বিভিন্ন স্থানে সমর্থকদের ঝটিকা মিছিল, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণা, টেলিভিশন টক শোতে আলোচনা—এই সবকিছুর মধ্যেই যে প্রশ্নটি ঘুরে–ফিরে আসছে, তা হলো কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগ কি আবার বাংলাদেশের রাজনীতিতে ফিরতে পারবে? এই লেখায় সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছেন মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন শিকদার
.২০২৫ সালের ২৪ মে মুক্তকণ্ঠতে ‘ক্ষমতাচ্যুত স্বৈরাচারের ফিরে আসার আশঙ্কা কতটা’ শিরোনামে একটি কলাম লিখেছিলাম। তখন জাপানের ওসাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক মাসানরি কুবোতা, কাওরু হিদাকা ও টাকু ইউকাওয়ার ‘দ্য পোস্ট-এক্সাইল ফেট অব লিডার্স: আ নিউ ডেটাসেট’ গবেষণার আলোকে দেখানোর চেষ্টা করেছিলাম, ১৯৭০ থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে নির্বাসিত হওয়া ৯১ জন স্বৈরশাসকের মধ্যে দেশে ফিরে আবার রাষ্ট্রপ্রধান হতে পেরেছেন মাত্র ১৯ শতাংশ। আর যাঁরা দেশে ফিরেছেন, তাঁদের নির্বাসনের গড় সময় ছিল ৬ দশমিক ৬ বছর।
এক বছর পর বাংলাদেশে সেই আলোচনাই আবার সামনে এসেছে। তবে এবার বিষয়টি শুধু একজন ব্যক্তিকে নিয়ে নয়; বরং আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎকে ঘিরে। বিভিন্ন স্থানে দলটির সমর্থকদের ঝটিকা মিছিল, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন প্রচারণা, টেলিভিশন টক শোতে আলোচনা—এই সবকিছুর মধ্যেই একই প্রশ্ন ঘুরে–ফিরে আসছে। কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগ কি আবার বাংলাদেশের রাজনীতিতে ফিরতে পারবে?
.হাসিনার পতনে ‘বিদেশি হাত’ তত্ত্ব ও দিল্লির ভূমিকা.তুলনামূলক রাজনৈতিক গবেষণা একটি বিষয় পরিষ্কারভাবে দেখায়—ক্ষমতাচ্যুত কোনো দল নিজের শক্তিতে যতটা না ফিরে আসে, তার চেয়ে বেশি সুযোগ পায় পরবর্তী সরকারগুলোর দুর্বলতার কারণে।
২০২৪ সালের গণ–অভ্যুত্থানের পর অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেয়। তখন মানুষের প্রত্যাশা ছিল অনেক। সবাই চেয়েছিল দ্রুত আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হবে, প্রশাসন স্বাভাবিকভাবে কাজ করবে, অর্থনীতি স্থিতিশীল হবে এবং দীর্ঘ রাজনৈতিক সংকটের অবসান ঘটবে।
কিন্তু বাস্তবতা ছিল অনেক বেশি কঠিন। নানা যৌক্তিক–অযৌক্তিক ইস্যুতে আন্দোলন, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে হামলা ও ভাঙচুর, মব সহিংসতা, প্রশাসনিক দুর্বলতা, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ—সব মিলিয়ে মানুষের একাংশের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়। তখনই কারও কারও মুখে শোনা যেতে থাকে, ‘আগেই তো ভালো ছিলাম।’
সাম্প্রতিক তুলনামূলক রাজনৈতিক গবেষণায় এই প্রবণতাকে বলা হয় ‘পলিটিক্যাল নস্টালজিয়া’। অর্থাৎ নতুন সরকার মানুষের প্রত্যাশা পূরণ করতে না পারলে অনেকেই অতীতের সরকারকে বর্তমানের চেয়ে ভালো মনে করতে শুরু করেন। কিন্তু এখানেই কেউ কেউ একটি বড় ভুল করেন। অনেকে মনে করেন, মানুষ যদি এই কথাটি বলতে শুরু করে, তাহলে বুঝি আওয়ামী লীগের ফিরে আসা শুধু সময়ের ব্যাপার। কিন্তু গবেষণার ফলাফল ভিন্ন ইঙ্গিত দেয়।
.শেখ হাসিনার পতন ও ইতিহাসের শিক্ষা.কানাডার রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জেমস লক্সটন ও স্কট মেইনওয়ারিং তাঁদের লাইফ আফটার ডিক্টেটরশিপ: অথরিটেরিয়ান সাকসেসর পার্টিজ ওয়ার্ল্ডওয়াইড’ বইয়ে দেখিয়েছেন, নতুন সরকারের ব্যর্থতা ক্ষমতাচ্যুত শাসক দলের জন্য একটি সুযোগ তৈরি করতে পারে। কিন্তু সেটি কখনোই প্রত্যাবর্তনের নিশ্চয়তা দেয় না।
বাংলাদেশে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় যদি মানুষের একাংশ হতাশ হয়ে থাকে, সেটি রাজনৈতিক বাস্তবতার একটি অংশ। কিন্তু সেই হতাশা কি স্বয়ংক্রিয়ভাবে আওয়ামী লীগের প্রতি সমর্থনে পরিণত হবে?
.কারও কারও ধারণা, শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে আওয়ামী লীগও আবার শক্তিশালী হবে। আবার অনেকে মনে করেন, শেখ হাসিনা ছাড়া আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ নেই। কিন্তু আন্তর্জাতিক গবেষণা বলছে, বিষয়টি এত সহজ নয়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জেমস লক্সটন ও স্কট মেইনওয়ারিং–এর মতে, শুধু একজন নেতার ওপর ভর করে কোনো দল দীর্ঘদিন টিকে থাকতে পারে না। জনগণের আস্থা ফিরে পেতে হলে অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিতে হয়, নতুন বার্তা দিতে হয় এবং মানুষকে বিশ্বাস করাতে হয় যে দলটি সত্যিই পরিবর্তিত হয়েছে।
তবে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি। ইউরোপ, আফ্রিকা বা লাতিন আমেরিকার অভিজ্ঞতা হুবহু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে, এমনটি ভাবা ঠিক নয়। কারণ, দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতি অনেকটাই ব্যক্তি, পরিবার ও আবেগনির্ভর। ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশের মতো দেশগুলোতে রাজনৈতিক পরিবারগুলো দীর্ঘদিন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। তাই শুধু পশ্চিমা রাজনৈতিক তত্ত্ব দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতি পুরোপুরি ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়।
.এটাও সত্য, শুধু পারিবারিক পরিচয় বা একজন জনপ্রিয় নেতাকে ঘিরে কোনো রাজনৈতিক দল দীর্ঘদিন টিকে থাকতে পারে না। ভারতে জাতীয় কংগ্রেস তার বড় উদাহরণ। শুধু নেহরু–গান্ধী পরিবারের উত্তরাধিকার ধরে রেখে দলটি আগের অবস্থানে ফিরতে পারেনি।
অন্যদিকে ফিলিপাইনে মার্কোস পরিবারের প্রত্যাবর্তনও শুধু পারিবারিক পরিচয়ের কারণে হয়নি। সংগঠন পুনর্গঠন, নতুন রাজনৈতিক কৌশল গ্রহণ এবং জনগণের আস্থা ফিরে পাওয়ার চেষ্টাও সেখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
রাজনীতিবিজ্ঞানের গবেষণাও একই কথা বলে। বিল্ডিং ডেমোক্রেটিক ইনস্টিটিউশনস: পার্টি সিস্টেমস ইন লাতিন আমেরিকা বইয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী স্কট মেইনওয়ারিং ও টিমোথি আর স্কালি দেখিয়েছেন, একটি রাজনৈতিক দলের দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য শুধু একজন নেতার জনপ্রিয়তার ওপর নয়, বরং দলটি কতটা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শক্তিশালী (ইনস্টিটিউশনালাইজড), তার ওপর বেশি নির্ভর করে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও প্রশ্নটি শুধু শেখ হাসিনাকে ঘিরে নয়। আসল প্রশ্ন হলো, আওয়ামী লীগ কি নতুন বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারবে? অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে নতুন নেতৃত্ব গড়ে তুলতে পারবে? নাকি শুধু অতীতের জনপ্রিয়তার স্মৃতির ওপরই নির্ভর করবে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই দলের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।
.শেখ হাসিনা স্বৈরশাসকদের টিকে থাকার দুটি মূলমন্ত্রেই ব্যর্থ.আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করতে গেলে আরেকটি প্রশ্ন সামনে আসে। সেটি হলো, বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় আওয়ামী লীগ কি কোনো একসময় তাদের বর্তমান প্রতিপক্ষদের কারও সঙ্গে সমঝোতায় যেতে পারে? প্রশ্নটি শুনতে অনেকের কাছে অবাস্তব মনে হতে পারে। কিন্তু রাজনৈতিক ইতিহাস অনেক সময় এমন সব ঘটনা দেখিয়েছে, যা একসময় অকল্পনীয় বলে মনে হয়েছিল।
বাংলাদেশের রাজনীতিই তার বড় উদাহরণ। স্বাধীনতার পর জাসদ ও আওয়ামী লীগের সম্পর্ক ছিল তীব্র সংঘাতপূর্ণ। ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহের আলোচনায় জাসদের ভূমিকা নিয়ে আজও বিতর্ক রয়েছে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে সেই জাসদের একটি অংশই আওয়ামী লীগের সঙ্গে রাজনৈতিক সমঝোতা করে, আন্দোলন করে, এমনকি সরকারেও অংশ নেয়।
আবার ১৯৯০-এর দশকে এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় আওয়ামী লীগ ও জামায়াতে ইসলামী বিভিন্ন ইস্যুতে একই রাজনৈতিক লক্ষ্য সামনে রেখে আন্দোলন করেছে। পরে ১৯৯৬ সালের নির্বাচনকে ঘিরেও রাজনৈতিক সমঝোতার বাস্তবতা তৈরি হয়েছিল। অর্থাৎ বাংলাদেশের ইতিহাস নিজেই দেখায়, রাজনীতিতে স্থায়ী বন্ধু বা স্থায়ী শত্রুর ধারণা সব সময় বাস্তবতার সঙ্গে মেলে না।
.দেশ–বিদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস থেকে দেখা গেছে, কোথাও কোথাও দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক শত্রুরাও সময়ের প্রয়োজনেই একসঙ্গে কাজ করেছে। তাই আওয়ামী লীগের সঙ্গে জামায়াত, এনসিপি বা বিএনপির এই ধরনের সমঝোতার সম্ভাবনাকে অসম্ভব বলে উড়িয়ে দেওয়া যাবে না, আবার এটাকে অবশ্যম্ভাবী বলাও সঠিক হবে না।.
আন্তর্জাতিক রাজনীতির গবেষণাও একই কথা বলে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী উইলিয়াম রাইকার তাঁর দ্য থিওরি অব পলিটিক্যাল কোয়ালিশনস এবং রাষ্ট্রবিজ্ঞানী কেয়ারে স্ট্রম অ্যা বিহেভিয়ারাল থিওরি অব কম্পিটিটিভ পলিটিক্যাল পার্টিজ বইয়ে দেখিয়েছেন, রাজনৈতিক দলগুলো শুধু আদর্শগত মিলের ভিত্তিতেই জোট গঠন করে না, অনেক সময় ভবিষ্যৎ ক্ষমতার সমীকরণ, নির্বাচন, সংসদীয় রাজনীতি এবং কৌশলগত প্রয়োজনও জোট গঠনের বড় কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
এই তাত্ত্বিক আলোচনার আলোকে প্রশ্ন উঠতেই পারে, আওয়ামী লীগের সঙ্গে কি কখনো জামায়াতে ইসলামী কিংবা এনসিপির (জাতীয় নাগরিক পার্টি) কোনো ধরনের রাজনৈতিক সমঝোতা হতে পারে? অথবা বিএনপির সঙ্গে? এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়া এখন সম্ভব নয়। কারণ, এখানে শুধু দলীয় নেতৃত্বের সিদ্ধান্তই গুরুত্বপূর্ণ নয়; আরও গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে তৃণমূলের রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা।
আওয়ামী লীগের জন্য ২০২৪ সালের গণ–অভ্যুত্থান শুধু একটি রাজনৈতিক পরাজয় নয়; এটি দলটির হাজার হাজার নেতা–কর্মীর জন্য গভীর মানসিক অভিঘাতও। আওয়ামী লীগের বহু নেতা–কর্মী দেশ ছেড়েছেন, আত্মগোপনে গেছেন, মামলা-মোকদ্দমার মুখোমুখি হয়েছেন কিংবা সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন। এই অভিজ্ঞতা অনেকের কাছে শুধু রাজনৈতিক নয়, ব্যক্তিগতও। ফলে ভবিষ্যতে যদি আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্ব কৌশলগত কারণে কোনো নতুন রাজনৈতিক সমঝোতার কথা ভাবেও, প্রশ্ন থাকবে, দলের তৃণমূল কর্মীরা সেটি কতটা সহজভাবে গ্রহণ করবেন?
.আওয়ামী লীগের দ্রুত পুনরুত্থান কেন অসম্ভব মনে হচ্ছে.একই প্রশ্ন অন্য দলগুলোর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। এনসিপি যদি নিজেদের রাজনৈতিক পরিচয় গড়ে তোলে ২০২৪ সালের গণ–অভ্যুত্থানের উত্তরাধিকারকে কেন্দ্র করে, তাহলে সেই দলের নেতা–কর্মীরা কি আওয়ামী লীগের সঙ্গে সমঝোতা মেনে নিতে পারবেন? জামায়াতে ইসলামী দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগের সবচেয়ে কঠোর রাজনৈতিক সমালোচক; তাদের নেতা–কর্মীরাও কি এমন সমঝোতা সহজভাবে মেনে নেবেন? বিএনপির সঙ্গে আওয়ামী লীগের সমঝোর ক্ষেত্রেও একই ধরনের প্রশ্ন উঠবে। এই প্রশ্নগুলোর উত্তর এখনই জানার কোনো উপায় নেই।
দেশ–বিদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস থেকে দেখা গেছে, কোথাও কোথাও দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক শত্রুরাও সময়ের প্রয়োজনেই একসঙ্গে কাজ করেছে। তাই আওয়ামী লীগের সঙ্গে জামায়াত, এনসিপি বা বিএনপির এই ধরনের সমঝোতার সম্ভাবনাকে অসম্ভব বলে উড়িয়ে দেওয়া যাবে না, আবার এটাকে অবশ্যম্ভাবী বলাও সঠিক হবে না।
.এখন প্রশ্ন হচ্ছে, আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ সবচেয়ে বেশি নির্ভর করছে কার ওপর? অনেকে হয়তো বলবেন, আওয়ামী লীগের ওপর। কিন্তু আন্তর্জাতিক গবেষণা বলছে, উত্তরটি পুরোপুরি ঠিক নয়। মার্কিন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী মরিস ফিওরিনা তাঁর রেট্রোস্পেকটিভ ভোটিং ইন আমেরিকান ন্যাশনাল ইলেকশনস বইয়ে দেখিয়েছেন, মানুষ শেষ পর্যন্ত অতীত সরকারকে নয়, ক্ষমতায় থাকা বর্তমান সরকারকেই বিচার করে।
বাংলাদেশের বাস্তবতাও ভিন্ন নয়। বিএনপি সরকার যদি মনে করে, দেশের সব সমস্যার জন্য শুধু আওয়ামী লীগ ও অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়ী, তাহলে হয়তো কিছুদিন সেই কথা জনগণ মেনে নেবে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে মানুষ বর্তমান সরকারের শাসন, অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, দুর্নীতি দমন ও গণতান্ত্রিক আচার–আচরণ—এ রকম বিষয়গুলো দিয়েই তাদের মূল্যায়ন করবে। এখানেই কোনো না কোনোভাবে আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তনের সবচেয়ে বড় সূত্রটি লুকিয়ে আছে।
.আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, আওয়ামী লীগকে কীভাবে মোকাবিলা করা হবে? এ ক্ষেত্রে একটি বিষয় আমাদের মনে রাখা উচিত, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের দায়িত্ব কোনো দলকে টিকিয়ে রাখা বা নিশ্চিহ্ন করা নয়; বরং আইনের শাসন নিশ্চিত করা। অপরাধের বিচার আদালত করবে, আর রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার রায় দেবে জনগণ। আওয়ামী লীগ আমলে হওয়া বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গুম বা অন্য অপরাধগুলোর বিচার অবশ্যই হতে হবে। অপরাধের বিচার ও রাজনৈতিক প্রতিযোগিতাকে এক করে ফেললে শেষ পর্যন্ত গণতন্ত্রই ঝুঁকিতে পড়বে।
কাজেই আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মসূচি শুধু প্রশাসনিক শক্তি দিয়ে দমন করা দীর্ঘ মেয়াদে উল্টো ফলও দিতে পারে। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা বলছে, কোনো দলকে রাজনৈতিক পরিসর থেকে সরিয়ে দিলে তারা নিজেদের ‘নির্যাতিত’ হিসেবে তুলে ধরে সহানুভূতি অর্জনের সুযোগ পেতে চেষ্টা করে।
.সবশেষে আবার মূল প্রশ্নটিতে ফিরে আসা যাক। আওয়ামী লীগ কি বাংলাদেশের রাজনীতিতে আবার ফিরতে পারবে? এর উত্তর এখন কারও কাছে নেই। তবে ইতিহাস দেখায়, কোনো দল শুধু নিজের শক্তিতে টিকে থাকে না, আবার শুধু প্রতিপক্ষের দুর্বলতায়ও ক্ষমতায় ফেরে না। জনগণের সমর্থন, পরিবর্তনের সক্ষমতা, সুশাসনের প্রতিশ্রুতি ও গণতান্ত্রিক প্রতিযোগিতাই শেষ পর্যন্ত দলের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে।
মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন শিকদার শিক্ষক ও গবেষক, রাষ্ট্র ও সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়
মতামত লেখকের নিজস্ব






