বাংলাদেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সাদা, নীল, হলুদ, সোনালি রঙের সংগঠন আছে। মূলত এই রঙের মধ্য দিয়ে বোঝানো হয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা কে কোন রাজনীতির সঙ্গে জড়িত।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মতোই বিশ্বের উগ্রবাদী সংগঠনগুলোর মধ্যেও রঙের ব্যবহার রয়েছে। মূলত রংবাহী পতাকার মাধ্যমে প্রকাশিত হয়, কে কোন উগ্রবাদী সংগঠনের সদস্য। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও উগ্রবাদী সংগঠনগুলো আইনগতভাবে নিষিদ্ধ।

কিন্তু সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও গণমাধ্যমের খবর বলছে, রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ইসলামের ‘কালেমা শাহাদাত’খচিত সাদা পতাকা একদল মানুষ রাস্তার পাশে টাঙানো শুরু করেছেন। কোথাও কোথাও এই নিয়ে মিছিলও হয়েছে। এর আগেও এ ধরনের সাদা বা কালো পতাকা ওড়ানো আমরা দেখেছি।

গণমাধ্যমের খবর বলছে, ইসলামের কালেমাবাহী এসব পতাকা বিভিন্ন ‘ উগ্রবাদী’ সংগঠনের পতাকার আদলে করা। দিনদুপুরে প্রকাশ্যে এসব পতাকা নিয়ে শোডাউন হচ্ছে।

.সহিংস উগ্রবাদের নতুন ঝুঁকিতে বাংলাদেশ, সামনে দুই লড়াই.

প্রশ্ন হলো, কালেমা শাহাদাত লেখা পতাকা থাকলেই কি সেটি উগ্রবাদী সংগঠনের পতাকা হতে পারে? যদি উগ্রবাদী সংগঠনের পতাকা হয়ে থাকে, তাহলে এ ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ‘নীরব’ কেন?

এসব প্রশ্নের উত্তর জানতে হলে আগে জানতে হবে উগ্রবাদী সংগঠনগুলোর পতাকা কী? কেন তারা পতাকাকে সংগঠনের প্রচার কাজে ব্যবহার করে?

‘দ্য গ্লোবাল ইমাম কাউন্সিল’ (জিআইসি) থেকে প্রকাশিত ‘সিম্বলস অব টেরর’ নামের বইতে উগ্রবাদী সংগঠনগুলোর পতাকা ও লোগো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। সেই বইটি কানাডার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ‘জনসাধারণের’ সচেতনতার জন্য রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহার করে।

এই বইয়ে কোন কোন উগ্রবাদী সংগঠন কী ধরনের পতাকা ও লোগো ব্যবহার করছে, তা নিয়ে বিশদ আলোচনা করা হয়েছে। সাদা, কালো, হলুদ, কমলা রঙের ওপর মূলত ‘কালেমা শাহাদাত’ ব্যবহার করে বহু উগ্রবাদী সংগঠন। ক্যালিগ্রাফির ধরনভেদে একই রঙের পতাকায় আবার উগ্রবাদী সংগঠনগুলোর নামের ভিন্নতা রয়েছে।

.বাংলাদেশে যেভাবে জনপরিসর দখলের রাজনীতি হচ্ছে.

যেমন ২০০৪ সালে উগ্রবাদী সংগঠন আল-কায়েদা থেকে জন্ম ইসলামিক স্টেট ইন ইরাক আল সাম (আইএসআইএস) সংগঠনটির কালো পতাকার ওপর সাদা রঙে আরবি ভাষায় কালেমা শাহাদাত আর মাঝখানে সাদা বৃত্তের ভেতর মুহাম্মদ (সা.) লেখা হয়েছে। পতাকাটি আইএসের বিভিন্ন আঞ্চলিক সংগঠন ব্যবহার করে থাকে। যেমন নাইজেরিয়ার বোকো হারাম, ফিলিপাইনের আবু সায়াফ গ্রুপ (এএসজি), আলজেরিয়ার আল-কায়েদা ইন ইসলামিক মাগরিবসহ (একিউআইএম) বিভিন্ন দেশের উগ্রবাদীরা ব্যবহার করে থাকে।

একই পতাকার সাদা ভার্সনটি (সাদা ব্যাকগ্রাউন্ডে কালো বর্ণ) তেহেরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি) সংগঠনের সদস্যরা ব্যবহার করে থাকেন। এ ছাড়াও সংগঠনটি আল-কায়েদার অনুকরণে করা সাদা পতাকাটিতে অতিরিক্ত ‘তলোয়ার’ চিহ্ন রাখে।

অন্যদিকে ১৯৮৮ সালে প্রতিষ্ঠিত পাকিস্তানভিত্তিক আল-কায়েদার পতাকার রং কালো। কালো পতাকার ওপর সাদা রঙে কালেমা শাহাদাত ‘স্ট্যান্ডার্ড ক্যালিগ্রাফি’-তে লেখা হয়ে থাকে। হিযবুত তাহ্‌রীর নামে আরেকটি নিষিদ্ধ সংগঠন এই পতাকা ব্যবহার করে, পাশাপাশি তারা কমলা রঙের পতাকাও ব্যবহার করে।

অন্যদিকে নব্বইয়ের দশকে প্রতিষ্ঠিত আফগানিস্তানভিত্তিক সংগঠন তালেবানের পতাকাটি আল-কায়েদার পতাকার আদলে করা। তবে তাদেরটি সাদা রঙের পতাকার ওপর কালো রং লেখা হয় কালিমা শাহাদাত।

.
হোলি আর্টিজান ঘটনার ১০ বছর হলো ১ জুলাই। দেশি-বিদেশিদের জিম্মি করে এই নৃশংসতম হত্যাকাণ্ডের ঘটনার বর্ষপূর্তির প্রাক্কালে উগ্রবাদী সংগঠনের আদলে পতাকা ওড়ানোর এমন ঘটনা নিঃসন্দেহে দেশের নিরাপত্তাব্যবস্থাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। বহির্বিশ্বে ভিন্ন বার্তা দেবে, দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য বা বিনিয়োগের ওপর যার প্রভাব পড়তে পারে।
.

সাদা, কালো ছাড়াও অন্যান্য রং যেমন সবুজ রঙের পতাকায় কালেমা শাহাদাতখচিত লেখায় সোমালিয়ার আল শাবাব, পাকিস্তানের লস্কর-ই-জংভির পতাকার রং ব্যবহার করে। সমান্তরাল চারটি স্ট্রিপের মধ্যে দুই পাশে কালো ও মাঝখানে দুটি সবুজ রেখার মধ্যে আরবি হরফে জিহাদ লেখা পতাকা ব্যবহার করে হরকাতুল মুজাহিদীন।

ইসলামের কালেমা শাহাদাতকে ব্যবহার করে বিভিন্ন স্টাইলে সাদা, কালো পতাকার এই ব্যবহার উগ্রবাদী সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরে করে আসছে। ফলে নিষিদ্ধ থাকা এসব সংগঠনের এ ধরনের পতাকা প্রকাশ্যে এলেই বিভিন্ন দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলো তৎপর হয়ে ওঠে।

কিন্তু সম্প্রতি বিশ্বকাপ ফুটবলের সমর্থকদের ওড়ানো বিভিন্ন দেশের পতাকা টাঙানোকে কৌশল ধরে কালেমা শাহাদাতের সাদা-কালো পতাকার প্রকাশ্যে তৎপরতা ভাবিয়ে তোলার মতো একটি বিষয়। ধর্মপ্রাণ মানুষ আরবি হরফের লেখা কোনো কাগজ রাস্তা দেখলে তুলে এনে যত্নসহকারে বাসায় রাখেন, সেখানে ইসলামের অন্যতম ভিত্তির আরবি লেখা পতাকাকে সাধারণ হিসেবে দেখবেন। কিন্তু যাঁরা আইনশৃঙ্খলার কাজে জড়িত, তাঁরা নিশ্চয় জানেন এসব পতাকা কারা ছড়ায়, কেন ছড়ায় বা তাদের উদ্দেশ্য কী।

হোলি আর্টিজান ঘটনার ১০ বছর হলো ১ জুলাই। দেশি-বিদেশিদের জিম্মি করে এই নৃশংসতম হত্যাকাণ্ডের ঘটনার বর্ষপূর্তির প্রাক্কালে উগ্রবাদী সংগঠনের আদলে পতাকা ওড়ানোর এমন ঘটনা নিঃসন্দেহে দেশের নিরাপত্তাব্যবস্থাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। বহির্বিশ্বে ভিন্ন বার্তা দেবে, দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য বা বিনিয়োগের ওপর যার প্রভাব পড়তে পারে।

.সমাজে ধর্মীয় বিতর্কের রূপান্তর ও মীমাংসা–অমীমাংসার সীমানা.

অন্তর্বর্তী সরকারের সময় আমরা রাজধানী ঢাকায় নিষিদ্ধ সংগঠনগুলোর শোডাউন দেখেছি। দেশি-বিদেশি পত্রিকায় খবর বের হওয়ার পর সরকার তাঁদের অনেককে গ্রেপ্তার করে। পবিত্র বায়তুল মোকাররমের সামনে নিষিদ্ধ একটি সংগঠনের কর্মসূচি প্রতিহত করতে গিয়ে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষও তৈরি হয়। এর বাইরে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো জোরালো ভূমিকা দেখা যায়নি।

মনে রাখতে হবে, ধর্মের অন্তরালে ‘উগ্রবাদিতা’ আমাদের এই অঞ্চলের বড় সমস্যা। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশে উগ্রবাদীরা আবারও শক্তিশালী হয়ে উঠেছে, তার প্রমাণ সম্প্রতি মুক্তকণ্ঠের একটি ভিডিও প্রতিবেদনে তুলে আনা হয়েছে।

অতীতে বিভিন্ন সরকারের আমলে উগ্রবাদীদের নানা তৎপরতা লক্ষ্য করা গেছে। এখন তারা নতুন করে মাথাচাড়া দেওয়ার উদ্যোগ নিচ্ছে বলেই মনে হচ্ছে। অন্তর্বর্তী দুর্বল সরকারের শাসনব্যবস্থায় না হয় উগ্রবাদী সংগঠনগুলো পুষ্টবান হয়েছে, কিন্তু একটি নির্বাচিত সরকারের কাছে নিশ্চয় তারা প্রশ্রয় পাবে না। সরকারের উচিত হবে, দ্রুত এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়া, গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়ানো। আমরা চাই না বাংলাদেশকে বহির্বিশ্বের মানুষ উগ্রবাদীদের আশ্রয়স্থল হিসেবে চিনুক, বিনিয়োগ বন্ধ হয়ে অর্থনীতির বড় ক্ষতি হোক।

সাদা কালো পতাকামিছিল নিয়ে সরকারের অবস্থা কী তা বোঝা যাচ্ছে না। কোনো অঘটন ঘটার আগে, সরকারকে সতর্ক হতে হবে, কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

  • ড. নাদিম মাহমুদ গবেষক, ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়

    ই-মেইল: [email protected]

    মতামত লেখকের নিজস্ব