কয়েক বছর আগে ঢাকার একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে কনের মা বলছিলেন, মেয়ের বিয়ে হয়েছে ফেসবুক ম্যাট্রিমনিয়াল গ্রুপে পরিচয়ের পর। ছয় মাস পরিবারিকভাবে দেখাশোনা, তারপর বিয়ে। পরিবার, বর–কনে সবাই সবাইকে জেনেছে। সবাই এখন ভালো আছে।

একই সময়ে আরেকজন তরুণী একটি ডেটিং অ্যাপে পরিচিত হওয়া ব্যক্তির সঙ্গে মাসের পর মাস গোপনে কথা বলেছেন, পরিবারকে না জানিয়ে একা দেখা করেছেন, তারপর জেনেছেন লোকটি বিবাহিত এবং তাঁর প্রোফাইলের তথ্যের বেশির ভাগই মিথ্যা।

দুটি ঘটনা, দুটি ফলাফল। পার্থক্যটা কোথায়?

.

জীবনসঙ্গী খোঁজার প্রক্রিয়া সব যুগেই ছিল—কখনো ঘটকের মাধ্যমে, কখনো পারিবারিক যোগাযোগে, কখনো সামাজিক অনুষ্ঠানে। মাধ্যম বদলেছে, প্রয়োজন বদলায়নি।

কোরআনে বলা হয়েছে, ‘তোমাদের মধ্যকার অবিবাহিত নারী-পুরুষদের বিয়ের ব্যবস্থা করো।’ (সুরা নুর, আয়াত: ৩২)

আয়াতটি পরিবার ও সমাজকে এই দায়িত্ব নিতে বলছে—শুধু ব্যক্তিকে নয়।

কিন্তু বাস্তবতা হলো, আধুনিক শহুরে জীবনে পারিবারিক নেটওয়ার্ক সংকুচিত হয়েছে। অনেক পরিবারে বিয়ের উপযুক্ত ছেলে বা মেয়ে খুঁজে দেওয়ার মতো সক্রিয় মাধ্যম নেই। এই শূন্যস্থানে অনলাইন ম্যাট্রিমনিয়াল প্ল্যাটফর্ম এসেছে এবং সেটা সম্পূর্ণ অস্বীকার করার সুযোগ নেই।

প্রশ্ন হলো, কোন ধরনের অনলাইন যোগাযোগ বৈধ, কোনটা সমস্যাজনক।

.হালাল-হারাম চেনার সহজ ৫ উপায়.

এই দুটিকে একই পাল্লায় মাপা ঠিক হবে না।

ম্যাট্রিমনিয়াল প্ল্যাটফর্মের উদ্দেশ্য বিয়ে, যোগাযোগ সাধারণত পরিবারের জানাশোনায় হয়, তথ্য যাচাইয়ের ব্যবস্থা থাকে। ডেটিং অ্যাপের কাঠামো ভিন্ন—সেখানে গোপনীয়তা মূল বৈশিষ্ট্য, সম্পর্কের লক্ষ্য অনির্দিষ্ট, পরিবারের কোনো অংশগ্রহণ নেই।

ইসলামে বিয়ের আগে পাত্র-পাত্রী একে অপরকে দেখতে পারেন—এর স্পষ্ট অনুমতি আছে।

নবীজি (সা.) এক সাহাবিকে বিয়ের প্রস্তাব দেওয়ার আগে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘তুমি কি তাকে দেখেছ?’ না শুনে বললেন, ‘দেখে নাও। এটা তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা তৈরিতে সহায়ক হবে।’ (সুনানে নাসায়ি, হাদিস: ৩২৩৫)

কিন্তু এই দেখার প্রক্রিয়া হওয়ার কথা উন্মুক্ত ও পারিবারিক অভিভাবকত্বে—গোপনে নয়।

.

ইসলামি বিধানে ‘খালওয়াত’ বা নির্জনে অপরিচিত নারী-পুরুষের একাকী অবস্থান নিষিদ্ধ। নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘কোনো পুরুষ যেন কোনো নারীর সঙ্গে নির্জনে না থাকে—তাদের তৃতীয়জন হয় শয়তান।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫২৩৩)

এই নিষেধাজ্ঞার পেছনে কারণ হলো, গোপনীয়তা আবেগীয় আসক্তি তৈরি করে, যা বিচারবুদ্ধিকে দুর্বল করে।

গভীর রাতে গোপন চ্যাট, ভিডিও কলকে বলা ঠিক এ সমস্যার ডিজিটাল রূপ বা ডিজিটাল খালওয়াত। আধুনিক ফিকহবিদরাও মনে করেন, পর্দার নীতি ডিজিটাল যোগাযোগে প্রযোজ্য।

তবে মূল সতর্কতার যুক্তিটি হলো, গোপন সম্পর্ক ক্রমশ জটিল হয়।

.ইসলামে দাম্পত্য: ছোট ছোট বিষয়ের মধ্যেই শক্তি.

অনলাইন ম্যাট্রিমনিয়াল বা ডেটিং প্ল্যাটফর্মে যা দেখা যায়, তা হলো ফিল্টার করা ছবি, সাজানো বিবরণ, কখনো সরাসরি মিথ্যা তথ্য। চাকরি, শিক্ষাগত যোগ্যতা, পারিবারিক অবস্থা—সব বাড়িয়ে বলা হয়।

নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘যে আমাদের সাথে প্রতারণা করে, সে আমাদের দলভুক্ত নয়।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১০২)

বিয়ের মতো সম্পর্কের সূচনা যদি মিথ্যার ওপর হয়, সেই সম্পর্কের ভিত্তি শুরু থেকেই দুর্বল। ইমাম ইবনে কুদামা করেছেন, ‘বিয়ের ক্ষেত্রে কোনো পক্ষ যদি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গোপন করে বা মিথ্যা বলে, তবে অপর পক্ষের চুক্তি বাতিলের অধিকার থাকে।’ (ইবনে কুদামা, আল-মুগনি, ৯/৪৬৩, কায়রো)

.

নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘নারীকে সাধারণত চারটি কারণে বিয়ে করা হয়—সম্পদ, বংশ, সৌন্দর্য ও ধার্মিকতা। তুমি ধর্মভীরু নারী লাভ করে সফল হও। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫০৯০)

একই নীতি পুরুষের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। কিন্তু ডেটিং অ্যাপের কাঠামোতে প্রথমেই যা দেখা যায়, তা হলো ছবি—চরিত্র, ধার্মিকতা, মূল্যবোধ পরে আসে, যদি আসে।

এই উল্টা ক্রমটাই মূল সমস্যা।

অনলাইনে জীবনসঙ্গী খোঁজা নিষিদ্ধ নয়, কিন্তু কীভাবে খোঁজা হচ্ছে, সেটা গুরুত্বপূর্ণ। পরিবারের জানাশোনায় সততার সঙ্গে স্পষ্ট উদ্দেশ্য নিয়ে এই শর্তগুলো মানলে মাধ্যমটা অনলাইন হলেও আপত্তি নেই।

আপত্তি হলো গোপনীয়তায় এবং মিথ্যায়।

.আয়েশা (রা.) থেকে দাম্পত্য জীবনে ত্যাগের শিক্ষা