মানুষের জীবনে এমন কিছু সত্য আছে, যা যতবারই ভাবা হোক, ততবারই নতুনভাবে উপলব্ধি হয়। আদেশ বদলানো যায়, সিদ্ধান্ত পাল্টানো যায়, এমনকি পথও ঘুরে নেওয়া যায়। কিন্তু মুখ থেকে বেরিয়ে যাওয়া শব্দ আর কখনো ফিরে আসে না। শব্দের এই অদ্ভুত দায়, এই অদৃশ্য বন্ধন, কখনো কখনো আমাদের এমন এক যাত্রায় নিয়ে যায়, যার জন্য আমরা আগে থেকে প্রস্তুত থাকি না। তবু সেই যাত্রাই হয়ে ওঠে জীবনের সবচেয়ে গভীর ও স্পর্শকাতর অভিজ্ঞতা।

সেদিনও তেমনই হয়েছিল। খুব সাধারণভাবে মেয়েদের বলেছিলাম,Ñ‘চলো, এই ঈদের ছুটিতে কোথাও ঘুরে আসি।’ কথাটা বলা যত সহজ, তার পরিণতি ততটাই বিস্তৃত হয়ে উঠল। যেন শব্দগুলো বাতাসে ভেসে গিয়ে এক অদৃশ্য বন্ধন তৈরি করল, আর আমি নিজেই তাতে আটকে গেলাম। কিন্তু সেই আটকে পড়া কোনো বাধা ছিল না;Ñবরং এক মুক্তির সূচনা ছিল।

.

বীরশ্রেষ্ঠ মোহাম্মদ রুহুল আমিন, শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক, মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী, কবীর চৌধুরী, শহীদ মুনীর চৌধুরী, আতাউর রহমানসহ অনেক গুণীজনের জন্ম নোয়াখালী জেলায়। তাই আমাদের গন্তব্য ছিল বৃহত্তর নোয়াখালী অঞ্চল। ১৯৮৪ সালে প্রশাসনিক সুবিধার জন্য এই এলাকা ভেঙে নোয়াখালী, ফেনী ও লক্ষ্মীপুর—এই তিনটিকে আলাদা জেলায় রূপান্তর করা হয়। নোয়াখালীর প্রাচীন নাম ভুলুয়া। বর্তমানে বাংলাদেশের সবচেয়ে ধনী জেলা হিসেবে স্বীকৃত এই নোয়াখালী; যার নিজের নামে কোনো শহর নেই। এখানে দর্শনীয় স্থানের মধ্যে রয়েছে বীরশ্রেষ্ঠ মোহাম্মদ রুহুল আমিন গ্রন্থাগার ও স্মৃতি জাদুঘর, কল্যান্দি জমিদারবাড়ি, সোনাইমুড়ীর মহাত্মা গান্ধী আশ্রম ও মহাত্মা গান্ধী জাদুঘর, মাইজদী কোর্ট বিল্ডিং দিঘি, রাম ঠাকুর সমাধি মন্দির চৌমুহনী, নিঝুম দ্বীপ, স্বর্ণ দ্বীপ, বজরা শাহী মসজিদ, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়সহ আরও অনেক কিছু।

আমরা নোয়াখালীর বাস ধরতে চট্টগ্রামের অলংকার মোড়ে যাই। বাঙালির কিছু কিছু ক্ষেত্রে অপরিবর্তিত রূপ থেকে যায়—ঈদ এলে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করা। নোয়াখালীর চৌমুহনী যাওয়ার জন্য বাস ‘বাঁধনে’ উঠে বসলাম।

.

চৈত্রের শুরুতে শীতের জীর্ণতা ঝরিয়ে গাছে গাছে নতুন পাতা। মৃদু বাতাসে আমের মুকুলের সুবাসে প্রকৃতি প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছে। যখন চট্টগ্রাম মহাসড়ক ধরে এগোতে শুরু করলাম, তখন মনে হচ্ছিল যেন প্রকৃতি নিজেই এক বিশাল মঞ্চ সাজিয়ে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে। রাস্তার মাঝখানে সারি সারি কৃষ্ণচূড়া, রাধাচূড়া ও শিমুল। তাদের আগুনরাঙা ফুলগুলো যেন আকাশের নীল ক্যানভাসে আঁকা এক অপূর্ব চিত্র। সেই রঙের সঙ্গে মিশে আছে কচি সবুজ পাতার কোমলতা।Ñতারা যেন একসঙ্গে হাসছে, দুলছে, আর পথিককে আহ্বান জানাচ্ছে।

গাড়ির জানালা দিয়ে বাইরে তাকালে মনে হচ্ছিল, প্রতিটি দৃশ্য যেন জীবন্ত। গ্রামের ঘরগুলোয় মানুষের উপস্থিতি স্পষ্ট,Ñকোথাও ধোঁয়া উঠছে রান্নাঘর থেকে, কোথাও শিশুরা ক্রিকেট খেলছে, আবার কোথাও পুকুরপাড়ে বসে কেউ মাছ ধরার প্রস্তুতি নিচ্ছে। সেই পুকুরের জলে আকাশের প্রতিফলনÑনীল ও সোনালি মিশে এক অদ্ভুত মায়া তৈরি করেছে।

লেমুয়া সাইনবোর্ডের কাছে পৌঁছাতেই চোখে পড়ল ইটভাটার চুলা। আগামীকাল ঈদ, আগুন এখনো জ্বলছে—শ্রম ও জীবিকার এক অবিচল প্রতীক। ধোঁয়া ও আগুনের লাল আভা,Ñতার মধ্যেও জীবনের এক অদম্য চলার গল্প।

.
নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই–মেইল: [email protected]
.

কিন্তু এসব কোলাহলের মধ্যেও এক অদ্ভুত নীরবতা ছিল। উৎসবের আগের দিনগুলোয় গ্রামবাংলা যেমন ব্যস্ততায় ভরে ওঠে, তেমনি কখনো কখনো এক নিস্তব্ধতাও নেমে আসে। রাস্তার পাশে ছোট ছোট দোকানগুলো বন্ধ, সড়ক প্রায় ফাঁকা। মনে হচ্ছিল, প্রকৃতি নিজেই যেন এক ঘোমটা টেনে নিয়েছে নিঃশব্দ, গম্ভীর, কিন্তু গভীরভাবে সুন্দর।

নোয়াখালীর ভেতরের বাইপাস সড়কে ঢোকার পর যাত্রার অনুভূতি কিছুটা বদলে গেল। সরু রাস্তা, দুই পাশে ঘন বসতি।Ñএখানে চলাচল যেন আরও সতর্ক, আরও মনোযোগী। দুটি বাস পাশাপাশি যেতে কষ্ট হয়,Ñতবু এই সংকীর্ণতার মধ্যেই লুকিয়ে আছে এক আন্তরিকতা, এক ঘনিষ্ঠতা।

পথের এক পর্যায়ে আমরা পৌঁছালাম ফেনীতে। এই শহর যেন এক অপ্রকাশিত সৌন্দর্যের আধার। এখানে এমন অনেক জায়গা আছে, যা আগে থেকে পরিকল্পনা করে দেখলে ভ্রমণ হয়ে উঠতে পারে আরও সমৃদ্ধ। আমরা একটু থামলাম কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ফেনীর কাছে। জায়গাটি যেন এক ছোট্ট বিরতির আশ্রয়,Ñযেখানে শরীর যেমন বিশ্রাম পায়, মনও তেমনি একটু থেমে নিজের সঙ্গে কথা বলতে পারে।

.

তবে আমাদের মূল গন্তব্য ছিল আরও গভীরেÑএকটি আধ্যাত্মিক স্পর্শ খোঁজার উদ্দেশ্যে। বাস আমাদের নামিয়ে দেয় চৌমুহনী বাজারে। বাজার থেকে হেঁটে ১০ মিনিটের রাস্তা, প্রথমে যাই শ্রী রাম ঠাকুর সমাধি মন্দিরে।

এই স্থান শুধু একটি মন্দির নয়Ñএটি এক ইতিহাস, এক সাধনার প্রতীক। শ্রীশ্রী রাম ঠাকুর, যিনি কৈবল্যনাথ নামেও পরিচিত। তাঁর জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় কাটিয়েছেন এখানে। ১৯৪২ সালের মাঝামাঝি, আনুমানিক জুন–জুলাইয়ে ঠাকুর তাঁর এক ভক্ত উপেন্দ্রনাথ সাহাকে কিছুদিন নিরিবিলি থাকার অভিপ্রায় জানালে উপেন্দ্র বাবু চৌমুহনীতে তাঁদের একটি বাংলো খালি পড়ে আছে এবং শ্রীশ্রী ঠাকুর দয়া করলে সেখানে সত্বর বাসস্থানের ব্যবস্থা করা যেতে পারে এই সংবাদ শ্রী ঠাকুরকে দেন। ঠাকুরের সম্মতি সাপেক্ষে উপেন্দ্র বাবু তাঁর ভাই নরেন বাবুকে সত্বর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলেন এবং তিন থেকে চার দিনের মধ্যে বাসপোযোগী করে তোলায় উপেন্দ্র বাবু ঠাকুরকে নিয়ে সেই বাংলোবাড়িতে উপস্থিত হন। এই সময় থেকে প্রায় সাত বছর ঠাকুর ওই বাংলোতেই বাস করেছেন। নিরিবিলি ও কোলাহলমুক্ত পরিবেশে তিনি কাটিয়েছেন দীর্ঘ সময়Ñধ্যান, সাধনা ও আত্ম–অন্বেষণে। সেই বাংলোবাড়ি, সেই পরিবেশÑআজও যেন তাঁর উপস্থিতি অনুভব করায়।

.

মন্দিরের চারপাশে একধরনের প্রশান্তি বিরাজ করে। বাতাসে যেন এক অদৃশ্য শান্তির সুর। মনে হচ্ছিল, এখানে সময় একটু ধীরে চলে।Ñমানুষের ব্যস্ততা এখানে এসে থেমে যায়, আর মন ধীরে ধীরে নিজেকে খুঁজে পায়।

অহিংসা সর্বোত্তম গুণ, যা ভালোবাসা থেকে উৎসারিত হয়। অহিংসার মাধ্যমে সহিংসতা মোকাবিলা করুন। (মহাত্মা গান্ধী)। সেখান থেকে আমরা যাত্রা করলাম আরেকটি ঐতিহাসিক স্থানের দিকে—গান্ধী আশ্রম।

.

এই আশ্রম শুধু একটি স্থাপনা নয়,Ñএটি এক আদর্শ, এক দর্শনের প্রতীক। ১৯৪৬ সালের ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার পর যখন নোয়াখালীর মাটি রক্তে রঞ্জিত, তখন মহাত্মা গান্ধী এখানে এসে দাঁড়িয়েছিলেন শান্তির বার্তা নিয়ে। তাঁর পদযাত্রা ও প্রচেষ্টা—সবই ছিল মানুষকে একত্র ও বিভাজনের দেয়াল ভেঙে দেওয়ার জন্য।

গ্রেট ক্যালকাটা কিলিংসের রক্তক্ষয়ী ঘটনার পর নোয়াখালীতে ছড়িয়ে পড়া সাম্প্রদায়িক সহিংসতা থামাতে মহাত্মা গান্ধী ৬ নভেম্বর যাত্রা শুরু করেন এবং ৯ নভেম্বর থেকে আনুষ্ঠানিক পদযাত্রা আরম্ভ করেন। প্রায় চার মাস তিনি গ্রাম থেকে গ্রামে ঘুরে শান্তি ও সম্প্রীতির বার্তা ছড়িয়ে দেন।

.

১৯৪৭ সালের ২৯ জানুয়ারি, জয়াগ গ্রামে এসে মহাত্মা গান্ধী ‘অম্বিকা–কালীগঙ্গা দাতব্য ট্রাস্ট’ প্রতিষ্ঠা করেন, যা পরবর্তী সময় ১৯৭৫ সালে বাংলাদেশ সরকার ‘গান্ধী আশ্রম ট্রাস্ট’ নামে রূপান্তর করে। বর্তমানে এই প্রতিষ্ঠান গ্রামীণ উন্নয়ন, শিক্ষা ও কল্যাণমূলক কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

আশ্রমে রয়েছে একটি স্মৃতি জাদুঘর, যেখানে গান্ধীর ব্যবহৃত জিনিসপত্র, দুর্লভ আলোকচিত্র ও দলিল সংরক্ষিত আছে। যদিও ঈদের ছুটির কারণে আমরা সেটি দেখতে পারিনি, তবু আশ্রমের এক পরিচালক আমাদের আশপাশের স্থানগুলো ঘুরিয়ে দেখিয়েছেন এবং গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানিয়েছেন। জাদুঘরের ভেতরে ছবি তোলা নিষেধ,Ñতাই সেই মুহূর্তগুলো রয়ে গেছে শুধু স্মৃতির ভাঁজে।

জাদুঘরের পেছনে রয়েছে গান্ধী মেমোরিয়াল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও উচ্চবিদ্যালয়, সঙ্গে চরকায় কাটা সুতা দিয়ে তৈরি হস্তনির্মিত তাঁত বস্ত্রের প্রদর্শনী ও বিক্রয়কেন্দ্র, যা গান্ধীর স্বনির্ভরতার দর্শনের এক জীবন্ত প্রতিফলন। আমাদের পরের গন্তব্য নিঝুম দ্বীপ ও স্বর্ণ দ্বীপ।

এই ভ্রমণ শুধু পথ দেখা নয়,Ñএ ছিল ইতিহাস, প্রকৃতি ও অনুভূতির এক মিশ্র অভিজ্ঞতা। কিছু শব্দ যেমন ফেরানো যায় না, তেমনি কিছু স্মৃতি হৃদয়ে অমলিন থেকে যায়Ñচিরকাল।

এই ভ্রমণ আমাকে শুধু নতুন জায়গা দেখায়নি,Ñএটি আমাকে নতুনভাবে ভাবতে শিখিয়েছে। প্রকৃতির সৌন্দর্য, ইতিহাসের গভীরতা, মানুষের গল্প—সবকিছু মিলিয়ে এটি হয়ে উঠেছে এক পূর্ণাঙ্গ অভিজ্ঞতা।

শেষ পর্যন্ত মনে হয়েছে,Ñআমরা আসলে পথ খুঁজি না, পথই আমাদের খুঁজে নেয়।

ঠিকানা:

অরূপ পালিত

অমর ইন্টারন্যাশনাল

লুনা চেম্বার (তৃতীয় তলা)

গোসাইলডাঙ্গা, আগ্রাবাদ, চট্টগ্রাম।