মিয়ানমারের নতুন সরকার একটি বিতর্কিত বাঁধের কাজ আগামী প্রায় আট বছরের মধ্যে শেষ করতে চায়। ৩৬০ কোটি ডলারের এই মিতসোন বাঁধ প্রকল্পটি দেশটির উত্তরাঞ্চলীয় কাচিন রাজ্যে অবস্থিত। এ প্রকল্প নিয়ে রাজ্যের প্রশাসনপ্রধান খেত তেইন নানের বক্তব্য সম্পর্কে জানে—এমন দুটি সূত্র এ তথ্য জানিয়েছে।
গত মাসে চীন সফর থেকে ফেরেন মিয়ানমারের জান্তাপ্রধান থেকে প্রেসিডেন্ট হওয়া মিন অং হ্লাইং। তাঁর এ সফরের পরই এমন মন্তব্য সামনে এল। যুদ্ধবিধ্বস্ত মিয়ানমারের একেবারে উত্তরের এই প্রদেশে চীন দীর্ঘকাল ধরেই এই বিশাল জলবিদ্যুৎ প্রকল্পটি নির্মাণ করতে চাইছে।
মিতসোন বাঁধটি হতে পারত মিয়ানমারের সবচেয়ে বড় জলবিদ্যুৎ প্রকল্প। কিন্তু মানুষের ব্যাপক ক্ষোভের কারণে ২০১১ সালে এর নির্মাণকাজ স্থগিত করা হয়েছিল। কাচিন রাজ্যের পার্লামেন্ট সদস্য হতেত পাইং হতু রয়টার্সকে এ প্রকল্পের বিষয়ে বলেছেন, ‘খুব শিগগির এর কাজ শুরু হবে।’
.হতেত পাইং হতু আরও বলেন, ‘এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দেওয়া হবে। প্রেসিডেন্ট নিজেও ইতিমধ্যে জানিয়েছেন যে এর কাজ আবার শুরু হবে।’
কাজ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় চীন ক্ষুব্ধ হয়েছিল। এ প্রকল্প থেকে উৎপাদিত ৬ গিগাওয়াট বিদ্যুতের ৯০ শতাংশই প্রতিবেশী চীনে রপ্তানির পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু মিয়ানমারে চীনের অতিরিক্ত প্রভাব নিয়ে মানুষের ক্ষোভ ছিল; পাশাপাশি সিঙ্গাপুরের সমান বিশাল একটি এলাকা পানিতে তলিয়ে যাওয়ার পরিবেশগত ঝুঁকিও ছিল। শেষ পর্যন্ত এই উদ্বেগগুলোর কাছে বিদ্যুৎ রপ্তানির পরিকল্পনা টিকতে পারেনি।
বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষমতার দিক থেকে মিতসোন বাঁধ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম বড় জলবিদ্যুৎ প্রকল্প হিসেবে জায়গা করে নেবে। তবে চীনের থ্রি গর্জেস ড্যামের তুলনায় এটি অনেক ছোট। থ্রি গর্জেস ড্যামের বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ২২ দশমিক ৫ গিগাওয়াট।
মিন অং হ্লাইংয়ের চীন সফরের সময় প্রকল্পটি পুনরায় শুরু করার বিষয়টি আলোচনায় আসে। প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ের একজন মুখপাত্র সাংবাদিকদের এ কথা জানান। ওই মুখপাত্র বলেন, বিদ্যুতের প্রচণ্ড ঘাটতিতে থাকা একটি দেশের জন্য প্রয়োজনীয়—১০ গিগাওয়াটের অর্ধেকেরও বেশি—বিদ্যুৎ এ প্রজেক্ট থেকে পাওয়া সম্ভব।
.মুখপাত্র খাইং খাইং সোয়ে বলেন, বন্যা এবং স্থানীয় মানুষের বাস্তুচ্যুত হওয়ার বিষয়ে স্থানীয় জনগণের যে উদ্বেগ রয়েছে, সরকার তা বিবেচনা করে দেখছে।
গত মঙ্গলবার খাইং খাইং সোয়ে বলেন, ‘আমরা এসব বিষয় নিয়ে বিস্তারিত বিশ্লেষণ করছি। এর নেতিবাচক প্রভাবের তুলনায় সুবিধা কতটা বেশি, তা মূল্যায়ন করে আমরা একটি ভারসাম্য আনার চেষ্টা করছি।’
এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে খেত তেইন নানের কার্যালয় এবং চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তারা তাৎক্ষণিকভাবে কোনো সাড়া দেয়নি।
খেত তেইন নানের নেতৃত্বে হওয়া ওই আলোচনাগুলো গোপন ছিল। তাই তথ্য প্রদানকারী ওই দুই সূত্র নিজেদের নাম প্রকাশ করতে চায়নি।
প্রকল্পে খরচ হতে পারে তিন গুণের বেশি
মিতসোন বাঁধের কাজ নতুন করে শুরু করতে ১ হাজার ১৫০ কোটি ডলার (১১.৫ বিলিয়ন) খরচ হতে পারে। এটি ২০০৯ সালের আনুমানিক খরচের তুলনায় তিন গুণের বেশি। আন্তর্জাতিক নবায়নযোগ্য জ্বালানি সংস্থার (আইআরইএনএ) সাম্প্রতিক হিসাব অনুযায়ী, চীন ও ভারত ছাড়া এশিয়ার অন্যান্য দেশের জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোয় প্রতি কিলোওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনে গড়ে ১ হাজার ৯১৪ ডলার খরচ হয়। সেই হিসাব থেকেই নতুন এ ব্যয়ের ধারণা পাওয়া গেছে।
.মিন অং হ্লাইংয়ের সরকার প্রকল্পটি পুনরায় চালু করার জন্য কাজ করছে। কাচিন রাজ্যের ওই আইনপ্রণেতাসহ তিন কর্মকর্তা এ কথা জানিয়েছেন। ব্যাপকভাবে সমালোচিত এক নির্বাচনে সামরিক বাহিনী–সমর্থিত একটি রাজনৈতিক দল জয়ী হওয়ার পর গত এপ্রিলে এই সরকার ক্ষমতায় আসে।
২০২১ সালে মিন অং হ্লাইংয়ের নেতৃত্বে সামরিক বাহিনী একটি অভ্যুত্থান ঘটায়। তারা নোবেলজয়ী অং সান সু চির নির্বাচিত সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করে, এর কারণে দেশটিতে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। এ অবস্থার (গৃহযুদ্ধ) মধ্যেই বাঁধটি পুনরায় চালুর এ উদ্যোগ নেওয়া হলো। অং সান সু চিও এই মিতসোন বাঁধের বিরোধিতা করেছিলেন।
কাচিন রাজ্যের রাজধানী মিতকিনা শহরটি বাঁধ এলাকা থেকে প্রায় ৩৭ কিলোমিটার (২৩ মাইল) দূরে অবস্থিত। সেখানে রাজ্যের নেতা খেত তেইন নান এ প্রকল্প এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে সরকারের ইচ্ছার কথা জোর দিয়ে বলেছেন। আলোচনার বিষয়ে অবগত ওই দুই সূত্র এ তথ্য জানিয়েছে।
একটি সূত্র জানায়, গত ২৩ জুন বাঁধটি নিয়ে হওয়া এক আলোচনায় রাজ্যটির মুখ্যমন্ত্রী (খেত তেইন নান) বলেন, অতীতের মতো নয়, বরং চীন এখন নতুন প্রযুক্তির সাহায্যে পরিবেশগত সমস্যাগুলো মোকাবিলা করতে প্রস্তুত।
ওই সূত্র মুখ্যমন্ত্রীর কথার উদ্ধৃতি দিয়ে জানায়, এসব ঝুঁকি যাতে সামলানো যায়, তা নিশ্চিত করতে তারা (চীন) প্রযুক্তি ব্যবহার করবে। এখানে চিন্তার কিছু নেই।’
.গত মার্চ মাসে মধ্য মিয়ানমারে ৭ দশমিক ৭ মাত্রার একটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে, যাতে হাজারো মানুষ প্রাণ হারায়। ভূমিকম্পপ্রবণ এমন একটি অঞ্চলে এত বড় একটি বাঁধ নির্মাণের ঝুঁকি নিয়ে এ ঘটনা নতুন করে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
মিতসোন বাঁধটি মালি ও নমাই নদীর মোহনায় নির্মাণ করা হবে। এটি ১৫২ মিটার (৫০০ ফুট) উঁচু হবে এবং লম্বায় হবে ১৫২ মিটার (৫০০ ফুট) পর্যন্ত বিস্তৃত।
সরকারের ভেতরের আলোচনার বিষয়ে সরাসরি জানে—এমন তৃতীয় আরেকটি সূত্র গত ২২ জুনের একটি বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রীর করা মন্তব্যের কথা উল্লেখ করে। ওই বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রী বলেছিলেন, মিতসোন প্রকল্পটিকে একটি ‘ঐতিহাসিক অর্জন’ হিসেবে দাঁড় করানো উচিত।
সূত্রটি আরও জানায়, মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন, মিতসোন প্রকল্পের কাজ আবার শুরু করার ক্ষেত্রে চীন পূর্ণ সমর্থন ও উৎসাহ দিচ্ছে।
মিতসোন প্রকল্প থেকে উৎপাদিত বিদ্যুতের বড় অংশ চীনে পাঠানোর বিষয়ে মিয়ানমার প্রথমে যে চুক্তি করেছিল, তা পরিবর্তন করা হয়েছে কি না, রয়টার্স তা নিশ্চিত করতে পারেনি।
.বাঁধটির চারপাশের এলাকা এখন সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। সেখানে প্রকল্পের পক্ষে সমর্থন বাড়ানোর জন্য সরকার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। সরকারের এই চেষ্টার মধ্যেই খেত তেইন নানের ওই ব্যক্তিগত মন্তব্যগুলো সামনে এল।
গত ডিসেম্বরে সামরিক বাহিনীর সাবেক উপপ্রধান সোয়ে উইন স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করতে মিতকিনা সফর করেন। সরকার-সমর্থিত একটি কমিটির দুজন সদস্য জানিয়েছেন, এরপর কাচিন রাজ্যজুড়ে অন্তত ২৬টি জনসভায় এই প্রকল্পের পক্ষে সমর্থন জানানো হয়েছে।
ওই কমিটির একজন সদস্য নও খোন বলেন, ‘আমরা জনগণকে সঠিক তথ্য দিতে চাই, যাতে তারা নিজেরাই নিজেদের সিদ্ধান্ত নিতে পারে।’
তবে প্রকল্পটির বিরোধিতা এখনো চলছে। সম্প্রতি ৪৯টি নাগরিক সমাজের সংগঠন এ প্রকল্পের কাজ পুরোপুরি বন্ধ করার দাবি জানিয়েছে।
গত ৫ মে এক যৌথ বিবৃতিতে ওই সংগঠনগুলো বলেছে, এটি জনগণের কোনো কাজে আসবে না; বরং এটি মানুষের জীবন, ঘরবাড়ি ও সম্পদের মারাত্মক ক্ষতি ও ধ্বংস ডেকে আনবে।






