গত ২৪ জুন ভেনেজুয়েলায় পরপর দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে। এ ঘটনায় হাজারো মানুষের মৃত্যু হয়। ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়েন অনেকে। তেমনই একজন আটকে পড়া বাবাকে ধ্বংসস্তূপ থেকে উদ্ধারের জন্য এক ব্যক্তির মরিয়া লড়াইয়ের গল্প এটি।

.

ভেনেজুয়েলার হোসে গার্সিয়া গত ২৪ জুন সন্ধ্যায় তাঁর স্ত্রী ও ছোট দুই ছেলেকে নিয়ে বাড়িতে ছিলেন। হোসে ও তাঁর পরিবার লা গুয়াইরার সমুদ্রতীরবর্তী উপশহর কারাবালেদা উপকূলের দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে থাকা ১১তলা ভবন রিতাসোল প্যালেসের দ্বিতীয় তলায় একটি অ্যাপার্টমেন্টে থাকতেন। ভেনেজুয়েলায় ২৪ জুন আঘাত হানা জোড়া ভূমিকম্পে ভবনটি ধসে পড়ে।

স্থানীয় সময় সন্ধ্যা প্রায় ৬টা ৪ মিনিটে উপকূলে ৭ দশমিক ২ মাত্রার একটি শক্তিশালী ভূমিকম্প অনুভূত হয়। এর কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই আরও বেশি শক্তিশালী আরেকটি ভূমিকম্প আঘাত হানে। মুহূর্তেই পুরো ভবনটি ধসে পড়ে। হোসে গার্সিয়া বুঝতে পারেন, তিনি আর দ্বিতীয় তলায় নেই। বরং যে ভবনটিতে তিনি থাকতেন, সেটির বেজমেন্টে ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছেন। পাশে আটকা পড়েছিল তাঁর দুই ছেলে—৭ বছর বয়সী দিয়েগো এবং ১২ বছর বয়সী সান্তিয়াগো।

৪৬ বছর বয়সী গাড়ির মেকানিক হোসে বলেন, ‘এভাবে ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়ার চেয়ে ভয়াবহ অভিজ্ঞতা আর কিছু হতে পারে না।’

.

তবে অপ্রত্যাশিতভাবে এক উদ্ধারকারী এসে তাঁদের বেঁচে থাকার আশা জাগিয়ে তোলেন। সেই মানুষটিই তাঁদের জীবিত উদ্ধার করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

চোখে জল নিয়ে হোসে বলেন, ‘সে মানুষটি এখানেই আছে, সে আমার বড় ছেলে।’ পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ২৬ বছর বয়সী জেসুস গার্সিয়ার দিকে ইঙ্গিত করে তিনি আরও বলেন, ‘ও-ই ছিল আমাকে উদ্ধার করা বীরদের একজন।’

পেশিবহুল গড়নের জেসুস গার্সিয়ার চোখে ছিল সানগ্লাস, মুখে ছাঁটা দাড়ি। তিনি লা গুয়াইরায় ফায়ার সার্ভিস বিভাগের একজন কর্মী ছিলেন। ভূমিকম্পের আগেই তিনি সেই চাকরি ছেড়ে দিয়েছিলেন।

জেসুসের সাবেক এক সহকর্মী এবং পরিবারের ঘনিষ্ঠ বন্ধু পরে প্রয়োজন হতে পারে ভেবে তাঁর (জেসুস) ফায়ার সার্ভিসের কর্মীর হেলমেট ও জ্যাকেটটি যত্ন করে রেখে দিয়েছিলেন। ভূমিকম্পের রাতে সেই হেলমেট ও জ্যাকেটই উদ্ধারকাজে তাঁর সবচেয়ে বড় সহায়ক হয়ে ওঠে।

জেসুস যখন ধসে পড়া অ্যাপার্টমেন্ট ভবনের ধ্বংসস্তূপের দিকে ছুটে যান, তখনো তিনি জানতেন না, তাঁর পরিবারের কেউ বেঁচে আছেন কি না। তখন কোনো কিছুই নিশ্চিত ছিল না।

.ভেনেজুয়েলায় ভূমিকম্পের ৮ দিন পর ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে একজনকে জীবিত উদ্ধার.

ভেনেজুয়েলায় গতকাল রোববার পর্যন্ত পাওয়া সরকারি হিসাব অনুযায়ী, দেশটিতে ভূমিকম্পে নিহত মানুষের সংখ্যা ৩ হাজার ৩৪২–এ পৌঁছেছে। তবে ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনো বহু মরদেহ চাপা পড়ে থাকায় এই সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

জেসুস সেদিনের কথা স্মরণ করে বলেন, একসময় যেখানে রিতাসোল প্যালেস নামের ভবনটি দাঁড়িয়ে ছিল, সেটি ভূমিকম্পে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। সেই ধ্বংসস্তূপে পৌঁছে তিনি প্রথমেই তাঁর সেই ফায়ার সার্ভিস কর্মী বন্ধু ও সাবেক সহকর্মীকে দেখতে পান।

জেসুস আল–জাজিরাকে বলেন, ‘আমি পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গেই আমার বন্ধু আমাকে বলল, “বন্ধু, তোমার বাবা বেঁচে আছেন। তিনি নিচে দুই ছেলেকে নিয়ে জীবিত আছেন।”’

প্রথমে জেসুসের বিশ্বাসই হচ্ছিল না। কিন্তু কিছুক্ষণ পর ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে বাবার কণ্ঠ শুনতে পান। তিনি চিৎকার করে বলছিলেন, ‘আমাকে এখানে ফেলে যেয়ো না।’

জেসুস স্মৃতিচারণা করে বলেন, ‘আমি তাঁকে বললাম, আমার ওপর ভরসা রাখুন। শান্ত থাকুন। বাচ্চাদেরও শান্ত রাখুন। আপনাদের উদ্ধার না করে আমি এখান থেকে কোথাও যাচ্ছি না।’

.

ততক্ষণে হোসে গার্সিয়া ধ্বংসস্তূপের নিচে এক ঘণ্টারও বেশি সময় পার করে ফেলেছেন। নিজের ভাগ্যে কী ঘটতে যাচ্ছে, সে সম্পর্কে তাঁর কোনো ধারণা ছিল না।

হোসে বলেন, ‘প্রথমেই আমার মাথায় আমার সন্তানদের কথা এসেছিল। ছোট ছেলেটাকে আমি এভাবেই বুকের কাছে ধরে রেখেছিলাম।’ এ কথা বলতে বলতে তিনি দুই হাত নিজের বুকের ওপর তুলে ধরেন। তিনি বলতে থাকেন, ‘আমার আরেক ছেলেও আমার পাশেই ছিল। কিন্তু সে ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে ছিল। আমি তার মুখ দেখতে পাচ্ছিলাম না, শুধু একটি পা আর একটি হাত দেখতে পাচ্ছিলাম।’

তবু দুই ছেলের সামনে সাহস হারাননি হোসে। ঠিক তখনই ধ্বংসস্তূপের ওপার থেকে একটি পরিচিত কণ্ঠ ভেসে আসে। সেটি ছিল জেসুসের সেই ফায়ার সার্ভিস কর্মী বন্ধুর কণ্ঠ। তিনি জীবিত কাউকে খুঁজে পাওয়ার আশায় বারবার ডাক দিচ্ছিলেন। একই সঙ্গে তিনি ঘটনাস্থলে জেসুসের পুরোনো হেলমেট ও জ্যাকেটও নিয়ে এসেছিলেন।

বাবা ও দুই ছোট ভাই যে জীবিত আছেন, তা নিশ্চিত হওয়ার পর জেসুস মরিয়া হয়ে তাঁদের উদ্ধারের চেষ্টা শুরু করেন। কিন্তু খুব দ্রুতই তিনি বুঝতে পারেন, রাতের অন্ধকারে কিছুই করা সম্ভব নয়। তাঁকে পরদিন সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। সবচেয়ে জরুরি ছিল একটি জ্যাকহ্যামার সংগ্রহ করা, যেন ধ্বংসস্তূপের কংক্রিট ভেঙে পরিবারের কাছে পৌঁছানো যায়।

পরদিন সকালে পুলিশের একটি বিশেষায়িত উদ্ধারকারী দল প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম নিয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছায়।

লা গুয়াইরার ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরাও তাঁদের সাবেক সহকর্মী জেসুসের পাশে দাঁড়াতে ছুটে আসেন। তাঁদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ২৫ জুন বেলা সাড়ে ৩টার দিকে (ভূমিকম্পের ২০ ঘণ্টারও বেশি সময় পর) জেসুস তাঁর বাবা এবং ছোট দুই ভাইকে ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে জীবিত উদ্ধার করতে সক্ষম হন।

উদ্ধারের পরই জেসুস ছোট দুই ভাই দিয়েগো ও সান্তিয়াগোকে বুকে জড়িয়ে নেন।

জেসুস স্মৃতিচারণা করে বলেন, ‘ওদের যখন দেখলাম, তখন জড়িয়ে ধরলাম, চুমু খেলাম এবং বললাম, “ভাই, আমি তোমাকে ভালোবাসি।” তারপর একটু দূরে সরে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়লাম।’

.

হোসে এখনো সেই বিভীষিকাময় অভিজ্ঞতার ধাক্কা কাটিয়ে উঠতে পারেননি। তাঁর ভাষায়, এ ঘটনা তাঁর জীবন চিরদিনের জন্য বদলে দিয়েছে।

হোসে আরও বলেন, ‘জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত আমি কৃতজ্ঞ থাকব যে আমাকে আরেকটি জীবন পাওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। শুধু আমি নই, আমার দুই ছোট সন্তানও বেঁচে গেছে।’

অলৌকিকভাবে বাবা ও দুই ছেলেকে উদ্ধার করা গেলেও হোসের স্ত্রী এখনো ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়ে আছেন। ভূমিকম্পের ১১ দিন পেরিয়ে গেলেও হোসে এখনো বিশ্বাস করেন, তাঁকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব।

হোসে বলেন, ‘আমার বিশ্বাস আছে। আমার যেমন বিশ্বাস ছিল যে আমি আমার সন্তানদের নিয়ে ধ্বংসস্তূপ থেকে বের হতে পারব, কেউ এসে আমাদের উদ্ধার করবে, তেমনি এখনো আমি আশা হারাইনি।’

ভেনেজুয়েলার দুই দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে সবচেয়ে প্রাণঘাতী এই জোড়া ভূমিকম্পে যাঁদের জীবন ওলট–পালট হয়ে গেছে, হোসে গার্সিয়া তাঁদেরই একজন।

ভেনেজুয়েলা সরকারের তথ্য অনুযায়ী, ভূমিকম্পে অন্তত ৮৫৬টি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং ১৯০টি ভবন সম্পূর্ণ ধসে পড়েছে। তবে স্যাটেলাইট চিত্রের ভিত্তিতে করা কিছু স্বাধীন বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এর চেয়েও অনেক বেশি হতে পারে।

.

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই দুর্যোগের ব্যাপকতা ভেনেজুয়েলার জন্য নজিরবিহীন। হাজার হাজার মানুষ এখন নিজেদের বাড়িতে ফিরতে পারছেন না।

এখন ধসে পড়া রিতাসোল প্যালেস ভবনের ধ্বংসস্তূপের পাশেই দিনের বেশির ভাগ সময় কাটান হোসে গার্সিয়া। সেখানে তিনি উদ্ধারকারী দলগুলোর মরদেহ উদ্ধারের কাজ নীরবে দেখেন। একই সঙ্গে ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা দুশ্চিন্তা তাঁকে তাড়িয়ে বেড়ায়।

হোসে বলেন, ‘আমাদের আবার শূন্য থেকে শুরু করতে হবে। কিন্তু এর মূল্য কত হবে, জীবনে এর প্রভাব কতটা গভীর হবে, সেটা আমরা জানি না। আমরা কিছুই জানি না।’