বর্ষার আগমনে দেশের পাহাড়ি অঞ্চলগুলো এক অপরূপ সাজে সজ্জিত হয়। মেঘের আনাগোনা, সবুজ অরণ্য আর ঝরনার কলতানে মুগ্ধ হয়ে অনেকেই বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ির মতো পাহাড়ি এলাকায় ভ্রমণে যান। তবে প্রকৃতির এই সৌন্দর্য উপভোগ করতে গিয়ে অনেকের মনে জন্ম নেয় এক ধরনের মানসিক অস্বস্তি, যাকে বলা হয় হাইট ফোবিয়া বা উচ্চতাভীতি।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এই অবস্থাকে বলা হয় 'অ্যাক্রোফোবিয়া'। এটি এমন একটি পরিস্থিতি যেখানে উঁচু স্থানে অবস্থান করলে বা উঁচু জায়গা দেখলে তীব্র ভয় ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়। সাধারণ সতর্কতার সাথে এর পার্থক্য রয়েছে। উঁচু জায়গায় দাঁড়িয়ে সাবধান থাকা স্বাভাবিক, কিন্তু হাইট ফোবিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তি নিরাপদ অবস্থানে থেকেও অযৌক্তিক আতঙ্কে ভোগেন। পাহাড়ের চূড়া, খাড়া ঢাল, পর্যবেক্ষণ টাওয়ার, ঝুলন্ত সেতু কিংবা বিমানে ভ্রমণের সময় এই অনুভূতি হতে পারে।
উচ্চতাভীতির লক্ষণ একেকজনের ক্ষেত্রে একেক রকম হয়। কারও মাথা ঘোরা, বুক ধড়ফড় করা, হাত-পা কাঁপা কিংবা শরীর ঘামানোর মতো উপসর্গ দেখা দেয়। অনেকের মনে হয় তারা ভারসাম্য হারিয়ে নিচে পড়ে যাবেন। গুরুতর ক্ষেত্রে প্যানিক অ্যাটাক বা আতঙ্কজনিত আক্রমণও হতে পারে, যা ভ্রমণের আনন্দকে উদ্বেগে পরিণত করে। তবে মনে রাখা প্রয়োজন, পাহাড় ভ্রমণে সাময়িক ভয় বা অস্বস্তি অনুভব করা স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া। কিন্তু এই ভয় যদি অতিরিক্ত হয় এবং স্বাভাবিক জীবনযাত্রা বা ভ্রমণকে বাধাগ্রস্ত করে, তবেই তাকে ফোবিয়া হিসেবে গণ্য করা হয়।
যাঁরা উচ্চতাভীতিতে ভোগেন, তাঁদের জন্য কিছু প্রস্তুতি কার্যকর হতে পারে। ভ্রমণের আগে গন্তব্য ও পাহাড়ি পথ সম্পর্কে ধারণা নেওয়া এবং অভিজ্ঞ গাইডের সঙ্গে দলবদ্ধভাবে চলাফেরা আত্মবিশ্বাস বাড়াতে সাহায্য করে। খুব উঁচু বা ঝুঁকিপূর্ণ স্থান এড়িয়ে চলা, খাড়া প্রান্তের কাছে না যাওয়া এবং ছবি তোলার সময় ঝুঁকি না নেওয়া জরুরি। উদ্বেগের মুহূর্তে গভীর ও ধীর শ্বাস নেওয়ার অভ্যাস মানসিক প্রশান্তি দিতে পারে।
বর্ষাকালে পাহাড় ভ্রমণে বাড়তি সতর্কতার প্রয়োজন হয়। বৃষ্টির কারণে পথ পিচ্ছিল হয়ে পড়ে, ফলে পিছলে পড়ার ঝুঁকি বাড়ে এবং ভারী বৃষ্টির পর ভূমিধসের আশঙ্কা থাকে। তাই যাত্রার আগে আবহাওয়ার পূর্বাভাস জানা এবং স্থানীয় প্রশাসনের সতর্কবার্তা মেনে চলা উচিত। সাথে ভালো গ্রিপের জুতা, রেইনকোট, প্রাথমিক চিকিৎসাসামগ্রী ও পর্যাপ্ত পানীয় জল রাখা নিরাপদ ভ্রমণের জন্য আবশ্যক।
অনেক সময় প্রকৃত ঝুঁকি এবং উচ্চতার ভয় একে অপরকে আরও বাড়িয়ে তোলে। বর্ষার কুয়াশা বা ভেজা পিচ্ছিল পথ একজন ভীত ব্যক্তির উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। তাই পরিবেশগত ঝুঁকির পাশাপাশি নিজের মানসিক অবস্থার প্রতি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। যথাযথ প্রস্তুতি, সচেতনতা এবং বর্ষাকালের সতর্কতা মেনে চললে পাহাড় ভ্রমণ হতে পারে রোমাঞ্চকর ও স্মরণীয়।






