জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ (এখন কার্যক্রম নিষিদ্ধ) ও দলটির সভাপতি শেখ হাসিনা ব্যাপক নৃশংসতা চালালেও তাঁদের কোনো অনুশোচনাই নেই বলে মন্তব্য করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। ক্ষমতাসীন বিএনপির স্থায়ী কমিটির এই সদস্য বলেছেন, ‘আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক পতন হয়েছে, আওয়ামী লীগের রাজনৈতিকভাবে নিপাত হয়েছে, নির্মূল হয়েছে, দাফন হয়ে গেছে দিল্লিতে। সেই আওয়ামী লীগ বাংলাদেশে আর কোনো দিন রাজনীতি করতে পারবে না।’

আজ শনিবার দুপুরে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শহীদদের স্মরণে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে ‘জুলাই জাতীয় সম্মেলনে’ অংশ নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এ কথা বলেন। জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি উপলক্ষে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে জুলাই ’২৪ শহীদ পরিবার সোসাইটি ও আমরা জুলাই যোদ্ধা।

২০২৪ সালে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের নৃশংসতার কথা উল্লেখ করে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘এ রকম একটি নৃশংস হত্যাকাণ্ড ও গণহত্যার পরে আজ পর্যন্ত সেই গণহত্যাকারী শেখ হাসিনার কোনো রকমের অনুশোচনা নেই। তারা জুলাই যোদ্ধাদের অপরাধী হিসেবে তকমা দিচ্ছে, বাংলাদেশের এই গণ-অভ্যুত্থানকে তারা জঙ্গি তকমা দিচ্ছে। বাংলাদেশে নাকি জঙ্গিবাদের মধ্য দিয়ে তাদের রাষ্ট্রক্ষমতা ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে! এর চেয়ে লজ্জাকর আর কিছু নেই। তাদের মধ্যে অনুশোচনাও নেই, দোষ স্বীকারের ইতিহাসই তাদের নেই। তারা উল্টো বিদেশে বসে বাংলাদেশে এখন নাকি গণতান্ত্রিক সরকারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন রকম ষড়যন্ত্র করছে! আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক পতন হয়েছে, আওয়ামী লীগের রাজনৈতিকভাবে নিপাত হয়েছে, নির্মূল হয়েছে, দাফন হয়ে গেছে দিল্লিতে। সেই আওয়ামী লীগ বাংলাদেশে আর কোনো দিন রাজনীতি করতে পারবে না।’

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিচার দাবি করেছি আমরা, অন্যরাও দাবি করেছেন। তদন্ত হচ্ছে। ইনশা আল্লাহ, খুব শিগগির রাজনৈতিক দল হিসেবে তাদের বিচারের কাঠগড়ায় নিয়ে যাওয়া হবে। সংবিধানের ৪৭ অনুচ্ছেদ অনুসারে আইন সংশোধন করা হয়েছে, সন্ত্রাসবিরোধী আইন ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনে আছে—রাজনৈতিক দলের, সংগঠনের বিচার করা যাবে।’

মানবতাবিরোধী অপরাধের এক মামলায় জাসদের সভাপতি হাসানুল হক ইনুর বিরুদ্ধে সম্প্রতি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায় প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘সর্বশেষ হাসানুল হক ইনু নামের একজন স্বৈরাচারের দোসরের বিচারের রায় বেরিয়েছে। তাঁকে কেবল ১০ বছরের সাজা দেওয়ায় বাদীপক্ষ সন্তুষ্ট নয়। সেটা আপিল করা হবে বলে শুনেছি। তাঁর যাতে সর্বোচ্চ সাজা হয়, সে রকম মামলা আরও আছে। সেই মামলাগুলোতে আশা করা যায় সেই বিচারকার্য করা হবে।’

পর্দার আড়ালের কিছু কথা অবমুক্ত করতে চান উল্লেখ করে সালাহউদ্দিন বলেন, ‘আমি, আমার নেতা জনাব তারেক রহমান—দুজনই নির্বাসিত ছিলাম। আল্লাহর কী মহিমা, যদি আমরা নির্বাসিত না থাকতাম, হয়তো এই জুলাইয়ের মতো একটা অভ্যুত্থান সফলভাবে সমাপ্ত করা সম্ভব হতো না। এটাই হচ্ছে পর্দার অন্তরালের কথা। কোনো দিন আমরা ঘুমাইনি, ২৪টা ঘণ্টা কো-অর্ডিনেশন (সমন্বয়) করে আমাদের নেতা-কর্মীদের বিভিন্নভাবে সংগঠিত করে জুলাই যোদ্ধাদের সম্মুখে রেখে অরাজনৈতিক পরিচয়ে আন্দোলনের একটা পর্যায় পর্যন্ত আমরা নিয়ে এসেছি। ৩, ৪ তারিখ যখন আমরা নৈতিক সমর্থন দিই, তার পর থেকে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের একটা আন্দোলনে সমর্থন দিয়ে যেদিন আমরা ১৬ জুলাই পর্যন্ত পৌঁছালাম, সেদিন আমার নেতা বলেছেন, ‘‘দফা এক দাবি এক, স্বৈরাচারের পদত্যাগ; অন্য কোনোভাবেই সমস্যার সমাধান হবে না’’।’

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আজকে যাঁরা জুলাই যোদ্ধাদের নেতৃত্ব দাবি করেন, তাঁদের অনেকেই সেদিন বলেছিলেন, ‘‘আমাদের কোনো রাজনৈতিক দাবি নেই, আমাদের দাবি কোটাবৈষম্য দূর করতে হবে।’’ কিন্তু আমরা জানি স্বৈরাচারকে গদিতে রেখে বৈষম্যহীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করা যাবে না। তাঁদের আমরা বোঝাতে সক্ষম হয়েছি, কিন্তু তাদের সেই সাহস ছিল না। আমরা রাজনৈতিকভাবে সারা বাংলাদেশের মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে শত-সহস্র শহীদের রক্তের স্রোতের মধ্য দিয়ে আজকে এই জায়গায় এসেছি। সেখানে রাজনৈতিক পরিচয়ে যদি বিভাজন করা হয়, তাহলে সর্ববৃহৎ অংশটি থাকবে ছাত্রদল, যুবদল, বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মী।’

২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য পাস হওয়া ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা খাতসহ জনকল্যাণমুখী বিভিন্ন উদ্যোগের কথা উল্লেখ করে সম্মেলনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সেই বিষয়গুলো বাস্তবায়ন করতে চাইলে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে, সহযোগিতা করতে হবে। শুধু চাই, চাই করা যাবে না। আমাদের পরিকল্পনা আছে, কিন্তু সেই আর্থিক সামর্থ্য অর্জন করার জন্য সময় দিতে হবে। সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য নেতৃত্বের হাতকে শক্তিশালী করতে হবে।

জুলাই জাতীয় সম্মেলনের আয়োজক দুই সংগঠনের উদ্দেশে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘জুলাইয়ের চেতনা নিয়ে যেন আমরা কেউ ব্যবসা না করি। যারা জুলাইয়ের চেতনা নিয়ে বিভিন্নভাবে রাজনৈতিক সংগঠন করে, রাজনৈতিক খাতে ফায়দা নেওয়ার জন্য চেতনা বিক্রি করছে, তাদের পরিণতি কিন্তু ভবিষ্যতে দেখা যাবে। ইতিহাস কিন্তু তা-ই। যারা একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিক্রি করত, তারা চেতনা বিক্রি করতে করতে আজকে দিল্লি গিয়ে বসে আছে, বাংলাদেশের মানুষ তাদের উৎখাত করেছে। সুতরাং চেতনা বিক্রির ব্যবসা ভালো নয়, রাজনৈতিক ফায়দা নেওয়ার উদ্দেশ্য ভালো নয়। আমরা এই মহান জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ইতিহাস ও স্মৃতিকে ধারণ করব।’