চাকরিবাকরি করি বলে সময়মতো লম্বা ছুটি পাওয়াটা কঠিন। তাই এবারের রোজার লম্বা ছুটির সঙ্গে আরও ছুটি নিয়ে রওনা দিলাম মার্কিন মুলুকে। গন্তব্য নিউইয়র্ক। টিকিট কাটা সেই জানুয়ারিতে। কিন্তু মার্চের যে সময়টাতে আমরা যাচ্ছিলাম, সে সময় হঠাৎ করেই মার্কিনদের মারামারি করার খায়েস হলো, মাঝখান দিয়ে আরবের সব বড় বড় বিমানওয়ালারা সব ফ্লাইট বাতিল করে দিল, আমাদের এখন কী হবে?

প্রতিদিন আমার কাছে কাতার এয়ারের ফ্লাইট বাতিলের খুদে বার্তা পাচ্ছিলাম, আমাদের এ নিরাশার মাঝে ফ্লাইটের ঠিক দুই দিন আগে বার্তা পেলাম যে দুনিয়ার বিভিন্ন জায়গা থেকে এসে দোহায় আটকে পড়া বাংলাদেশি যাত্রীদের নিয়ে একটা রিলিফ ফ্লাইট আসবে ঢাকায়, তা–ও ভিন্ন সময়ে, আমরা সেটার ফিরতি ফ্লাইটে যেতে চাইলে যেতে পারি। আমরা জানপ্রাণের মায়া ত্যাগ করে রাজি হয়ে গেলাম, আমাদের বাসায় তো তখন মাতম শুরু হয়ে গেছে, তাদের ধারণা ইরানের মিসাইল এবার আর মিস হবে না। আল্লাহ আল্লাহ করতে করতে বিমানে উঠে পড়লাম। দেরি করে নতুন সময় ধার্য করে ছাড়া আমাদের ফ্লাইটটা দুনিয়ার পথ ঘুরে ট্যুরে দোহায় নামল, আমরা অনেক চেষ্টা করেও মিসাইল–টিসাইল দেখতে পেলাম না।

.

দোহায় অল্প যাত্রাবিরতি দিয়ে আমাদের বিমান লম্বা পথ পাড়ি দিয়ে সেদিনই রাতের দিকে নিউইয়র্কে নামল। টার্মিনালে নেমে খুব অবাক লাগল, অল্প যাত্রী, অভিবাসন কর্মকর্তাদের সময়ক্ষেপণ শেষে যখন বাক্সপেটরা নিতে এলাম ক্যারোসলে, দেখি আমরা মাত্র দুজন আর কাতার এয়ারের চিন্তিত এক কর্মী ব্যাগ ধরে দাঁড়িয়ে আছে আমাদের অপেক্ষায়।

বিমানবন্দরের বাইরে বেরিয়ে দেখি অল্প কিছু ট্যাক্সি, তারা আবার বিমানবন্দর লাগোয়া বাঙালিপাড়া জ্যামাইকা হিলসে যেতে চায় না। টার্মিনালের ভেতর উবারে দেখাচ্ছিল ২০ ডলার, টার্মিনালের বাইরেটা নেটহীন। উবার অ্যাপস কাজ না করাতে বাঙালি ভাইয়ের ট্যাক্সিতে ৪০ ডলারের দণ্ডি ভাড়ায় অল্পস্বল্প সময়ে হাজির হলাম বন্ধুর বাসায়। ভাগ্য ভালো এত্ত রাতেও বন্ধু সজাগ ছিল। সজুরু/////////////////// হলো আড্ডা গল্পের আসর। সারা রাত ধরে আড্ডা গল্পে রাত পার।

.

আজ নিউইয়র্কে ঈদ। আমি ঘুম থেকে উঠে গোসল সেরে তৈরি বাংলাদেশিদের আয়োজিত ঈদ জামাতে যেতে। কিসের কী? আমার বন্ধু আর আমার সহ–ভ্রমক দেখি নাক ডাকিয়ে ঘুমে বিভোর। অপেক্ষা করতে করতে বেলা ১১টা, ঈদের জামাত মিস। এদের আয়েশি ঘুম শেষে আমরা ঈদের দাওয়াত খেতে বের হলাম দুপুরে, জ্যামাইকা হিলস থেকে এস্টোরিয়া। বন্ধু তার বিশালকায় দামি গাড়ি হাঁকিয়ে হাজির হলো তার আত্মীয়ের বাসায়। খাবারের সে কী বিপুল আয়োজন। আমরা বেশি খাব না ধরনের ভদ্রতার কথা শুনিয়ে গোগ্রাসে প্রায় অনেক খেয়ে ফেললাম। নিউইয়র্ক আসার পথে লাউঞ্জে আর বিমানে এত্ত খেয়ে খেয়েও পেটে যে এত ক্ষুধা ছিল, তা বুঝিনি।

খাওয়াদাওয়া শেষে আমরা গেলাম জ্যাকসন হাইটসের বাঙালি এলাকায় মুঠোফোনের সিম কিনতে। আমার পুরোনা মুঠোফোনে মার্কিন ই সিম কাজ না করাতে নতুন মুঠোফোন কিনতে হলো, টাকার শ্রাদ্ধ আর কাকে বলে। সেটার সঙ্গে নিলাম নতুন মার্কিন সিম। এটাতে ছিল বিপুল ডেটা, এটা কিন্তু সত্যি সত্যি আমাদের পুরোটা সময়ের মার্কিন ঘোরাঘুরি নিরাপদ করেছিল।

.
আমরা বেশি খাব না ধরনের ভদ্রতার কথা শুনিয়ে গোগ্রাসে প্রায় অনেক খেয়ে ফেললাম। নিউইয়র্ক আসার পথে লাউঞ্জে আর বিমানে এত্ত খেয়ে খেয়েও পেটে যে এত ক্ষুধা ছিল, তা বুঝিনি।
.

নতুন মুঠোফোন সেটে বলিয়ান হয়ে আমরা নেমে পড়লাম জ্যাকসন হাইটসের নোংরা পাতাল মেট্রোরেল, যাকে নিউইয়র্কে সবাই বলে সাবওয়ে। মেট্রোরেল আমাদের নিয়ে এল ওয়ান ওয়ার্ল্ড সেন্টারের অতীব আধুনিক সুন্দর ‘ওকুলাস’ স্টেশনে। কী বিশাল আর অসাধারণ স্থাপত্য। সাদা ধবধবে তার বেশভূষা। সেখানে গাদা গাদা ছবি তুলে আমরা যেই না বেরিয়ে এলাম, সামনে দেখি বিশাল উঁচু নতুন ওয়ান ওয়ার্ল্ড সেন্টার। এখানেই ছিল পুরোনো ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার টুইন টাওয়ার। সেটার ধ্বংসাবশেষের একটার ওপর ওয়ান ওয়ার্ল্ড সেন্টার আর আরেকটার জায়গায় এক স্মৃতি সৌধস্থল। সৌধের বিশাল এক চার কোনাকার কালো গহব্বরের মাঝে হারিয়ে যাচ্ছে বিপুল জলরাশি। চার কোণের দেয়ালের ওপর ৯/১১ এ দুর্ঘটনায় মারা যাওয়া সবার নাম লেখা। সেখানে দু–একটা বাঙালির নামও পেলাম।

এসব দেখা শেষে আমরা গেলাম টাইমস স্কয়ার। এটা একটা লম্বা রাস্তা, এটার চারদিকের ভবনগুলোতে কারওয়ান বাজারের বড় বিলবোর্ডের মতো অনেকগুলো বিলবোর্ড চারদিকে আলোর ঝলকানি ছড়িয়ে যাচ্ছে। এত্ত লোক, যেন ঈদের জামাত!

.

আমরা এত্ত ভিড় দেখে বেশ ভড়কে গেলাম, যে–ই না সন্ধ্যা নামল, আর লোকের আনাগোনা বেড়ে গেল আর দুনিয়ার লোকেরা মার্কিন জাংকফুড আর M&M চকলেটের দোকানে ভিড় করতে লাগল। হাঁটাচলা মুশকিল। আমাদের অবস্থা কাহিল হওয়ার আগেই সেখান থেকে আমরা পালিয়ে মেট্রোতে চড়ে হাজির হলাম ব্রুকলিন ব্রিজের নিচে DUMBO নামের সাজানো গোছানো নতুন জায়গায়। নদী বা খাড়ির পাড় সুন্দর করে বাঁধানো। হাতিরঝিল ধরনের। সাবওয়ের মেট্রো করে সেখানে গিয়ে দেখি দেশি ভাই–ভাবিরা শাড়ি–শালোয়ার পরে ঈদের ঘোরাঘুরি করতে হাজির। এটা যেন ঢাকা শিশুপার্ক। তাদের ছবি তোলার ভাবভঙ্গি দেখে স্থানীয় মার্কিনদের মতো আমিও ভেগে একটু নির্জন প্রোমেনেডে হাজির হলাম। ওপারে বড় বড় সব ভবনের সারি, ব্রুকলিন সেতু দিয়ে ভীষণ গর্জন করে একটু পরপর মেট্রো আসা–যাওয়া দেখতে দেখতে সন্ধ্যা হয়ে গেল। এর ফাঁকে আমরাও ছবিটবি তুলতে তুলতে আবার নামল বৃষ্টি। বৃষ্টি থেকে বাঁচতে হাজির হলাম গোডাউন থেকে ফুডকোর্ট হওয়া এক খাবার ঘরে। নাম তার টাইম আউট মার্কেট। দুনিয়ার লোক সেখানে হাজির। দামও আকাশছোঁয়া। ক্ষুধার জ্বালায় আমরা না চাইলেও কিছু-মিছু খেয়ে বিদায় নিলাম। এরপর মেট্রোরেলে করে এসে হাজির জ্যামাইকা। সেখানে বাঙালি দোকানে রাতের খাবার খেয়ে জিপিএস ঘেঁটে বন্ধুর জামাইকা হিলসের বাসায় হাজির হলাম। ততক্ষণে বেশ রাত। প্রথম দিনের ঘোরাঘুরি এভাবেই হলো শেষ।

.

দ্বিতীয় দিন বেশ সকালে উঠে এসো নিজে বানাই ধরনের হালকা নাশতা সেরে তাড়াতাড়ি নিউইয়র্ক দেখতে বের হলাম। গন্তব্য স্টেটেন আইল্যান্ডের বান্ধবীর বাসা। সেখানে আজকের ঈদের দাওয়াত। সকালের নাশতা। পাতাল উড়াল মেট্রো করে হাজির হলাম হোয়াইট হল নামের এক ফেরিঘাটে। সেখানে বিনা ভাড়ার ফেরিতে করে আমরা হাজির হলাম স্টেটেন আইল্যান্ডে। যাওয়ার সময় এক বিচিত্র ব্যাপার হলো, এ ফেরি থেকে স্ট্যাচু অব লিবার্টি দেখা যায়, ফেরিটা এটার পাশ দিয়ে যায়, বেশ মজার না?

ফেরি টার্মিনালে আমার বান্ধবী হাজির। তার সঙ্গে দেখা ২৫–৩০ বছর পর। সে তার গাড়ি চালিয়ে বাসায় নিয়ে যে খাতিরযত্ন করল, তা ভাষায় বোঝানো যাবে না। এত্ত রকমের খাবারদাবার, গতকালের মতো বা বেশিও হতে পারে।

আমরা বেশি খাব না খাব না বলেও নাশতা করতে এসে দুপুরের খাবারটাও খেয়ে নিলাম নির্লজ্জভাবে। এরপর বান্ধবীর বর আর তাদের বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া মেয়েকে বিদায় জানিয়ে বান্ধবীর গাড়িতে করে ঘুরে ঘুরে দেখলাম দ্বীপটা। এত্ত সুন্দর সব মনোরম বাড়ি, গডফাদার সিরিজের কার্লিওনির বাড়িটাও এখানে, সেটাও দেখে নিলাম এক ফাঁকে। ঘুরতে ঘুরতে হাজির হলাম এক বালুতটে। এপাশের নদীতট থেকে ওপাশের কোনি আইল্যান্ড আর পাশের বিশাল সব ভবনের সারি দেখতে পাচ্ছিলাম।

.
দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: dp@prothomalo.com
.

দুপুর গড়াতেই বান্ধবীকে বিদায় জানিয়ে আমরা ফেরিতে করে আবারও মূল ভূখণ্ডে এলাম।

আমরা মেট্রোতে হাজির হলাম হাডসন ইয়ার্ডে। হাডসন ইয়ার্ড এখন বেশ চটকদার জায়গা। আগে যেখানে পুরোনো সব গোডাউন বা গুদামঘর ছিল, সেগুলো বার, রেস্তোরাঁ আর মনোলোভা সব বিনোদনকেন্দ্র বানানো হয়েছে, নিউইয়র্কাররা সেখানে ঘুরতে, খেতে আর মানুষ দেখতে আর নিজেদেরকে মানুষকে দেখাতে যায়। আর যে উড়ালপথে মেট্রো ছিল, সেটার খানিকটা ওয়াকওয়ে করেছে আর সেখানে নানান অদ্ভুত সব ভাস্কর্য বানিয়ে সাজিয়ে রেখেছে। এটার নাম ‘দ্য হাই লাইন’।

.

আমরা সাবওয়ে থেকে বের হয়েই দেখি আজব এক বাড়ি ‘দ্য ভেসেল’। এটা নাকি ছিল আত্মহত্যা করার ভালো জায়গা, তাই সেটা অনেক দিন বন্ধ থাকার পর নিরাপদ বানিয়ে আবারও খুলেছে, আমরা সেটার সামনে বেশ অনেক ছবি তুলে ‘দ্য হাই লাইন’ ওয়াকওয়ে দিয়ে হেঁটে হেঁটে নানান কিসিমের লোক দেখতে দেখতে নদীটার ওপর স্থাপিত ‘লিটল আইল্যান্ড’ নামের কংক্রিট কাঠামোর ওপর তৈরি পার্কে হাজির। হাতিরঝিল পার্কে যেমন একটা পানির ওপর একটা অ্যাম্ফিথিয়েটার বানানো হয়েছে, সে রকম কিন্তু বেশ বড়সড় আর গাছগাছালিওয়ালা। একপাশে যেখানে অ্যাম্ফিথিয়েটার আছে, সেখানে গিয়ে আমরা বসলাম। মাত্রই সন্ধ্যা নেমেছে, নিউইয়র্কের আকাশে দ্বিতীয়ার চাঁদ, হালকা বসন্তের বাতাস, ঈদ বলে অনেকগুলো উপমহাদেশের পরিবার এখানে এসে আড্ডা গেড়েছে। তাদের বাংলা, উর্দু আর হিন্দি ভাষার গুঞ্জনে আমরাও হালকা চাঁদের আলোতে বিমোহিত হলাম। নদীর ওপারে ঝকঝকে সব সুউচ্চ সব ভবন। আমি শহরের যেকোনো ফাঁকা যেখান থেকেই দেখি, খালি সুউচ্চ ভবন। ভীষণ অবস্থা।

এত্ত সুন্দর লাগছিল সবকিছু। জীবনের মানে কী? এ ধরনের দার্শনিক কথাবার্তা মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল।

এসব চিন্তা বাড়তে না দিয়ে সে রাতের জন্য বন্ধুর বাসায় ফিরতে হলো সাবওয়েতে।

আগামীকাল আমাদের নিউইয়র্কে শেষ দিন। আরও অনেক কিছু বাকি, গ্র্যান্ড সেন্ট্রাল, সেন্ট্রাল পার্ক, ৫ম এভিনিউ, মেট্রোপলিটান বা দ্য মেট জাদুঘর আরও কত কী?

কীভাবে এত্ত সব দেখব শেষ দিন? চলবে...