কয়কে বছর আগে পাকিস্তানের করাচিতে একজন জনপ্রিয় ইউটিউবার মারা যান। তাঁর চ্যানেলে সাবস্ক্রাইবার ছিল বিশ লাখের বেশি, প্রতি মাসে বিজ্ঞাপন থেকে আয় হতো লক্ষাধিক টাকা। মৃত্যুর পর পরিবারের সদস্যরা চ্যানেলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিবাদে জড়িয়ে পড়লেন।

কেউ চ্যানেল চালু রাখতে চান, কেউ বন্ধ করতে চান, কেউ বিক্রি করতে চান। পাসওয়ার্ড জানতেন শুধু মৃত ব্যক্তির ছোট ভাই; যিনি নিজেই অ্যাকাউন্টের একমাত্র দাবিদার হয়ে বসলেন।

ঘটনাটি বিচ্ছিন্ন নয়। ডিজিটাল সম্পদ নিয়ে মৃত্যু-পরবর্তী বিবাদ এখন বিশ্বজুড়ে বাড়ছে, এবং ইসলামি ফিকহ এই নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি।

.

ইসলামি ফিকহে উত্তরাধিকারযোগ্য সম্পদ হতে হলে তাকে মাল হতে হয়—অর্থনৈতিক মূল্যসম্পন্ন এবং হস্তান্তরযোগ্য। পূর্বেকার ফিকহবিদরা সাধারণত দৃশ্যমান বস্তুর কথা বলতেন, কিন্তু আধুনিক যুগে ওআইসি ফিকহ একাডেমি সহ বিশ্বের প্রধান ইসলামি গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো মেধাস্বত্ব, কপিরাইট এবং ডিজিটাল মালিকানাকে সম্পদের অন্তর্ভুক্ত করেছে, কারণ এগুলো হস্তান্তরযোগ্য এবং বাণিজ্যিক মূল্য আছে।

কোরআনে উত্তরাধিকার বণ্টনের বিধান দিতে গিয়ে বলা হয়েছে, “পিতামাতা ও আত্মীয়স্বজনরা যা রেখে গেছে, তাতে পুরুষদের অংশ রয়েছে এবং নারীদেরও অংশ রয়েছে, তা অল্প হোক বা বেশি হোক।” (সুরা নিসা, আয়াত: ৭)

এখানে “যা রেখে গেছে” এই ব্যাপক শব্দবন্ধ ডিজিটাল সম্পদকেও অন্তর্ভুক্ত করে বলে আধুনিক ফিকহবিদরা মনে করেন।

.প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় ইসলামের ৫ বিধান.

মৃত ব্যক্তির ডিজিটাল উপস্থিতি মূলত দুই ধরনের।

প্রথমত, বাণিজ্যিক অ্যাকাউন্ট: ইউটিউব চ্যানেল, মনেটাইজড ফেসবুক পেজ, ই-কমার্স স্টোর, যেখান থেকে নিয়মিত আয় হয়। এগুলো সরাসরি সম্পদ এবং শরিয়তের উত্তরাধিকার বিধান অনুযায়ী ওয়ারিশদের মধ্যে বণ্টিত হবে।

নবীজি (সা.) বলেছেন, “যে ব্যক্তি সম্পদ রেখে যায়, তা তার ওয়ারিশদের জন্য।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৭৩৩)

পাসওয়ার্ড জানার সুবাদে কোনো একজন ওয়ারিশ একা এই সম্পদ ভোগ করলে বাকিদের হক নষ্ট হয়।

দ্বিতীয়ত, ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্ট: যেখানে আয় নেই, আছে ব্যক্তিগত ছবি, কথোপকথন, ব্যক্তিগত তথ্য। এখানে প্রশ্নটা উত্তরাধিকারের নয়, গোপনীয়তার।

কোরআন বলেছে, “তোমরা একে অপরের গোপন অনুসন্ধান করো না।” (সুরা হুজুরাত, আয়াত: ১২)

মৃত্যু মানুষের গোপনীয়তার অধিকার শেষ করে না। ইমাম নববি লিখেছেন, মানুষের সম্মান ও গোপনীয়তা রক্ষা মৃত্যুর পরও ওয়াজিব। (নববি, শারহু সহিহ মুসলিম, বৈরুত, খ. ১৬, পৃ. ১৪২)

তাই এ ধরনের অ্যাকাউন্ট যদি উন্মুক্ত হলে মৃত ব্যক্তির সম্মান ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা থাকে, তবে ওয়ারিশদের দায়িত্ব সেটি বন্ধ বা মুছে দেওয়া।

.

ক্রিপ্টোকারেন্সির বৈধতা নিয়ে ফিকহবিদদের মধ্যে মতভেদ আছে। কিন্তু যদি কেউ এটি তার বিবেচনায় বৈধ পন্থায় অর্জন করে থাকেন এবং তাঁর পোর্টফোলিওতে এর আর্থিক মূল্য থাকে, তাহলে মৃত্যুর পর এটি মিরাসের অন্তর্ভুক্ত হবে এবং শরিয়তসম্মত অনুপাতে বণ্টিত হবে।

আরেকটি জটিল প্রশ্ন হলো ডিজিটাল ঋণ। নেটফ্লিক্সের মাসিক সাবস্ক্রিপশন, ক্লাউড স্টোরেজের ভাড়া, কিস্তিতে কেনা ফোনের বাকি অংশ—এগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে চলতে থাকে।

ইসলামে ঋণ পরিশোধ এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে নবীজি (সা.) বলেছেন, “মুমিনের আত্মা তার ঋণের সাথে ঝুলন্ত থাকে, যতক্ষণ না তা পরিশোধ করা হয়।” (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ২৪১৩)

সুতরাং মৃত ব্যক্তির অনলাইন অ্যাকাউন্টের সঙ্গে যুক্ত সমস্ত চলমান পেমেন্ট বন্ধ করা এবং বকেয়া থাকলে সম্পদ থেকে পরিশোধ করা ওয়ারিশদের দায়িত্ব।

.ধর্ষণ প্রতিরোধে ইসলামের ভাবনা ও বিধান.

আইনত অধিকার থাকলেই অ্যাকাউন্টে প্রবেশ করা যায় না। টু-ফ্যাক্টর অথেন্টিকেশন, ফেস আইডি, ফিঙ্গারপ্রিন্ট—এই সুরক্ষাব্যবস্থাগুলো মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে অ্যাকাউন্টকে কার্যত আটকে করে দেয়।

ফেসবুক, গুগল, অ্যাপলের মতো কোম্পানির নিজস্ব নীতি আছে মৃত ব্যক্তির অ্যাকাউন্ট নিয়ে—কিন্তু প্রক্রিয়াটি দীর্ঘ ও জটিল।

নবীজি (সা.) বলেছেন, “কোনো মুসলিমের উচিত নয় যে তার কাছে অসিয়ত করার মতো কিছু আছে অথচ সে দুই রাত কাটালো কিন্তু অসিয়ত লিখিত নেই।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৭৩৮)

এই হাদিসের নির্দেশনা ডিজিটাল যুগে নতুন অর্থ পেয়েছে। জীবিত থাকতেই বিশ্বস্ত ব্যক্তির কাছে ডিজিটাল অ্যাকাউন্টের তথ্য নিরাপদে রেখে যাওয়া এখন অসিয়তের অংশ হওয়া উচিত। এ ছাড়া গুগলের ‘ইনঅ্যাক্টিভ অ্যাকাউন্ট ম্যানেজার’ বা ফেসবুকের ‘লিগাসি কন্টাক্ট’—এই আইনি সুবিধাগুলো জীবদ্দশায় চালু রাখা ভালো।

.

ডিজিটাল সম্পদের একটি দিক আছে যা অন্য সম্পদের চেয়ে আলাদা—এটি মৃত্যুর পরও সক্রিয় থাকে।

নবীজি (সা.) বলেছেন, মানুষ মারা গেলে তার আমল বন্ধ হয়ে যায়, তিনটি ছাড়া— চলমান সদকা, এমন জ্ঞান যা দিয়ে মানুষ উপকৃত হয়, এবং সৎ সন্তান যে দোয়া করে। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৬৩১)

একটি ওয়েবসাইটে রাখা কল্যাণকর জ্ঞান, একটি ইউটিউব চ্যানেলে দেওয়া সৎ পরামর্শ—মৃত্যুর পরও মানুষ যদি তা থেকে উপকৃত হয়, এটি সদকায়ে জারিয়ার আওতায় আসতে পারে।

কিন্তু বিপরীতটাও সত্যি। যে চ্যানেলে বিভ্রান্তিকর বা ক্ষতিকর কনটেন্ট আছে, সেটি মৃত্যুর পরও দর্শক পাচ্ছে—সেখানে পাপের ধারা অব্যাহত থাকে।

নবীজি (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি কোনো মন্দ রীতির সূচনা করে, তার ওপর সেই পাপ বর্তায় এবং পরবর্তীকালে যারা তা অনুসরণ করে তাদের পাপের অংশও সে পায়। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১০১৭)

তাই কোনো ডিজিটাল চ্যানেলের উত্তরাধিকার পাওয়ার পর ওয়ারিশদের প্রথম কাজ হওয়া উচিত সেখানে কোনো আপত্তিকর কনটেন্ট আছে কিনা তা দেখা এবং থাকলে সরিয়ে দেওয়া।

মৃত্যুর আগে আমরা যে ডিজিটাল চিহ্ন রেখে যাচ্ছি তার একটা হিসাব এখনই করা দরকার—এটা কাদের কাছে যাবে, কীভাবে যাবে, এবং মৃত্যুর পর সেখান থেকে কী ছড়াবে।

.এক ইহুদি পণ্ডিতের ইসলাম গ্রহণের কাহিনি