সাহিত্যের ইতিহাসে ঘোস্ট রাইটিং নতুন কিছু নয়। বিশ শতকের বহু বিখ্যাত আত্মজীবনী, রাজনীতিকদের বক্তৃতা, এমনকি কিছু পুরস্কারজয়ী উপন্যাসও পরে জানা গেছে যে সেগুলো অন্য কেউ লিখেছিলেন।
জন এফ কেনেডির পুলিৎজারজয়ী প্রোফাইলস ইন কারেজ বইটি মূলত তাঁর সহকারী থিওডোর সোরেনসেনের লেখা—এই তথ্য পরে বেরিয়েছে। প্রকাশনাশিল্পে এটি দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত একটি ব্যবস্থা।
কিন্তু ফ্রিল্যান্সিংয়ের যুগে ঘোস্ট রাইটিং এখন আর শুধু বই বা বক্তৃতায় সীমাবদ্ধ নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিসন্দর্ভ, গবেষণাপত্র, চাকরির আবেদনপত্র, এমনকি ডক্টরেট প্রস্তাবনা পর্যন্ত টাকার বিনিময়ে লিখিয়ে নেওয়া হচ্ছে। প্রশ্নটা তাই এখন শুধু বাণিজ্যিক নয়, নৈতিক ও ধর্মীয়ও।
.ইসলামি ফিকহে মেধাশ্রম বিক্রি করে উপার্জন করাকে ইজারা বা পারিশ্রমিকভিত্তিক সেবার অন্তর্ভুক্ত ধরা হয়, যা মূলত বৈধ। একজন স্থপতি অন্যের জন্য নকশা করেন, একজন আইনজীবী অন্যের পক্ষে যুক্তি সাজান—এগুলো কেউ অবৈধ বলেন না।
একইভাবে একজন লেখক যখন কোনো ব্যবসায়ী বা প্রতিষ্ঠানের জন্য কনটেন্ট লিখে দেন, চুক্তি স্বচ্ছ এবং উভয় পক্ষের সম্মতি আছে—শরিয়তের দৃষ্টিতে এতে আপত্তির জায়গা নেই।
কোরআনে বলা হয়েছে, ‘হে মুমিনগণ, তোমরা একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস কোরো না, শুধু পারস্পরিক সম্মতিতে ব্যবসার মাধ্যমে ছাড়া।’ (সুরা নিসা, আয়াত: ২৯)
পারস্পরিক সম্মতিতে মেধাস্বত্ব হস্তান্তর—এটি এই আয়াতের আওতায় বৈধ।
হানাফি ফিকহের মূল গ্রন্থ আল-হিদায়ায় লেখা হয়েছে, যেকোনো হালাল কাজ সম্পাদনের বিনিময়ে পারিশ্রমিক নেওয়া জায়েজ, যদি কাজটির ধরন ও পারিশ্রমিক পরিষ্কারভাবে নির্ধারিত থাকে। (মারগিনানি, আল-হিদায়া, ৩/২৩০, করাচি)
ঘোস্ট রাইটিংয়ের বৈধ রূপটি এই সংজ্ঞার মধ্যেই পড়ে।
.ড্রপশিপিং ব্যবসা: মালিক না হয়ে পণ্য বিক্রি কি বৈধ.সমস্যা শুরু হয় যখন ঘোস্ট রাইটিং একাডেমিক বা প্রাতিষ্ঠানিক মূল্যায়নের ক্ষেত্রে ব্যবহার হয়।
একটি বিশ্ববিদ্যালয় যখন একজন শিক্ষার্থীকে অভিসন্দর্ভ লিখতে বলে, তখন আসলে একটি নির্দিষ্ট প্রশ্নের উত্তর খোঁজা হয় যে এই শিক্ষার্থী কি নিজে চিন্তা করতে পারে, গবেষণা করতে পারে, তার শেখাটা কতটা গভীর?
কিন্তু যখন অন্য কেউ টাকার বিনিময়ে সেই অভিসন্দর্ভ লিখে দেয় এবং শিক্ষার্থী নিজের নামে জমা দিয়ে ডিগ্রি নেয়, তখন প্রতিষ্ঠানকে ধোঁকা দেওয়া হচ্ছে, সমাজকে ধোঁকা দেওয়া হচ্ছে এবং নিজেকেও।
ইসলামে প্রতারণার বিষয়ে মহানবীর অবস্থান অত্যন্ত স্পষ্ট। একটি বিখ্যাত হাদিসে তিনি বলেছেন, ‘যে আমাদের সঙ্গে প্রতারণা করে, সে আমাদের দলভুক্ত নয়’। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১০২)
এখানে প্রতারণার লক্ষ্য শুধু ব্যক্তি নয়, প্রতিষ্ঠানও হতে পারে।
ইমাম নববি এই হাদিসের ব্যাখ্যায় লিখেছেন, ‘যেকোনো ক্ষেত্রে প্রতারণা, তা ব্যবসায়িক হোক, সামাজিক হোক বা জ্ঞানের ক্ষেত্রে হোক, ইসলামের মূল নৈতিক কাঠামোর বিরুদ্ধে।’ (নববি, শারহু সহিহ মুসলিম, ২/১০৯, বৈরুত)
.প্রশ্নটা শুধু যে কিনছে তার নয়, যে লিখে দিচ্ছে তারও।
ইসলামি ফিকহে পাপকাজে সহযোগিতার (ইআনাতু আলাল মাসিয়া) ধারণাটি গুরুত্বপূর্ণ। ইমাম ইবনে কুদামা লিখেছেন, ‘যে কাজ সরাসরি অন্যায়ের সুযোগ তৈরি করে, সেই কাজে অংশ নেওয়া বৈধ নয়, যদিও কাজটি নিজে বৈধ হতে পারে। (ইবনে কুদামা, আল-মুগনি, ৪/১৩০, কায়রো)
.‘বডি শেমিং’: ছোট মন্তব্যের বড় পাপ.একজন কারিগর ছুরি বানান, সেটা বৈধ। কিন্তু জেনেশুনে কাউকে খুনের উদ্দেশ্যে ছুরি বানিয়ে দিলে দায় তাঁরও।
একইভাবে একজন ঘোস্ট রাইটার যখন জানেন যে তাঁর লেখা একাডেমিক জালিয়াতির কাজে ব্যবহার হবে, কেউ সেটা নিজের থিসিস বা গবেষণাপত্র হিসেবে জমা দেবে, তখন তিনি সেই প্রতারণার অংশীদার হচ্ছেন। পারিশ্রমিকটা হালাল থাকে না।
.ফিকহবিদেরা সাধারণত ঘোস্ট রাইটিংকে তিনটি স্তরে ভাগ করে দেখেন।
প্রথম স্তর: বাণিজ্যিক কনটেন্ট, ব্লগ, বিজ্ঞাপন, কোম্পানির যোগাযোগ। এখানে উভয় পক্ষ জানে কী হচ্ছে, প্রতারণার উপাদান নেই। এটি বৈধ।
দ্বিতীয় স্তর: জীবনীগ্রন্থ, বক্তৃতা, সাধারণ সাহিত্য। এখানে পাঠক জানেন না লেখক কে, কিন্তু প্রতিষ্ঠানগতভাবে কাউকে ধোঁকা দেওয়া হচ্ছে না। ফিকহবিদদের মধ্যে এ নিয়ে কিছু মতভেদ আছে, তবে অনুমতিযোগ্য বলে অধিকাংশ মনে করেন।
তৃতীয় স্তর: একাডেমিক থিসিস, গবেষণাপত্র, প্রাতিষ্ঠানিক মূল্যায়ন। এখানে প্রতিষ্ঠানকে সরাসরি প্রতারণা করা হচ্ছে। এটি অবৈধ—লেখক ও ক্রেতা উভয়ের জন্য।
মেধা বিক্রি করা অপরাধ নয়। কিন্তু মেধা ভাড়া দিয়ে অন্যকে অযোগ্য প্রমাণিত করতে সাহায্য করা অন্যায়।
বাংলাদেশে প্রতিবছর হাজার হাজার থিসিস জমা হয়, গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়। এর কতটা সত্যিকারের গবেষণা আর কতটা কেনা কাজ—এই প্রশ্নের উত্তর শুধু নৈতিক নয়, জাতির মেধার ভবিষ্যতের প্রশ্নও।
.অনলাইনে জীবনসঙ্গী খোঁজার পথটি কি ‘হালাল’ হচ্ছে





