত চাপের কাজ এবং একে অন্যতম কঠিন পেশা বলা যেতে পারে। তবে এই কঠিন দায়িত্বের বিপরীতে তাঁরা পান আকর্ষণীয় পারিশ্রমিক। টুর্নামেন্টের আগে নির্বাচিত রেফারিদের প্রায় এক থেকে দুই বছর বিশেষ প্রশিক্ষণ, ফিটনেস পরীক্ষা, ভিএআর প্রশিক্ষণ এবং ম্যাচ সিমুলেশনের মধ্য দিয়ে যেতে হয়।

সম্প্রতি ফুটবল বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর ম্যাচে আর্জেন্টিনা ও মিসরের লড়াইয়ে বিতর্ক তৈরি হয়। দ্বিতীয়ার্ধে মোস্তাফা জিকো একটি গোল করলেও ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারির (ভিএআর) পর্যালোচনায় তা বাতিল হয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত ৩-২ ব্যবধানে নাটকীয় জয় পায় আর্জেন্টিনা। যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়া অঙ্গরাজ্যের আটলান্টা শহরের মাঠের এই বিতর্ক এতটাই ছড়িয়েছে যে, বাংলাদেশের যশোরের দড়াটানার মোড়ে গভীর রাতে দুই পক্ষের মধ্যে তর্কাতর্কি ও ধস্তাধস্তি হয়েছে। মিসরের কোচ হোসাম হাসান সরাসরি অভিযোগ করে বলেছেন, "রেফারিই বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের জিতিয়ে দিয়েছে।"

এই ম্যাচের প্রধান রেফারি ছিলেন ফ্রান্সের ফ্রাঁসোয়া লেতেক্সিয়ে, যিনি বর্তমানে উয়েফা ও ফিফার শীর্ষস্থানীয় রেফারিদের একজন। ২০২৪ সালের উয়েফা ইউরো ফাইনাল পরিচালনার পর ২০২৬ বিশ্বকাপেও গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচের দায়িত্ব পেয়েছেন তিনি।

একজন রেফারির ক্যারিয়ার সাধারণত স্থানীয় বা জেলা পর্যায় থেকে শুরু হয়। এরপর জাতীয় ফুটবল ফেডারেশনের লাইসেন্স অর্জন, দেশের শীর্ষ লিগে ধারাবাহিক ভালো পারফরম্যান্স এবং জাতীয় ফেডারেশনের সুপারিশে ফিফা ইন্টারন্যাশনাল রেফারি লিস্টে অন্তর্ভুক্ত হতে হয়। এরপর আন্তর্জাতিক ম্যাচ ও মহাদেশীয় প্রতিযোগিতা (উয়েফা, কোপা, এএফপি ইত্যাদি) পরিচালনার অভিজ্ঞতার পর ফিফা রেফারি কমিটি বিশ্বকাপের জন্য রেফারি নির্বাচন করে।

রেফারিদের জন্য ফিটনেস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতি ম্যাচে তাঁরা সাধারণত ১০ থেকে ১৩ কিলোমিটার দৌড়ান, যা বড় ম্যাচে ১৪ থেকে ১৫ কিলোমিটারে পৌঁছাতে পারে। অনেক সময় তাঁদের দৌড়ের দূরত্ব একজন মিডফিল্ডারের সমান হয়। স্প্রিন্ট, জগ, ব্যাকওয়ার্ড রানিং এবং সাইড শাফলের সমন্বয়ে তাঁদের এই দৌড় সম্পন্ন করতে হয়। এছাড়া ৪০ মিটার স্প্রিন্ট, পুনরাবৃত্ত স্প্রিন্ট, উচ্চগতির ইন্টারভ্যাল রান এবং ইয়ো-ইয়ো সহনশীলতা পরীক্ষায় নিয়মিত পাস করতে হয় তাঁদের। এই পরীক্ষায় ব্যর্থ হলে আন্তর্জাতিক ম্যাচ পরিচালনার সুযোগ হারাতে পারেন একজন রেফারি।

মাঠে রেফারির দায়িত্ব কেবল ফাউল ধরা নয়; ম্যাচ শুরু, বিরতি ও শেষের বাঁশি বাজানো, ফ্রি-কিক, পেনাল্টি ও অফসাইডে সহকারীর সঙ্গে সমন্বয় এবং হলুদ বা লাল কার্ড প্রদর্শনের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব তাঁদের। এছাড়া ইনজুরি টাইম যোগ করে সময় নিয়ন্ত্রণ এবং ভিএআরের পরামর্শ অনুযায়ী চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাও প্রধান রেফারির। ফুটবলের আইন অনুযায়ী মাঠে রেফারির সিদ্ধান্তই সর্বোচ্চ, যা চূড়ান্ত বলে বিবেচিত হয়, যদিও পরবর্তীতে ভিডিও বিশ্লেষণে ভুল প্রমাণিত হতে পারে। উল্লেখ্য, মোস্তাফা শোবের বাবাও মিসরের গোলরক্ষক হিসেবে বিশ্বকাপে খেলেছেন।

আর্থিক দিক আলোচনা করলে দেখা যায়, সাম্প্রতিক বিশ্বকাপগুলোর তথ্য অনুযায়ী (টুর্নামেন্টভেদে পরিবর্তন হতে পারে), প্রধান রেফারির টুর্নামেন্ট ফি ৫০ থেকে ৭০ হাজার মার্কিন ডলার (প্রায় ৬০ থেকে ৮৫ লাখ টাকা)। এছাড়া ম্যাচপ্রতি তাঁরা ৩ থেকে ৫ হাজার মার্কিন ডলার (সাড়ে ৩ থেকে ৬ লাখ টাকা) পান। ফলে একটি আসরেই একজন প্রধান রেফারি ১ কোটি টাকার বেশি আয় করেন। সহকারী রেফারিদের টুর্নামেন্ট ফি ২৫ থেকে ৩৫ হাজার ডলার (৩০ থেকে ৪২ লাখ টাকা) এবং ম্যাচপ্রতি ২ থেকে ৩ হাজার ডলার (আড়াই থেকে সাড়ে ৩ লাখ টাকা)। ভ্রমণ, আবাসন ও অন্যান্য ভাতা ফিফা বহন করে।

বর্তমানে মাঠের বাইরে একটি সম্পূর্ণ ভিএআর দল থাকে, যার মধ্যে ভিডিও সহকারী রেফারি, সহকারী ভিএআর, অফসাইড ভিএআর এবং রিপ্লে অপারেটর থাকেন। তাঁরা ফুটেজ বিশ্লেষণ করে প্রধান রেফারিকে তথ্য প্রদান করেন।

ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বিখ্যাত রেফারি হিসেবে পরিচিত ইতালিয়ান পিয়েরলুইজি কোলিনা। ২০০২ বিশ্বকাপ ফাইনাল পরিচালনা করা তাঁর ব্যক্তিত্ব ও নিয়ন্ত্রণ ফিফার ইতিহাসে সেরা রেফারিং হিসেবে বিবেচিত। ডিফেন্ডার হিসেবে ফুটবল শুরু করলেও ১৭ বছর বয়সে রেফারি কোর্সে ভর্তি হন তিনি। ১৯৯৫ সালে ফিফার আন্তর্জাতিক রেফারি হয়ে ইতিহাস গড়া কোলিনা বর্তমানে ফিফার রেফারিং কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।